07/09/2026
প্রতিদিন বিকেল পাঁচটায় সেখানে এসে বসতেন আরিফ। বয়স এখন সত্তরের কাছাকাছি। চুল সাদা, শরীর দুর্বল, কিন্তু চোখ দুটো আজও যেন অপেক্ষায়।
কেউ জিজ্ঞেস করলে তিনি শুধু বলতেন,
“একজনের অপেক্ষায় আছি। সে একদিন বলেছিল, ফিরে আসবে।”
অনেক বছর আগে আরিফের জীবনে মায়া নামে একটি মেয়ে এসেছিল। দুজনের ভালোবাসা ছিল খুব সাধারণ—একসঙ্গে হাঁটা, বিকেলে কথা বলা, ভবিষ্যৎ নিয়ে ছোট ছোট স্বপ্ন দেখা।
তারা স্বপ্ন দেখেছিল একটি ছোট্ট বাড়ির। বাড়ির সামনে ফুলের গাছ থাকবে, সন্ধ্যায় দুজন বারান্দায় বসে চা খাবে।
কিন্তু মায়ার পরিবার তাদের সম্পর্ক মেনে নেয়নি। মায়ার বিয়ে অন্য জায়গায় ঠিক হয়ে গেল।
বিয়ের আগের রাতে মায়া কাঁদতে কাঁদতে আরিফকে বলেছিল,
“আমাকে ভুলে যেও না। আমি একদিন ফিরে আসব।”
আরিফ বলেছিল,
“তুমি ফিরে আসা পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করব।”
তারপর মায়া চলে গেল।
দিন গেল, মাস গেল, বছর গেল।
মায়া আর ফিরে এল না।
এর মধ্যে আরিফ তার বাবা-মাকে হারাল। চাকরি করল, সংসার সামলাল, জীবনে অনেক মানুষ এল। সবাই তাকে নতুন করে জীবন শুরু করতে বলল।
কিন্তু আরিফ পারল না।
কারণ সে মায়াকে পাওয়ার অপেক্ষায় ছিল না—সে অপেক্ষা করছিল সেই প্রতিশ্রুতির জন্য।
প্রতিদিন বিকেলে সে কৃষ্ণচূড়ার নিচে বসত।
একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে একজন বৃদ্ধা এসে তার সামনে দাঁড়াল।
কাঁপা গলায় বলল,
“আরিফ?”
আরিফ মাথা তুলে তাকাল।
তার বুকটা কেঁপে উঠল।
“মায়া?”
পঞ্চাশ বছর পর তারা আবার মুখোমুখি।
মায়ার চোখে পানি।
সে বলল,
“আমি অনেকবার আসতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সংসার, সন্তান, দায়িত্ব—সবকিছু আমাকে আটকে রেখেছিল। বিশ্বাস করো, তোমাকে কখনো ভুলিনি।”
আরিফ মৃদু হেসে বলল,
“আমি তোমার জন্য জীবন থামিয়ে রাখিনি। শুধু তোমার জায়গাটা আর কাউকে দিতে পারিনি।”
দুজন অনেকক্ষণ পাশাপাশি বসে রইল।
কোনো অভিযোগ ছিল না।
ছিল শুধু হারিয়ে যাওয়া সময়ের গল্প।
বিদায় নেওয়ার সময় মায়া বলল,
“আমি আবার আসব।”
আরিফ হেসে বলল,
“এবার কিন্তু সত্যিই এসো।”
কিন্তু পরদিন সকালে খবর এল—মায়া রাতে অসুস্থ হয়ে মারা গেছে।
আরিফ খবরটা শুনে কোনো কথা বলল না। শুধু বিকেলে সেই বেঞ্চে গিয়ে বসে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
“অন্তত একবার তো ফিরে এসেছিলে।”
কয়েক বছর পর আরিফও চলে গেল।
কৃষ্ণচূড়ার নিচে পাওয়া গেল তার পুরোনো চিঠি। চিঠির শেষ লাইনে লেখা ছিল—
“কিছু মানুষ জীবনে ফিরে আসে না, তবুও তাদের জন্য অপেক্ষা করা শেষ হয় না। কারণ সত্যিকারের ভালোবাসা কাছে থাকার নাম নয়—মনের মধ্যে কাউকে সারাজীবন বাঁচিয়ে রাখার নাম।”
আজও সেই বেঞ্চটা আছে।
বিকেলের শেষ আলো যখন গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে মাটিতে পড়ে, মনে হয়—হয়তো আরিফ আর মায়া আবার পাশাপাশি বসে আছে।
এবার আর তাদের আলাদা ভয় নেই। ❤️