03/06/2026
॥বাংলাদেশে চিকিৎসকদের স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণ॥
সাম্প্রতিক এফসিপিএস প্রশিক্ষণার্থী পদায়ন নীতিমালা নিয়ে চিকিৎসক সমাজে বেশ আলোচনা চলছে। কেউ বলছেন এটি প্রয়োজনীয় সংস্কার, কেউ বলছেন এটি বৈষম্যমূলক। আবেগের বাইরে গিয়ে একটু বিশ্লেষণ করা দরকারঃ প্রতিবেশী দেশগুলো কি করে? আর বাংলাদেশের জন্য কি হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ?
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শক্তি চিকিৎসক, কিন্তু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরির প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ, ব্যয়বহুল এবং মাননির্ভর। তাই প্রশিক্ষণ বণ্টনের যেকোনো পরিবর্তন শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে প্রভাবিত করবে।
বর্তমান সরকারী সিদ্ধান্তে কয়েকটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছেঃ
- অটোমেশনভিত্তিক পদায়ন ব্যবস্থা চালু করা
- প্রশিক্ষণার্থীদের কেন্দ্রীয়ভাবে বণ্টন করা
- ঢাকাকেন্দ্রিক চাপ কমানো
- ট্রেইনার-ট্রেইনি (trainer-trainee) অনুপাত নিয়ন্ত্রণ
- জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ বিস্তৃত করা
- সীমিত আসনের মধ্যে বেশি সংখ্যক প্রশিক্ষণার্থীকে অন্তর্ভুক্ত করা।
শুনতে এগুলো বেশ যৌক্তিক মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে প্রশ্ন হলোঃ এই কাঠামো কতটা কার্যকর হবে?
প্রথমে ভারতের অবস্থা দেখি।
ভারতে স্নাতকোত্তর চিকিৎসা শিক্ষা অত্যন্ত কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু তাদের মডেলের মূল শক্তি “কেন্দ্রীয় পদায়ন” নয়, বরং “স্বচ্ছ মেধাভিত্তিক আসন বণ্টন”।
ভারতে একজন চিকিৎসক জাতীয় পরীক্ষা দেন। এরপর অনলাইন কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে নিজের পছন্দের বিষয়, কলেজ এবং অঞ্চল নির্বাচন করেন। একটি কেন্দ্রীয় ম্যাচিং সিস্টেম (matching system ) মেধা, পছন্দক্রম এবং আসনের প্রাপ্যতা বিবেচনা করে পদায়ন দেয়।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোঃ
- প্রশিক্ষণকেন্দ্র আগে স্বীকৃত হয়
- শিক্ষক সংখ্যা যাচাই হয়
- রোগীর চাপ মূল্যায়ন হয়
- লগবুক ও সুপারভিশন (supervision) বাধ্যতামূলক
- স্টাইপেন্ড (stipend) সকলের জন্য সর্বত্র কাঠামোবদ্ধ।
অর্থাৎ ভারত বিকেন্দ্রীকরণ (decentralisation) করেছে, কিন্তু মান বজায় রাখার বিষয়টি আগে নিশ্চিত করেছে। এজন্যই ভারতের চিকিৎসা শিক্ষা অন্য দেশে গ্রহণযোগ্য হয়েছে।
এবার পাকিস্তান।
পাকিস্তানে এফসিপিএস রেসিডেন্সি (FCPS residency) অনেক বেশি কেন্দ্র থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সেখানে অ্যাকাডেনিক স্কোর, পেশাগত পরীক্ষা, হাউস জব অভিজ্ঞতা এবং কিছু ক্ষেত্রে চাকরির নম্বর বিবেচনা করা হয়।
এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে ।
পাকিস্তান অনেকবার এফসিপিএস রেসিডেন্সি নির্বাচন পলিসি পরিবর্তন করেছে। এর ফলে লিটিগেশন, আন্দোলন এবং দীর্ঘ প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। কারণ একটি পলিসি যতই প্রযুক্তিনির্ভর হোক, যদি তা স্বচ্ছ না হয়, তাহলে সেটি দ্রুত অবিশ্বাস তৈরি করে।
এখন বাংলাদেশের দিকে আসি।
বাংলাদেশের বর্তমান সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় শক্তি হলোঃ
- দীর্ঘদিনের ঢাকাকেন্দ্রিক প্রশিক্ষণ নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা
- অতিরিক্ত ট্রেইনির ভীড় (trainee congestion) কমানোর উদ্যোগ
- ট্রেইনার-ট্রেইনির অনুপাত(trainer-trainee ratio) নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা।
- ডিজিটাল বণ্টন ব্যবস্থার সূচনা।
কিন্তু উদ্বেগের বিষয়ও কম নয়।
প্রথম উদ্বেগঃ অবকাঠামোগত বৈষম্য।
সব মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের রোগীর সংখ্যা, আইসিইউ চিকিৎসা, ল্যাবরেটরির সুবিধা, অপারেশন করার সক্ষমতা এবং সুপারভিশনের লভ্যতা একরকম নয়। একজন ট্রেইনি যদি পর্যাপ্ত রোগী, প্রসিডিউর বা মেন্টর না পান, তাহলে কাগজে-কলমে ট্রেইনিং হলেও বাস্তবে দক্ষতা তৈরি নাও হতে পারে।
দ্বিতীয় উদ্বেগঃ স্বচ্ছতা।
অটোমেশন ভালো। কিন্তু অ্যালগোরিদম (algorithm) কি? মেরিটের স্কোর কত? প্রিফারেন্সের স্কোর কত? এগুলো কিভাবে
কাজ করবে? আপীল করা যাবে? এসব পরিষ্কার না হলে বিভ্রান্তি বাড়বে।
তৃতীয় উদ্বেগঃ মানবিক দিক।
অনেক ট্রেইনি পরিবার, আর্থিক সীমাবদ্ধতা, স্পাউসের পোস্টিং (spouse posting), সন্তানের দেখাশোনার (childcare) এবং নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনা করে প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা করেন। এখানে প্রশিক্ষণকালীন প্রণোদনা বা স্টাইপেন্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সকল ট্রেইনির প্রশিক্ষণকালীন প্রণোদনা বা স্টাইপেন্ড নিশ্চিত করা জরুরী এবং তার পরিমান প্রয়োজন অনুযায়ী সম্মানজনক হওয়া উচিত।
চতুর্থ উদ্বেগঃ প্রশিক্ষণের মান।
প্রশিক্ষণ মানে শুধু পদায়ন নয়।
প্রশিক্ষণ মানেঃ পর্যাপ্ত রোগী, দক্ষ সুপারভাইজার (supervisor), হাতে-কলমে (hands-on procedure) শেখার সুযোগ, কাঠামোবদ্ধ অ্যাসেসমেন্ট করা (structured assessment), বিশ্বস্ততার সঙ্গে লগ বই সংরক্ষণ করা এবং মূল্যায়ন করা (logbook review) এবং প্রশিক্ষণ সম্পর্কিত ফিডব্যাক নেওয়া (feedback culture)।
এই সকল উপাদান ছাড়া প্রশিক্ষণ স্পেশালিস্ট সার্টিফিকেট তৈরি হতে পারে, তা স্পেশালিস্টের যোগ্যতা এবং দক্ষতা সৃষ্টি করতে পারে না।
তাহলে বাংলাদেশের জন্য কি হতে পারে বেশি যুক্তিসংগত নীতি?
প্রথমত, একটি জাতীয় ম্যাচিং সিস্টেম (matching system) দরকার।
এখানে বিবেচনায় থাকবেঃ
- মেধা
- পছন্দক্রম
- সংশিষ্ট বিষয়ে ট্রেইনার প্রাপ্যতা (trainer availability)
- হাসপাতালের রোগীর সংখ্যা (case load)
- এলাকার পরিস্থিতি এবং প্রয়োজনীয়তা (regional need)
- বর্তমানে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে চিকিৎসকের সংখ্যা এবং সংকট (existing workforce shortage)।
দ্বিতীয়ত, বাস্তবায়ন (implementation) ধাপে ধাপে করতে হবে।
একসঙ্গে সারা দেশে প্রয়োগ না করে এক থেকে দুই সেশন পাইলট ফেজ (pilot phase) চালানো বেশি নিরাপদ।
তৃতীয়ত, ঢাকার বাইরে হাসপাতালসমূহের সক্ষমতা বাড়াতে (peripheral centre strengthening) হবে।
প্রথমে প্রতিটি হাসপাতালের অবকাঠামো (infrastructure), প্রশিক্ষক (trainer), তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার সক্ষমতা (supervision), লাইব্রেরির অবস্থা, হোস্টেল,, এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তারপরই একটি হাসপাতালে ট্রেইনি পাঠানো উচিত।
চতুর্থত, প্রশিক্ষণার্থীদের সুরক্ষা (trainee protection system) নিশ্চিত করতে হবে।
এর মধ্যে রয়েছেঃ
- সকলের জন্য প্রশিক্ষণকালীন ভাতা বা প্রণোদনা (stipend)
- অভিযোগ প্রতিকার কেন্দ্র (grievance cell) থাকতে হবে
- আপীল করার (appeal mechanism) সুযোগ থাকতে হবে
- কর্মস্থলে নিরাপত্তা (workplace safety framework) নিশ্চিত করতে হবে
- ট্রেইনি নির্বাচন এবং পোস্টিং প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে হবে।
সবশেষে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার।
বাংলাদেশের চিকিৎসা শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা শুধু আসন বন্টনের সমস্যা নয় নয়। এটি দক্ষতা বন্টনেরও সমস্যা।
ঢাকার চাপ কমানো প্রয়োজন। কিন্তু বিকেন্দ্রীকরণ (decentralisation) যদি মান কমিয়ে করে, তাহলে ভবিষ্যতে স্পেশালিস্টের স্বল্পতা (specialist shortage) কমবে না, বরং ট্রেইনিংয়ের মান নিয়ে আরও সংকট (training quality crisis) তৈরি হতে পারে।
সবচেয়ে কার্যকর নীতি সম্ভবতঃ মেধাভিত্তিক + স্বচ্ছ + পছন্দসংবেদনশীল + মাননির্ভর + ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত জাতীয় প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা।
কারণ স্পেশালিস্ট তৈরি হয় শুধু পদায়নে নয়, ভালো প্রশিক্ষণে। আর প্রশিক্ষণের সময় প্রশিক্ষণার্থীদের খেয়ে-পরেও জীবন রক্ষা করা জরুরী।