23/07/2026
রাত ২টায় তানভীর কে হাসপাতালের ইমার্জেন্সি তে নেওয়া হলো, যন্ত্রণায় ছটফট করছিল। কিন্তু তার শেষ ৫ বছরের জীবনটা খুব স্বাভাবিকই মনে হবে আমার আপনার কাছে।
তানভীরের বয়স ৩২। একটা প্রাইভেট কোম্পানি তে চাকরি করে, সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চেয়ারে বসে বসে কাজ। তার টেবিলেই একটা মগ থাকে সবসময়; তবে সেটা পানির না, চায়ের। দিনে ৬-৭ কাপ চা খাওয়া হলেও কাজের চাপে পানি খাওয়ার কথা মাথাতেই আসতো না।
টয়লেটে যাওয়ার সময়টুকুও মাঝেমাঝে বের করতে পারত না! মিটিংয়ের পর মিটিং, ডেডলাইনের চাপ, অনেক সময় আলসেমির কারণে প্রস্রাবের বেগ আটকে রাখতো। দিনে প্রস্রাব হতো মাত্র ২-৩ বার, রং গাঢ় হলুদ। অবশ্য এটা এত গায়ে লাগাননি, ব্যস্ত মানুষ আমি প্রস্রাব একটু হলুদ তো হবেই।
দুপুরের খাবারে প্রায়ই থাকতো পালং শাক ভাজি বা ডাল, আর বাইরের খাবারে তো লবণের পরিমাণ একটু বেশিই থাকে। রাতে বাসায় ফিরে ক্লান্ত শরীরে ভারী খাবার খেয়েই সোজা ঘুম।
এভাবেই কেটে গেল ৫টা বছর।
কিন্তু তার শরীরের ভেতরের গল্পটা অন্যরকম ছিল। প্রতিদিন কিডনি রক্ত থেকে ক্যালসিয়াম আর অক্সালেট ছেঁকে বের করছিল। কিন্তু পর্যাপ্ত পানি না থাকায় প্রস্রাব হয়ে উঠছিল এক অতি-ঘন একটা দ্রবণ, যেখানে এই উপাদানগুলো খুব সহজেই জমাট বাঁধতে শুরু করে।
লবণ বেশি খাওয়ার কারণে কিডনি বেশি ক্যালসিয়াম প্রস্রাবে ছেড়ে দিচ্ছিল, আর সেই ক্যালসিয়াম গিয়ে মিশছিল শাক-সবজির অক্সালেটের সাথে। ধীরে ধীরে, একদম নীরবে তৈরি হচ্ছিল ছোট ছোট পাথর। তানভীর কিন্তু কিচ্ছু টের পাননি, মাঝে মাঝে কোমরে একটু চিনচিন ব্যাথা করতো অল্প কিছুক্ষণের জন্য, আবার নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যেত, তবে কোনো স্পষ্ট লক্ষণ ছিল না।
একদিন রাতে, অফিস থেকে ফিরে ডিনার করার পরপরই হঠাৎ ডান কোমরে শুরু হলো তীব্র ব্যথা। এরকম ব্যাথা তার জীবনে কখনো হয়নি। ব্যথাটা কোমর থেকে শুরু হয়ে পেটের নিচের দিকে নামতে লাগলো; ঢেউয়ের মতো, একবার প্রচণ্ড বাড়ে, একটু কমে, আবার বাড়ে।
সাথে বমি বমি ভাব, পুরো গা ঘেমে একাকার অবস্থা।
তানভীর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলেন না, বসেও কোনো শান্তি পাচ্ছিলেন না। পরিবার তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেল।
রাত ২টায় ইমার্জেন্সিতে ডাক্তার যখন জিজ্ঞেস করলেন ব্যথার ধরন, তানভীর শুধু বলতে পারলেন — "মনে হচ্ছে ভেতর থেকে কেউ মোচড় দিয়ে ধরে রেখেছে।"
সকালে আল্ট্রাসাউন্ড আর CT scan করা হলো, ধরা পড়লো আসল ঘটনা। ডান কিডনি থেকে একটা ৬ মিলিমিটারের পাথর সরে এসে ইউরেটারে (মূত্রনালী) আটকে গেছে। মূত্রনালী তখন নিজে থেকেই সংকুচিত হয়ে পাথরটাকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করছিল, আর সেই চাওএর কারণেই তৈরি করছিল ওই অসহ্য ব্যথা।
তানভীরের প্রশ্ন ছিল, "আমার তো কখনো কোনো লক্ষণই ছিল না, তাহলে হঠাৎ এটা হলো কীভাবে?"
উত্তরটা হলো। এই পাথর একদিনে হয়নি। বছরের পর বছর ধরে শরীর নীরবে এটা জমাচ্ছিল, শুধু সেই রাতে এসে জানান দিল।
এই গল্প থেকে আমাদের কি শেখার আছে
১. দিনে অন্তত ২.৫ থেকে ৩ লিটার পানি পান করুন। আপনার জন্য যতটুকু পর্যাপ্ত ততটুকু পান করুন। চা-কফি কিন্তু পানির অভাব পূরণ করে না।
২. প্রস্রাবের রঙের দিকে খেয়াল রাখুন। প্রস্রাব হালকা হলুদ বা প্রায় ক্লিয়ার হওয়া উচিত।
৩. খাবারে লবণের পরিমাণ একদম নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
৪. পালং শাক বা অক্সালেট-যুক্ত খাবার পুষ্টিকর, তাই এগুলো পুরোপুরি বাদ দেওয়ার দরকার নেই; তবে সাথে পর্যাপ্ত পানি খাওয়া আর খাবারে ভারসাম্য রাখা জরুরি।
আমাদের শরীর অনেক সময় কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই বছরের পর বছর অনেক কিছু সহ্য করে যায়। আমানত হিসেবে পাওয়া এই শরীরটার সঠিক যত্ন নেওয়া কিন্তু আমাদেরই দায়িত্ব।
সবাই সচেতন হোন, সুস্থ থাকুন 💝
- সুস্থ থাকি with Shahriar