27/05/2026
#প্রসূতিবিদদের_ইদের_গল্প
( সত্যি ঘটনা অবলম্বনে)
(১)
আজ বাদে কাল ইদ।
এত ভিড় বাট্টায় জার্নি করে ছুটিতে বাড়ি যাওয়া সব সময় অপছন্দ
ডা. শায়লার। তাছাড়া ছুটি ও মিলেনি এবার।এ নিয়ে কাল রাতে রীতিমত কথা কাটাকাটি হয়ে গেল আসিফের সাথে। কেন সে এবারের ইদে ছুটি ম্যানেজ করতে পারল না তাই ।
রেসিডেন্ট সার্জন হিসেবে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যোগদান করেছে মাস ছয়েক ।
কাল সে জন্য ছুটির জন্য আবেদন নিয়ে গিয়েছিল। প্রফেসর ছুটি দিতে রাজি হননি কারণ এ সময় যাবতীয় খারাপ রোগী আসে, ছুটির ডামাডোলে নানান মিসহেপ হওয়ার সন্ভাবনা থাকে।
এক কথায় নাকচ করে দিয়ে বলেছেন কোরবানি ইদে ছুটি নিতে।
শেষমেশ আসিফ বাচ্চাদের নিয়ে ইদ করতে রওয়ানা দিয়েছে তাদের বাড়িতে।
একা মানুষের রান্না বান্নার ঝক্কি নেই।
সামান্য কিছু দিয়ে ইফতার সেরে ফেলল শায়লা।
আগামীকাল মানে ইদের কর্মপন্থা ভাবতে লাগল।
ওদের একটা সুবিধা আছে,
হাসপাতালের পাঁচতলায় কিছু কেবিন ইমার্জেন্সি ডিউটি ডাক্তারদের জন্য বরাদ্দ দিয়েছেন কর্তৃপক্ষ।
শায়লা ভাবল কাল ইদের দিন সকালে হাসপাতালে যাবে আর বাসায় আসবেনা, কেবিনেই থাকবে।
টুকটাক জিনিস গুছিয়ে রাখল সকালে
হাসপাতালে নেয়ার জন্য।
(২)
আজ ইদ।
সকালে ঘুম থেকে উঠে গোসল সেরে
চা নাস্তা খেয়ে রেডি হয়ে গেল শায়লা।
একা বাসায় ঘুম ভাল হয়নি রাতে।
না জানি বাচ্চারা কি করছে এখন।
তবে আসিফ খুব কেয়ারিং ফাদার।
তাছাড়া ওদের দাদী জেঠিরা থাকায়
ও একরকম নিশ্চন্ত।
ডিউটি ডাক্তারকে এম্বুলেন্স পাঠাতে বলে কাজের বুয়াকে ইনস্ট্রাকশন দিল কিছু।
- এম্বুলেন্স এসে গেছে বুয়া জানায়।
- খালা অপরিচিত কেউ এলে দরজা
খুলোনা যেন।
ব্যাগ ঝুলিয়ে নেমে গেল শায়লা।
রাস্তা ঘাটে লোকজন তেমন নাই,
সবাই মনে হয় ইদের নামাজে ব্যস্ত।
স্বল্প সময়ে হাসপাতালে পৌঁছে নিজের
কেবিনে গেল।
শায়লা আর রেজিষ্ট্রার দুজনের জন্য
এই ১৮ নং কেবিনটা বরাদ্দ।
রুমমেট ছুটিতে গেছে।দুইটা বিছানা, একটা মান্ধাতার আমলের ড্রেসিং টেবিল, দুইটা চেয়ার, এটাচড বাথরূম ও এক চিলতে বারান্দা। মন্দের ভাল।
রুমে পৌঁছে ডিউটি ডাক্তারের সাথে
ইন্টারকমে কথা বলে নিল।
নাহ্ ওয়ার্ড এখন পর্যন্ত কুল আছে।ওদের ঠিক একতলা উপরেই প্রসূতি ওয়ার্ড।
বাচ্চাদের জন্য একটু মন খারাপই লাগছে। নিজের বিছানায় গা এলিয়ে দিল।
(৩)
ইন্টারকমের কর্কশ শব্দে ঘুম টুটে
গেল শায়লার।
- আপা ! সারভাইকেল এনসারক্লেজ
দেয়া রোগী লেবার পেইন নিয়ে
এসেছে। সেলাই খুলতে পারছিনা।
ডিউটি ডাক্তারের ফোন।
- টেবিলে তোল, আমি এখনি আসছি।
দ্রূূত সিড়ি টপকে প্রসূতি ওয়ার্ডে
ঢুকল শায়লা।
।
যখন কোন নারীর পর পর মিসক্যারিজ হতে থাকে প্রেগনেন্সির মাঝামাঝি সময়ে,তখন দেখা যায় এটার কারণ জরায়ু মুখের দূর্বলতা বা Cervical Incompetence.
নীচের দিকে চাপ পড়লে অসময়ে জরায়ুমুখ খুলে পেইন শুরু হয়ে এবরশন কিংবা প্রি ম্যাচিউর লেবার
হয়। এর চিকিৎসা জরায়ুমুখে প্রেগনেন্সির শুরুতেই মোটা সিল্ক সূতা দিয়ে পার্স-স্ট্রিং সেলাই দেয়া,
এতে চট করে জরায়ুমুখ খুলতে পারেনা, বেবী ম্যাচিউর হলে সেলাই কেটে দিয়ে ডেলিভারির ব্যাবস্থা করা যায়।
রোগীকে দেখে ইতিহাসটা মনে পড়ে গেল শায়লার।
#হামিদা_বেগম সাদাসিধা গ্রামের মেয়ে। চকরিয়া শশুর বাড়ি।
বিয়ের পাঁচ বছরে ওর চার চারটা এবরশন হয়ে গেছে।
প্রথমটা সাত মাসে পড়তেই
-২য় ছয় মাসের মাঝামাঝি
-তৃতীয়টা পাঁচ মাসে
-চতুর্থটা চার মাস পার করতেই পারেনি
বেচারী।
হামিদার শাশুড়ি তো মহাখাপ্পা। ছেলেকে আরেকটা বিয়ে করাতে একপায়ে খাঁড়া । যেহেতু জরায়ুর দোষে বাচ্চা রাখতে পারছে না হামিদা তাছাড়া
বংশধর দরকার এখন তাদের।
#এবার আবারো গর্ভধারণ আট সপ্তাহ চলছে। বাবা মার একান্ত অনুরোধে শেষ চেষ্টা করতে রাজি হয়েছে হামিদার শাশুড়ি।
হামিদাকে নিয়ে এসেছে তার বড়খালার বাসায় শহরের উন্নত চিকিৎসার জন্য।
বহিঃর্বিভাগে দেখাতে এনেছিল শায়লাকে।
আল্ট্রাসনোগ্রাম করে দেখা যায় হামিদার প্রেগনেন্সি আট সপ্তাহের
ও জরায়ু মুখ দৈর্ঘ্যে কমে ১.৫ সেন্টিমিটার,সাধারণত ২.৫ থেকে ৩ সেঃ মিঃ হয়।
শুরু হয় কাউন্সেলিংয়ের পালা। হামিদার জরায়ু মুখে সেলাই দিতে হবে আর রেস্ট এ থাকতে হবে পুরাটা প্রেগনেন্সিতে।
ওরা যা বলে তাতেই রাজি শুধু একটা সুস্থ বাচ্চা চায়।
অতঃপর হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে
১৪ সপ্তাহর সময় তাকে জরায়ুর মুখে সিল্ক সূতা দিয়ে পার্স স্ট্রিং সেলাই দেয়।
এর মাঝে হামিদার যথাযথ চিকিৎসা চলেছে, রেস্টে ও ছিল।আটমাস পার হবার পর এখন গত রাত থেকে একটু ব্যথা, সকালে ব্যথা বাড়ায় হাসপাতালে চলে এসেছে।
ড্রেস চেঞ্জ করে লেবার রুমে ঢুকলো শায়লা।
হামিদাকে লিথোটমি পজিশন করে দেখে তার ডেলিভারি ব্যথার চাপে জরায়ুমুখ একপাশে ছিড়ে ব্লিডিং হচ্ছে।
সেলাইয়ের সূতা চেপে বসে আছে।
সহকারী সহ অনেক কষ্টে হাতড়ে অনেকটা আন্দাজের উপরে সেলাইটা কেটে দিল শায়লা।
যাক বেবীর হার্টবিট ভাল আছে।
শিশু ওয়ার্ডের ডাক্তারকে ও কল দিয়ে রাখল যেহেতু একমাস আগে লেবার পেইন।
এরপর ওয়ার্ড রাউন্ড শুরু করল সে।
(৪)
এর মাঝে ইন্টার্ণ ডাক্তার একজন হাপাতে হাপাতে এসে বলল
- ম্যাডাম! একটা সিরিয়াস রোগী এসেছে খাগড়াছড়ি থেকে, রিসিভিং রূমে জলদি আসুন ।
শায়লা তার সহকারীদের নিয়ে রিসিভিং রূমে যেয়ে দেখে ভয়াবহ অবস্থা।
গত দুইদিন থেকে প্রসব ব্যথা এই রোগীর, এর মাঝে কাল রাতে নবজাতকের মাথা বের হয়েছে
কিন্তু পুরা শরীর আটকে আছে জরায়ুর ভিতর। ধাত্রী চেষ্টা চরিত্র অনেক করেছে কিন্তু ডেলিভারি করাতে পারেনি, এর মাঝে বাচ্চা মারা গেছে, রোগী ও শকে, যায় যায় অবস্থা।
এটা " #সোল্ডার_ডিসটোশিয়া_উইথ #অবস্ট্রাকটেট_লেবার"।
দ্রূূত দুটো আইভি চ্যানেল ওপেন করে রক্তের জন্য ব্লাড ব্যাংকে পাঠানোর পর
দুই হাতে স্যালাইন চালু করে এন্টিবায়োটিক ইনজেকশান দিয়ে ওটিতে পাঠাল।এনেস্থেসিওলজিস্টকে ইমার্জেন্সি কল দিয়ে আনানো পর অপারেশন শুরু করতে হবে। তাও ভাগ্যিস সন্ধানীর ব্লাড ব্যাংকে O+ve দুই ব্যাগ ব্লাড পাওয়া গেছে।
এরই মাঝে বাচ্চাটা মারা যাবার পর ফুলে ফেপে একাকার।
এটাকে নরমাল ডেলিভারির মত যোণীপথে আনতে গেলে জরায়ু ফেটে যাবার সন্ভাবনা।
আবার সি সেকশন করলে ও
মাথা তো একদিন আগে ডেলিভারী হয়ে জরায়ুর বাইরে ফুলে আছে,
বাচ্চা কেমন করে পেট কেটে বের করবে??
চিন্তায় শায়লার মাথা খারাপ হবার যোগাড়।
অবশেষে একটা বুদ্ধি বের করলো শায়লা।
সহকারী রেজিস্টার ডা.আরজুকে সিজার ও ক্রেনিওটমি 'স' দিয়ে
পায়ের কাছে বসিয়ে দিল,আর সে নিজে সি সেকশনের জন্য রেডি হয়ে গেল।
রোগীকে জেনারেল এনেস্থেসিয়া দেয়ার পর ডা. আরজুকে বলল
- স ও সিজার দিয়ে বের হওয়া মাথাটা কেটে ফেল, তাহলে জরায়ু কেটে বাচ্চার বাকী বডিটা বের করা সহজ হবে।
#তারপর সেকি ভয়াবহ অবস্হা।
মৃত বাচ্চার বের হওয়া মাথাটা কাটতে ডা. আরজু ও ডা.আশুতোষের গলদঘর্ম অবস্থা।
এদিকে শায়লা পেট কেটে দেখে জরায়ু দুইদিন ধরে টানাহেচড়ার জন্য অলমোস্ট ছেড়ার বাকী ও ইনফেকটেট হয়ে কালো বর্ণের ও গন্ধযুক্ত হয়ে আছে ।
তড়িঘড়ি করে সিজারিয়ান সেকশনে বাচ্চার বাকী বডি বের করে দেখে হুড়মুড়িয়ে ব্লিডিং হচ্ছে।
কিছুতেই কন্ট্রোল করা যাচ্ছেনা।
অবশেষে সিদ্ধান্ত নিল রোগী বাঁচানোর জন্য জরায়ু রিমুভ করা দরকার।
একটা সন্তান তো আগের আছেই,
তার জন্য হলে ও সে জানে বেঁচে থাক।
অতঃপর স্বামীর সম্মতি নিয়ে জরায়ু রিমুভ করে ভাল করে নরমাল সেলাইন দিয়ে ওয়াশ করে পেট সেলাই করে দিল।
আরো দুই ইউনিট ব্লাড ট্রান্সফিউশনের কথা বলে আইসিইউতে পাঠাল ।
আদৌ বাঁচবে কিনা বলা যাচ্ছেনা,
তবু চেষ্টা তো করেছে।
এই এক রোগীর পেছনেই ইদের দিন কাবার। এদিকে ডা.আরজুর খুব মন খারাপ। ইদেের দিন এই যে বাচ্চার মাথা কাটাকাটি হোক না মৃত।
ওকে সান্তনা দেয় শায়লা -
- আমাদের তো এমনিতেই কসাই বলে
কেউ কেউ। রোগীর জীবন বাঁচানোর
জন্য না হয় হলে কসাই।
#এর মাঝে ডা. পপি এসে খবর দেয় হামিদা বেগমের একটা ফুটফুটে ছেলে হয়েছে, নরমাল ডেলিভারি,ওজন ২.৫ কেজি, শিশু ডাক্তার দেখে বলেছে তিন সপ্তাহ আগে হলে ও ভাল আছে এনআইসিইউ লাগবেনা।
এত কষ্টের মাঝে ও একপশলা খুশী ছুঁয়ে যায় শায়লাকে।
অবশেষে হামিদা বেগমের কোলজুড়ে একটা সন্তান মানে সংসারে টিকে থাকার চাবিকাঠি।
(৫)
অফিসরুমে যেতে যেতে ওয়ার্ড
রাউন্ড দিল আবার। কেউ ডেলিভারি করাচ্ছে, ডা. আরজু আর একটা সিজার করার জন্য রেডি হচ্ছে। ডিউটিরত ইন্টার্ণ ডাক্তার ক'জন ফলোআপ দিতে দিতে গলদঘর্ম।
অবশেষে পড়ন্ত বেলায় হাসপাতাল কতৃপক্ষের ইদ উপলক্ষে বরাদ্দ
ঠান্ডা উন্নত খাবার ( পোলাও- মুরগী) খেতে বসল শায়লা।
#দিন শেষে আনন্দ একটাই- সারভাইক্যাল এনসারক্লেজ দিয়ে একটা সুস্হ শিশুর জন্ম,
#বেদনা - খাগড়াছড়ির চাকমা মেয়েটির জন্য যে মা হতে গিয়ে এখন আইসিইউতে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।
বাঁচার সন্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।
(৬)
এভাবে ডা.শায়লা,ডা. আরজুর মত প্রসূতিরোগ বিশেষজ্ঞদের কত ইদ,
কত পার্বণ হাসপাতালে কাটাতে হয়,
কিভাবে মৃত্যুর সাথে লড়াই করে
জীবন ছিনিয়ে আনতে হয়,
সেটা একান্ত কাছের লোকজন ছাড়া আর কেউ বিন্দুমাত্র ধারনা করতে পারে কিনা জানিনা।
্রসূতি_মায়ের গর্ভ কালীণ
যাত্রা সুগম ও সহজ হোক এই কামনা।
ডা. কামরুন নেসা রুনা
চট্টগ্রাম।