01/10/2025
কিডনি পাথর কী? লক্ষণগুলো কি কি? পাথর কেন হয় ? পাথর কি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার মাধ্যমে বেরিয়ে যায়?
কিডনি হলো আপনার শরীরের একটি ফিল্টার বা ছাঁকনি ব্যবস্থা। এটি রক্ত থেকে অতিরিক্ত লবণ, জল, পটাসিয়াম, অ্যাসিড এবং নাইট্রোজেনের মতো বর্জ্য পদার্থগুলি সরিয়ে দেয় এবং মূত্র বা প্রস্রাব তৈরি করে। যখন এই বর্জ্য পদার্থগুলির পরিমাণ রক্তে অতিরিক্ত বেড়ে যায় এবং কিডনি সেগুলিকে সম্পূর্ণরূপে ছেঁকে বার করতে পারে না, তখন সেগুলি কিডনির মধ্যে জমাট বেঁধে স্ফটিক বা ক্রিস্টাল তৈরি করে। এই স্ফটিকগুলি একে অপরের সঙ্গে মিশে একটি শক্ত বস্তু তৈরি করে, যা কিডনি পাথর নামে পরিচিত। এগুলি বালির দানার মতো ছোট হতে পারে বা গল্ফ বলের মতো বড়ও হতে পারে। পাথরগুলি মূত্রনালী এবং মূত্রাশয়েও পাওয়া যেতে পারে।
কিডনি পাথরের কিছু প্রধান লক্ষণ হলো:
১. মারাত্মক ব্যথা (Pain)
এটি সবচেয়ে সাধারণ এবং প্রধান লক্ষণ। এই ব্যথাকে রেনাল কোলিক (renal colic) বলা হয় এবং এটি খুব তীব্র হয়, যা হঠাৎ শুরু হয় এবং ঢেউয়ের মতো আসে-যায়।
* অবস্থান: ব্যথা সাধারণত পিঠের একপাশে, পাঁজরের নিচে বা পেটের পাশের অংশে শুরু হয়।
* ছড়িয়ে পড়া: পাথর নিচে নামার সাথে সাথে ব্যথাটি কুঁচকি (groin) বা তলপেটে ছড়িয়ে যেতে পারে।
* প্রকৃতি: ব্যথা এত তীব্র হতে পারে যে আপনি স্থির থাকতে পারেন না, যার ফলে বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে।
২. মূত্রনালীর সমস্যা (Urinary Issues)
পাথর মূত্রনালীর মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় এই সমস্যাগুলো হতে পারে:
* প্রস্রাবে রক্ত (Hematuria): প্রস্রাবের রঙ গোলাপি, লাল বা বাদামী হতে পারে, যা প্রস্রাবে রক্তের উপস্থিতির কারণে হয়।
* প্রস্রাবের সময় ব্যথা: প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া বা ব্যথা অনুভব করা।
* ঘন ঘন প্রস্রাবের তাগিদ: বারবার প্রস্রাবের প্রয়োজন অনুভব করা, কিন্তু অল্প পরিমাণে প্রস্রাব হওয়া।
* প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া: যদি পাথর মূত্রনালীর পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, তবে প্রস্রাব করতে না পারাও একটি মারাত্মক লক্ষণ।
* আবছা বা দুর্গন্ধযুক্ত প্রস্রাব: প্রস্রাব ঘোলাটে বা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি দুর্গন্ধযুক্ত হতে পারে।
৩. অন্যান্য লক্ষণ (Other Symptoms)
যদি পাথর কোনো সংক্রমণ (infection) সৃষ্টি করে তবে নিম্নলিখিত লক্ষণগুলি দেখা যেতে পারে:
* জ্বর এবং ঠাণ্ডা লাগা (Fever and Chills): যদি কিডনিতে সংক্রমণ হয়, তবে জ্বর ও কাঁপুনি হতে পারে, যা
একটি গুরুতর অবস্থা।
* বমি বমি ভাব ও বমি (Nausea and Vomiting): তীব্র ব্যথার কারণে এটি হতে পারে।
কিডনি পাথর কেন হয়?
কিডনি পাথর হওয়ার প্রধান কারণগুলির মধ্যে রয়েছে:
* জল কম পান করা: শরীরে পর্যাপ্ত জলের অভাবে মূত্র ঘন হয়ে যায়, যা খনিজ এবং লবণগুলিকে স্ফটিক আকারে জমতে সাহায্য করে।
* আগের ইতিহাস: যদি আপনার একবার কিডনি পাথর হয়ে থাকে বা আপনার পরিবারের কারও এই সমস্যা থাকে, তবে আপনারও হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
* খাদ্যাভ্যাস: অতিরিক্ত পরিমাণে লবণ, চিনি, বা নির্দিষ্ট কিছু প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খেলে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
* কিছু শারীরিক অবস্থা: যেমন স্থূলতা, কিছু হজমের সমস্যা, বা কিছু মূত্রনালীর সংক্রমণ (UTI)।
* নির্দিষ্ট কিছু ঔষধ: কিছু অ্যালোপ্যাথিক ঔষধ কিডনিতে পাথর তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে।
কিডনিতে পাথর তৈরি করতে পারে এমন অনেক ধরনের ওষুধ রয়েছে। যেমন:
১. কিছু অ্যান্টিবায়োটিক (Antibiotics)
কিছু অ্যান্টিবায়োটিক, যেমন:
* সালফা ওষুধ (Sulfonamides), যেমন - সালফাডিয়াজিন।
* সিপ্রোফ্লক্সাসিন (Ciprofloxacin)।
* সেফট্রিয়াক্সোন (Ceftriaxone)।
২. প্রোটিওস ইনহিবিটর (Protease Inhibitors)
এগুলি সাধারণত এইচআইভি (HIV) বা এইডস-এর চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়, যেমন:
* অ্যাটাজানাভির (Atazanavir)।
* ইনডিনাভির (Indinavir)।
৩. মূত্রবর্ধক ওষুধ (Diuretics/Water Pills)
কিছু মূত্রবর্ধক ওষুধ প্রস্রাবের মাধ্যমে অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম নিঃসরণ করে পাথরের ঝুঁকি বাড়াতে পারে:
* ট্রায়ামটেরিন (Triamterene)।
* লুপ ডাইইউরেটিকস (Loop Diuretics) যেমন - ফিউরোসেমাইড।
৪. প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর (Proton Pump Inhibitors - PPIs)
পেটের অ্যাসিড কমাতে ব্যবহৃত কিছু ওষুধ, যেমন:
* ল্যান্সোপ্রাজল (Lansoprazole/Prevacid)।
* অন্যান্য PPI ওষুধ।
৫. মৃগীরোগ এবং মাইগ্রেনের ওষুধ (Anti-epileptic and Migraine Drugs)
কিছু অ্যান্টি-সিজার বা মৃগীরোগের ওষুধ, যেমন:
* টোপিরামেট (Topiramate/Topamax)।
৬. ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট (Calcium and Vitamin D Supplements)
অতিরিক্ত পরিমাণে ক্যালসিয়াম বা ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে তা প্রস্রাবে ক্যালসিয়ামের মাত্রা বাড়িয়ে পাথর তৈরি করতে পারে।
৭. কার্বনিক অ্যানহাইড্রোজ ইনহিবিটরস (Carbonic Anhydrase Inhibitors)
এই ওষুধগুলি শরীরে অ্যাসিড-বেসের ভারসাম্য পরিবর্তন করে পাথর সৃষ্টিতে সাহায্য করতে পারে, যেমন:
* অ্যাসেটাজোলামাইড (Acetazolamide)।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় কি পাথর বেরিয়ে যায় ?
হ্যাঁ, যদি পাথরগুলো ৬ মিমি বা তার চেয়ে ছোট হয়, হোমিওপ্যাথিক ওষুধের মাধ্যমেই বেরিয়ে যায়। ৮ মিমি পর্যন্ত আকারের পাথর হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা দ্বারা চেষ্টা করা যেতে পারে, কিন্তু যদি এটি ৯-১০ মিমি অথবা তার বেশি হয়, তাহলে অপারেশনের প্রয়োজন হবে।