আদর্শ হোমিও চেম্বার

আদর্শ হোমিও চেম্বার 🌿 Adarsha Homeo

Dr. Md. Moshiur Rahman Khan, DHMS.

Trusted homeopathic care for allergies, skin diseases, white discharge, menstrual problems, infertility, piles, tumors, joint pain, tonsils & more.
📍Lawhati Bazar | 📞01774931414

29/08/2026

শরীরে হঠাৎ চুলকানি শুরু হয়েছে? চুলকাতে চুলকাতে ছোট ছোট গোটা বা পানিভরা ফুসকুড়ি তৈরি হচ্ছে?

ত্বকের সমস্যায় শুধু বাহ্যিক লক্ষণ নয়—চুলকানি কখন বাড়ে, কীভাবে প্রকাশ পায় এবং অন্যান্য লক্ষণগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।

🌿 লক্ষণকে বুঝুন, সঠিক পরামর্শ নিন।

আদর্শ হোমিও চেম্বার
📍 লাওহাটি বাজার, দেলদুয়ার, টাঙ্গাইল
📞 01774-931414

#আদর্শহোমিওচেম্বার #চুলকানি #ত্বকেরসমস্যা

চু🌿লকানি, গোটা ও পানিভরা ফুসকুড়ি?🌿 “ডাক্তার সাহেব, চুলকানিটা কিছুতেই কমছে না…”প্রথমে সামান্য চুলকানি ছিল। ভেবেছিলাম হয়তো...
28/08/2026

চু🌿লকানি, গোটা ও পানিভরা ফুসকুড়ি?

🌿 “ডাক্তার সাহেব, চুলকানিটা কিছুতেই কমছে না…”

প্রথমে সামান্য চুলকানি ছিল। ভেবেছিলাম হয়তো সামান্য অ্যালার্জি। কিন্তু কয়েকদিন পর চুলকানি বাড়তে শুরু করল। রাতে ঘুমানোর সময় আরও বেশি অস্বস্তি—বারবার চুলকাতে হচ্ছে।

এমন চুলকানির কারণ সবার ক্ষেত্রে এক নয়। তাই শুধু চুলকানি দেখেই নয়, কখন বাড়ে, কোথায় হয় এবং কীভাবে প্রকাশ পায়—এসব লক্ষণও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

🌿 চুলকানিকে অবহেলা করবেন না।

আদর্শ হোমিও চেম্বার
আপনার সমস্যার কথা শুনে, লক্ষণ অনুযায়ী পরামর্শ।

✨ ৩৮ বছরের আস্থায় এবার যুক্ত হলো সিরামের আধুনিক কার্যকারিতা!দাগছোপ ও অসমান ত্বকের যত্নে রেমি স্পট ক্রিম—ত্বকের গভীর যত্ন...
28/08/2026

✨ ৩৮ বছরের আস্থায় এবার যুক্ত হলো সিরামের আধুনিক কার্যকারিতা!

দাগছোপ ও অসমান ত্বকের যত্নে রেমি স্পট ক্রিম—ত্বকের গভীর যত্নে সহায়তা করে এবং ত্বককে করে তোলে আরও মসৃণ, সতেজ ও উজ্জ্বল।

🌿 নিয়মিত ব্যবহারে ত্বকের যত্নে আনুন নতুন আত্মবিশ্বাস।
✨ সুন্দর ও উজ্জ্বল ত্বকের জন্য বেছে নিন রেমি স্পট ক্রিম।

আজ থেকেই শুরু হোক আপনার ত্বকের বিশেষ যত্ন।

🌿 একটি রোগীর আত্মকথাপর্ব ৫ — রোগীর গল্প থেকে রেমিডির আত্মপ্রকাশআজ রোগী চেম্বারে এলেন। বয়স প্রায় ৫০। বসতেই হাঁটুর দিকে হা...
23/08/2026

🌿 একটি রোগীর আত্মকথা

পর্ব ৫ — রোগীর গল্প থেকে রেমিডির আত্মপ্রকাশ

আজ রোগী চেম্বারে এলেন। বয়স প্রায় ৫০। বসতেই হাঁটুর দিকে হাত রেখে বললেন, “ডাক্তার সাহেব, ব্যথাটা খুব বেশি না, কিন্তু হাঁটাচলা করলেই বাড়ে। একটু নড়াচড়া করলেই যেন হাঁটুর ভেতরটা টনটন করে ওঠে। স্থির হয়ে বসে থাকলে বরং ভালো লাগে।”

আমি কিছু না বলে শুনছিলাম। রোগীকে তার নিজের ভাষায় কথা বলতে দিলাম। তিনি আবার বললেন, “তাই এখন অযথা হাঁটাহাঁটি করতে ইচ্ছে করে না। চুপচাপ বসে থাকলেই ভালো লাগে।”

কথার মাঝেই আমি লক্ষ করলাম, তাঁর ঠোঁট ও মুখ কিছুটা শুষ্ক। পানি চাইলেন। এক গ্লাস পানি শেষ করার পর বললেন, “আরেকটু পানি দেবেন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তৃষ্ণা কি সবসময় বেশি?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ, বেশ ভালোই তৃষ্ণা লাগে। আর পানি খেলে অল্প অল্প করে নয়, একসঙ্গে বেশ কিছুটা খেতে ভালো লাগে।”

কোষ্ঠকাঠিন্যের কথা জিজ্ঞেস করতেই বললেন, “পায়খানা শক্ত হয়, শুকনো ধরনের। নিয়মিত হলেও সহজে বের হতে চায় না।”

আমি এবার তাঁর কথাগুলো নোটে লিখতে শুরু করলাম। কিন্তু কেসের আরেকটি দিক তখনও বাকি ছিল—মানুষটি নিজে।

কথা বলতে বলতে জানা গেল, তিনি ব্যবসা করেন। ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিজের হাতেই রাখতে অভ্যস্ত। কর্মচারীদের ওপর দায়িত্ব দিতে পারেন, কিন্তু শেষ সিদ্ধান্তটা নিজের কাছেই রাখতে চান। অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা তাঁর ভালো লাগে না। অসুস্থ অবস্থায়ও কেউ বারবার জিজ্ঞেস করলে বিরক্ত হন। বললেন, “ব্যথার সময় শুধু একটু শান্তিতে থাকতে চাই। বেশি কথা শুনতে ভালো লাগে না।”

আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। কারণ এখন আর শুধু “হাঁটুর ব্যথা” দেখছি না। রোগীর শারীরিক লক্ষণ, সাধারণ লক্ষণ, মানসিক প্রতিক্রিয়া এবং suffering-এর ধরন—সব মিলিয়ে একটি ছবি তৈরি হচ্ছে।

রোগী চলে যাওয়ার পর আমি আবার তাঁর কথাগুলো একে একে পড়লাম। হাঁটুর ব্যথা নড়াচড়ায় বাড়ছে—তাই নোট করলাম, Knee pain — motion aggravates. তিনি স্থির থাকলে আরাম পান—Generalities — rest ameliorates. শরীরের শুষ্কতা ও তার সঙ্গে প্রবল তৃষ্ণা—বিশেষ করে একবারে অনেক পানি পান করার প্রবণতা—আমার নজরে এলো। এরপর শক্ত, শুকনো মল—Constipation — hard, dry stool. আর মানসিক দিক থেকে—ব্যথার সময় বিরক্তি ও disturbance এড়ানোর ইচ্ছা—Mind — irritability; desire for quiet.

এগুলো আলাদা আলাদা লক্ষণ হিসেবে দেখলে হয়তো খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু যখন একসঙ্গে রাখলাম, তখন কেসটির ভেতরের একটি নির্দিষ্ট pattern ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠল।

Dryness + great thirst for large quantities + hard/dry stool + pain worse from motion + better by rest + irritability and desire for quiet.

এবার আমি রোগের নামের দিকে তাকালাম না। হাঁটুর ব্যথার জন্য কোনো remedy খুঁজলাম না। বরং রোগীর Totality-কে সামনে রাখলাম—কোন remedy-picture এই সম্পূর্ণ মানুষের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্য তৈরি করছে?

Materia Medica-এর সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে দেখতে একটি পরিচিত ছবি ধীরে ধীরে সামনে এলো—

🌿 Bryonia alba

এখানে Bryonia শুধু হাঁটুর ব্যথার কারণে সামনে আসেনি। রোগীর শুষ্কতা, প্রচণ্ড তৃষ্ণা, একবারে অনেক পানি পান করার প্রবণতা, শক্ত-শুষ্ক মল, নড়াচড়ায় ব্যথা বৃদ্ধি, স্থিরতায় আরাম এবং বিরক্ত হয়ে শান্তিতে থাকতে চাওয়ার প্রবণতা—সবগুলো মিলেই remedy-picture-টিকে শক্তিশালী করেছে।

অর্থাৎ কেসটি আমাদের একটি পথ দেখাল—

রোগীর কথা → লক্ষণ → লক্ষণ থেকে Rubric → Keynotes → Totality → Materia Medica → Remedy

আর সেই পথের শেষে আজকের রোগীর জন্য যে পরিচিত নামটি স্পষ্ট হয়ে উঠল—

🌿 Bryonia alba

রোগের নাম নয়, রোগীকে পড়া—সেখান থেকেই রেমিডির আত্মপ্রকাশ।

22/08/2026

🌿 একটি রোগীর আত্মকথা

পর্ব ৪ — এবার আমি একটু থামতে শিখলাম

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙার পর জানালার বাইরে তাকিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিলাম। উঠানের একপাশে রাতের শিশির তখনও শুকায়নি। দূরে রাস্তা দিয়ে মানুষ কাজে যাচ্ছে, পাশের বাড়ির উঠানে ছোট্ট মেয়েটা মায়ের সঙ্গে কথা বলতে বলতে স্কুলের জন্য তৈরি হচ্ছে। প্রতিদিনের মতো পৃথিবী তার নিজের নিয়মে চলছে। অথচ আমার ভেতরে যেন কিছু একটা বদলে গেছে। হাঁটুর ব্যথা এখনও আছে, শরীরের ভেতরে সেই শুষ্কতা, মুখে তৃষ্ণা—সবই আছে। কিন্তু আজ আর মনে হলো না যে শরীর আমাকে বাধা দিচ্ছে। বরং মনে হলো, এতদিন পরে সে হয়তো আমার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছে।

নাশতার টেবিলে স্ত্রী চুপচাপ আমার সামনে খাবার রেখে বলল, “আজ অফিসে যাবেন?” প্রশ্নটা খুব সাধারণ ছিল, কিন্তু আমি কিছুক্ষণ উত্তর দিতে পারলাম না। এত বছর ধরে এই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে কখনো ভাবার বিষয় ছিল না। অফিস মানেই যেতে হবে, ব্যবসা মানেই দায়িত্ব, দায়িত্ব মানেই আমি। কিন্তু সেদিন বললাম, “আজ একটু পরে যাব।” স্ত্রী আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। সে কিছু বলল না, শুধু আমার চায়ের কাপটা একটু কাছে এগিয়ে দিল। সেই ছোট্ট হাসির মধ্যে এত বছরের সংসারের কত কথা যেন লুকিয়ে ছিল—অভিমান, ভালোবাসা, অপেক্ষা, আর একসঙ্গে পার করে আসা অসংখ্য দিন।

ছেলে কিছু ব্যবসায়িক কাগজ নিয়ে আমার সামনে এসে বসলো। বলল, “আব্বু, এই বিষয়টা আমি আজ সামলে নিতে পারব। আপনি শুধু একবার দেখে দিন।” আগে হলে হয়তো আমি পুরো বিষয়টা নিজের হাতে নিয়ে নিতাম। কিন্তু সেদিন কাগজগুলো তার দিকে ফিরিয়ে দিয়ে বললাম, “তুই কর। ভুল হলে আমি আছি।” ছেলে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হেসে বলল, “আপনি সত্যিই বদলাচ্ছেন।” আমিও হাসলাম। মনে হলো, এতদিন ধরে সন্তানদের বড় করেছি নিজের ছায়ার নিচে রেখে; আজ হয়তো তাদের একটু নিজের আলোয় দাঁড়ানোর সময় হয়েছে।

জীবনে দায়িত্বেরও একটা বয়স আছে। ছোটবেলায় বাবা আমাদের দায়িত্ব নেন, যৌবনে আমরা বাবা-মায়ের দায়িত্ব নিই, তারপর নিজের সংসার, সন্তান, কর্মচারী, ব্যবসা—সবকিছু কাঁধে এসে বসে। একসময় মনে হয়, সবকিছু নিজের হাতে না রাখলে পৃথিবীটা বুঝি থেমে যাবে। অথচ সত্যিটা হলো, পৃথিবী কখনো কারও জন্য থেমে থাকে না। আমরা না থাকলেও সন্তানরা বড় হয়, ব্যবসা চলে, সংসার চলে, সকাল আসে, সন্ধ্যা নামে। তখন বুঝতে হয়—দায়িত্ব মানে সবকিছু আঁকড়ে ধরে রাখা নয়; প্রয়োজনের সময় দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়াও ভালোবাসার একটি রূপ।

দুপুরের দিকে হাঁটুর ব্যথাটা আবার একটু বেড়ে গেল। চেয়ার থেকে উঠতে গিয়ে থেমে গেলাম। কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আগে এমন হলে নিজের ওপরই বিরক্ত হতাম—“এই সামান্য ব্যথার জন্যও কি থামতে হবে?” কিন্তু আজ নিজেকে বললাম, “ধীরে।” এক পা, তারপর আরেক পা। আশ্চর্য, ধীরে হাঁটলে পথটা যেন ছোট হয়ে আসে। এতদিন আমি শুধু দ্রুত পৌঁছাতে চেয়েছি; আজ প্রথমবার পথটাকেও অনুভব করলাম।

পানি খেতে গিয়ে আবার মনে হলো, আমার তৃষ্ণাটাও যেন আমার জীবনের মতো—অল্পে তৃপ্ত হয় না। এক গ্লাস শেষ করে আরেক গ্লাস নিলাম। গলা শুকিয়ে গেলে শরীর যেন একবারে অনেকটা পানি চায়। স্ত্রী দূর থেকে তাকিয়ে বলল, “আপনি একটু একটু করে খেলেও তো পারেন।” আমি হেসে বললাম, “আমার শরীর বোধহয় একটু বেশি চায়।” সে বলল, “আপনার শরীর না, আপনার জীবনটাই সবসময় একটু বেশি চেয়েছে।” কথাটা শুনে আমি হেসে ফেললাম। কিন্তু তার কথার ভেতরের সত্যিটা মনে গেঁথে রইল। এতদিন আমি সংসারের জন্য বেশি চেয়েছি, ব্যবসার জন্য বেশি চেয়েছি, সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য বেশি চেয়েছি। নিজের জন্য কী চেয়েছি?

সম্ভবত খুব সামান্য।

একটু শান্তি।

একটু নিশ্চিন্ত ঘুম।

প্রিয় মানুষের পাশে বসে থাকা।

আর নিজের শরীরটাকে একটু সময় দেওয়া।

সন্ধ্যায় মেয়ে আমার পাশে এসে বসল। হাতে এক কাপ চা। বলল, “বাবা, মনে আছে ছোটবেলায় আমি আপনার হাত ধরে হাঁটতাম?” আমি হেসে বললাম, “মনে আছে। তখন তো তুই হাঁটতেই পারতিস না।” সে বলল, “এখন আপনি হাঁটতে পারছেন না, তাই আমি আপনার পাশে হাঁটব।” কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। চোখের দিকে তাকাতে পারলাম না। বাইরে তাকিয়ে রইলাম। মনে হলো, জীবন সত্যিই একটা বৃত্ত। যে হাত একদিন শিশুকে ধরে হাঁটতে শেখায়, সময়ের শেষে সেই হাতই সন্তানের সঙ্গ চায়।

রাতে আমরা সবাই একসঙ্গে খেতে বসলাম। বহুদিন পর খাওয়ার টেবিলে ব্যবসার আলোচনা খুব বেশি হলো না। ছেলে তার নতুন পরিকল্পনার কথা বলল, মেয়ে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলল, স্ত্রী পুরোনো একটা ঘটনা মনে করিয়ে সবাইকে হাসাল। আমি চুপচাপ তাদের দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল, এতদিন আমি এই পরিবারটির জন্য দৌড়েছি, অথচ আজ প্রথমবার তাদের পাশে বসে পরিবারটাকে দেখছি। তাদের হাসি দেখছি, চোখের ভাষা দেখছি, একে অপরের প্রতি মায়া দেখছি। বুঝলাম, সংসার শুধু খরচ চালানোর নাম নয়। সংসার হলো মানুষের পাশে থাকা।

রাত গভীর হলে সবাই ঘুমিয়ে গেল। আমি বিছানায় শুয়ে রইলাম। হাঁটুর নিচে আবার বালিশ। পাশ ফিরতে ইচ্ছে হলো না। স্থির হয়ে শুয়ে থাকতেই ভালো লাগছিল। ঘরের নীরবতা যেন আজ বিরক্তিকর লাগছিল না। বরং মনে হচ্ছিল, এই নীরবতারও একটা ভাষা আছে। শরীর বলছে—স্থির থাকো। মন বলছে—সব হিসাব আজ না করলেও চলবে। আর হৃদয় বলছে—যাদের জন্য এতদিন ছুটেছ, তাদের কাছে তুমি এখনও প্রয়োজনীয়; তবে তাদের ভালোবাসা পেতে তোমাকে সবসময় শক্ত থাকার অভিনয় করতে হবে না।

আমি চোখ বন্ধ করলাম। মনে পড়ল বাবার কথা—“সংসারের দায়িত্ব নিলে পিছনে তাকাস না।” এত বছর আমি কথাটার এক অর্থই বুঝেছিলাম। আজ মনে হলো, দায়িত্বের আরেকটি অর্থও আছে—নিজের দিকে ফিরে তাকানো। কারণ যে মানুষটি নিজেকে পুরোপুরি শেষ করে ফেলে, সে দীর্ঘদিন অন্যদের আগলে রাখতে পারে না।

আমার হাঁটুর ব্যথা হয়তো একদিন কমবে, হয়তো আবার বাড়বে। শরীরের শুষ্কতা, তৃষ্ণা, কোষ্ঠকাঠিন্য—এসবও হয়তো জীবনের কোনো এক পর্যায়ে বদলে যাবে। কিন্তু এই কয়েকটি দিনের অভিজ্ঞতা আমাকে এমন একটি শিক্ষা দিয়েছে, যা কোনো ব্যবসায়িক হিসাব আমাকে শেখাতে পারেনি। শরীর কখনো কখনো আমাদের থামিয়ে দেয়, যাতে আমরা দেখতে পাই—আমরা কোথা থেকে এসেছি, কারা আমাদের পাশে আছে এবং এতদিন কাদের জন্য পথ চলেছি।

সেদিন রাতে ঘুমিয়ে পড়ার আগে শেষবারের মতো জানালার দিকে তাকালাম। বাইরে অন্ধকার। কিন্তু অন্ধকারের ওপারে আবার একটি সকাল অপেক্ষা করছে। হয়তো আগামীকাল আবার ব্যবসার ফোন আসবে, নতুন হিসাব হবে, নতুন দায়িত্ব আসবে। আমি আবার কাজ করব। কারণ দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যাওয়াও আমার স্বভাব নয়। কিন্তু এবার হয়তো একটা পার্থক্য থাকবে—সব দায়িত্ব একা কাঁধে তুলে নেব না।

কিছুটা ছেলের হাতে দেব।

কিছুটা মেয়ের হাতে দেব।

কিছুটা স্ত্রীর ভালোবাসায় ছেড়ে দেব।

আর কিছুটা নিজের শরীরের জন্য রেখে দেব।

কারণ শেষ পর্যন্ত বুঝেছি—

জীবন শুধু কতটা অর্জন করলাম তার হিসাব নয়;
জীবন হলো কতটা ভালোবাসলাম,
কতটা পাশে থাকলাম,
আর যারা আমাকে ভালোবাসে—
তাদের ভালোবাসা কতটা গ্রহণ করতে পারলাম, তারও হিসাব।

হাঁটুর ব্যথা আমাকে থামিয়েছে।

তৃষ্ণা আমাকে শরীরের কথা শুনিয়েছে।

শুষ্কতা আমাকে ভেতরের শূন্যতার কথা মনে করিয়েছে।

আর পরিবারের ভালোবাসা আমাকে শিখিয়েছে—
সবসময় শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিও কখনো কখনো কারও কাঁধে মাথা রাখতে পারে।

সেদিন প্রথমবার মনে হলো, হয়তো সুস্থ হয়ে ওঠার শুরুটা শুধু শরীর থেকে নয়—নিজের জীবনকে নতুন করে দেখার জায়গা থেকেও হতে পারে।

আমি হাসলাম।

চোখ বন্ধ করলাম।

আর বহুদিন পর মনে হলো—

আজ কোনো হিসাব বাকি নেই।

সমাপ্ত।

🌿 একটি রোগীর আত্মকথা — সমাপ্ত

শরীরের লক্ষণ কখনো কখনো একটি মানুষের জীবনের গল্পের দরজাও খুলে দেয়। সেই গল্প বুঝতে হলে শুধু ব্যথার জায়গা নয়—মানুষটির জীবন, অনুভূতি, অভ্যাস, সম্পর্ক ও অন্তর্জগতকেও শুনতে হয়।

21/08/2026

🌿 একটি রোগীর আত্মকথা ( রেমিডি -২)

পর্ব ৩ — যেদিন পুরোনো হিসাবের খাতা খুলে গেল

কিছু রাত আসে, যখন ঘুম আসে না—কিন্তু তার কারণ শুধু শরীরের ব্যথা নয়। বিছানায় শুয়ে থাকতে থাকতে জীবনের পুরোনো দরজাগুলো একে একে খুলে যায়। ভুলে যাওয়া মুখ মনে পড়ে, পুরোনো কথাগুলো আবার কানে বাজে, আর মানুষ হঠাৎ আবিষ্কার করে—তার বুকের ভেতর কত কথা জমে আছে, অথচ কাউকে কোনোদিন বলা হয়নি। সেদিনও তেমন একটি রাত ছিল। ঘরের সবাই ঘুমিয়ে গেছে। স্ত্রী আমার পাশে শান্ত হয়ে শুয়ে আছে। ছেলের ঘরের দরজা বন্ধ, মেয়ের ঘর থেকেও কোনো শব্দ নেই। অথচ আমার চোখে ঘুম নেই। হাঁটুর নিচে বালিশ দিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে আছি। পাশ ফিরতে ইচ্ছে করছে না। একটু নড়লেই হাঁটুর ভেতর থেকে ব্যথা যেন আমাকে সতর্ক করে দেয়—“স্থির থাকো।” আমি স্থির হয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

হঠাৎ মনে হলো, এই পঞ্চাশ বছরে আমি আসলে কতটা পথ হেঁটেছি! শুধু রাস্তার পথ নয়—দায়িত্বের পথ। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে বাজারে যেতাম। বাবার একটা ছোট ব্যবসা ছিল। খুব বেশি টাকা ছিল না, কিন্তু সংসার চালানোর জন্য তাঁর মুখে কখনো হতাশা দেখিনি। একদিন দোকান বন্ধ করার সময় বাবা আমার কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন, “জীবনে সংসারের দায়িত্ব নিলে পিছনে তাকাস না। যত কষ্টই হোক, মানুষকে ধরে রাখতে হয়।” তখন কথাটার গভীরতা বুঝিনি। আজ বুঝি। বাবা নেই বহু বছর। অথচ তাঁর সেই কথাটা এখনও আমার জীবনের ভিতরে কোথাও বাজে—পিছনে তাকাস না।

আমি সত্যিই পিছনে তাকাইনি। ব্যবসায় লোকসান হয়েছে—চুপ থেকেছি। পকেট খালি হয়েছে—স্ত্রীকে বুঝতে দিইনি। কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার সময় নিজের প্রয়োজন পিছিয়ে দিয়েছি। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে গিয়ে নিজের কত ইচ্ছা যে মাটিচাপা দিয়েছি, তার হিসাব নেই। তখন মনে হতো, এটাই তো পুরুষের দায়িত্ব—নিজে কষ্ট পাবে, কিন্তু পরিবারের মানুষকে কষ্ট পেতে দেবে না। হয়তো সেই থেকেই আমার একটা স্বভাব তৈরি হয়েছে—কষ্ট হলে চুপ থাকা, সমস্যা হলে নিজেই সামলানো, আর যতক্ষণ সম্ভব কাজ করে যাওয়া। কেউ বেশি প্রশ্ন করলে বিরক্তি আসে, কেউ একই কথা বারবার বললে ভালো লাগে না। মনে হয়, যা বলার সরাসরি বলো, তারপর আমাকে আমার কাজ করতে দাও। কখন যে এই স্বভাবটা আমার চরিত্রের অংশ হয়ে গেছে, বুঝতেই পারিনি।

স্ত্রী হঠাৎ ঘুমের মধ্যে একটু নড়েচড়ে উঠল। চোখ না খুলেই বলল, “ঘুমাননি?” আমি আস্তে বললাম, “না।” সে জিজ্ঞেস করল, “হাঁটু ব্যথা করছে?” আমি বললাম, “একটু।” সে উঠে বসতে চাইল। আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, “না, না। তুমি শুয়ে থাকো। কিছু লাগবে না।” সে আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। বলল, “আপনি এখনও আগের মতোই আছেন।” আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, “কীভাবে?” সে বলল, “অসুবিধা হলেও কাউকে কিছু বলতে চান না।” আমি চুপ করে গেলাম। এই মানুষটির সঙ্গে আমার এত বছরের সংসার। কত সুখ-দুঃখ একসঙ্গে পার করেছি। অথচ আমার ভেতরের অনেক কষ্টই সে জানে না। ভালোবাসা সত্যিই অদ্ভুত—কখনো কখনো যাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি, তার কাছেই নিজের দুর্বলতাটা প্রকাশ করতে সবচেয়ে বেশি সংকোচ হয়। মনে হয়, “আমি দুর্বল হয়ে গেলে, ওরা ভরসা করবে কাকে?”

ভোরের দিকে একটু ঘুম এসেছিল। সকালে ছেলে এসে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বলল, “আব্বু, আজ অফিসে না গেলেও হবে।” আমি বললাম, “কেন?” সে বলল, “আপনার হাঁটুর অবস্থা ভালো না। আজ একটু বিশ্রাম নিন। অফিস আমরা সামলে নেব।” আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, “তুমি কি এখন আমাকে শেখাবে কখন অফিসে যেতে হবে?” কথাটা মুখ থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বুঝলাম—আমি একটু বেশি কঠিন হয়ে গেছি। ছেলে চুপ করে গেল। তার চোখে যে কষ্টটা দেখলাম, সেটা হাঁটুর ব্যথার চেয়েও বেশি লাগল। আমি তাকে ডাকলাম, “এই শোন।” সে ফিরে তাকাল। আমি একটু নরম হয়ে বললাম, “রাগ করিস না। ব্যথার জন্য মেজাজটা খারাপ হয়ে গেছে।” সে মৃদু হেসে বলল, “আমি জানি, আব্বু।” তারপর কাছে এসে খুব শান্ত গলায় বলল, “আপনি আমাদের ওপর রাগ করতে পারেন। কিন্তু নিজের ওপর এত রাগ করবেন না।” আমি থেমে গেলাম। নিজের ওপর রাগ? হয়তো সত্যিই করি। বয়স বাড়ছে—এটা মেনে নিতে পারি না। শরীর আগের মতো চলছে না—এটা মেনে নিতে পারি না। যে কাজগুলো একসময় একাই করতাম, সেগুলো এখন অন্যের হাতে তুলে দিতে হচ্ছে—এটাও মেনে নিতে কষ্ট হয়। হয়তো আমি শুধু রোগের সঙ্গে লড়ছি না; আমি লড়ছি নিজের বদলে যাওয়া বয়সের সঙ্গে।

দুপুরে অফিস থেকে একের পর এক ফোন এলো। একটা shipment আটকে আছে, একজন গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা কিছু পরিবর্তন চেয়েছে, একটা payment এখনও আসেনি। একজন কর্মচারীও ভুল করেছে। আমি একটার পর একটা ফোন করলাম, নির্দেশ দিলাম, হিসাব মিলালাম, সমস্যার সমাধান করলাম। সবাই আমার কাছে উত্তর চায়। কারণ এত বছর ধরে আমি তাদের শিখিয়েছি—সমস্যা হলে আমার কাছে আসতে। কিন্তু ফোনগুলো শেষ হওয়ার পর যখন ঘরটা একটু নীরব হলো, তখন হঠাৎ বুঝলাম—আমার নিজের শরীরের সমস্যার উত্তরটাই আমি জানি না। চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করলাম। একজন কর্মচারী এসে বলল, “স্যার, একটু হাঁটবেন? সারাদিন বসে আছেন।” আমি বললাম, “না। এখন না। আমাকে একটু শান্তিতে থাকতে দিন।” কথাটা খুব সাধারণ, কিন্তু নিজের কানে শুনে মনে হলো, এই কথাটা শুধু আজকের নয়। হয়তো বহু বছর ধরে আমার ভেতরে একটা কথাই ছিল—আমাকে একটু শান্তিতে থাকতে দাও; আমাকে আমার মতো কাজ করতে দাও; অপ্রয়োজনীয় কথা বলো না; আমার কাজে বাধা দিও না; আমাকে আমার দায়িত্বটা শেষ করতে দাও। হয়তো আমার হাঁটুর ব্যথার সঙ্গে আমার স্বভাবেরও একটা পুরোনো সম্পর্ক আছে। শরীর এখন নড়াচড়া কমাতে চাইছে, আর মন চাইছে সবকিছু নিজের মতো চলুক।

বিকেলে মেয়ে এসে আমার পাশে বসে বলল, “বাবা, আপনি ছোটবেলায় কেমন ছিলেন?” আমি হেসে বললাম, “হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?” সে বলল, “জানতে ইচ্ছে করছে।” অনেকদিন পর আমি নিজের শৈশবের কথা বলতে শুরু করলাম—বাবার ছোট দোকান, বর্ষার কাদামাখা রাস্তা, মায়ের রান্নাঘর, ঈদের নতুন জামা, বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে ফুটবল খেলা, সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলে মায়ের বকুনি। কী আশ্চর্য—এত বছর পর সেইসব স্মৃতি এখনও কত জীবন্ত! গল্প করতে করতে একসময় নিজেই হেসে ফেললাম। মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “বাবা, আপনাকে আজ অনেকদিন পর এত হাসতে দেখলাম।” আমি চুপ করে গেলাম। হয়তো জীবন আমাদের খুব ধীরে ধীরে বদলে দেয়। একসময় আমরা শুধু বাঁচি, তারপর সংসার করি, দায়িত্ব নিই, সন্তানদের বড় করি। তারপর তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে ভাবতে একদিন বুঝতে পারি—নিজের জীবনের কতটা সময় আমরা শুধু দায়িত্বের পেছনে রেখে এসেছি।

রাতে স্ত্রী আমার জন্য এক গ্লাস পানি এনে টেবিলে রেখে দিল। আমি গ্লাসটা হাতে নিয়ে একবারে অনেকটা পানি খেলাম। সে বলল, “আস্তে খান।” আমি মৃদু হেসে বললাম, “আমার তৃষ্ণাটা একটু অন্যরকম।” সে হেসে বলল, “আপনার সবকিছুই একটু অন্যরকম।” আমি বললাম, “হয়তো।” তারপর হাঁটুর দিকে তাকালাম। ব্যথা আছে। শরীরের শুষ্কতা আছে। বিশ্রাম চাইছে শরীর। কিন্তু আশ্চর্য—আজ আর শরীরের ওপর রাগ হলো না। মনে হলো, এতদিন শরীর আমার সঙ্গে লড়াই করেনি। সে শুধু আমাকে একটা কথা বোঝানোর চেষ্টা করেছে—“তুমি সারাজীবন অনেকের দায়িত্ব নিয়েছ। এবার একটু আমার দায়িত্বও নাও।”

আমি জানি না আগামীকাল কী হবে। ব্যবসা চলবে, সংসার চলবে, ছেলেমেয়েরা নিজেদের জীবন তৈরি করবে। একদিন হয়তো তারা নিজেরাও বাবা-মা হবে। আর আমি হয়তো আরও ধীরে হাঁটব। হয়তো একদিন ছেলে অফিসের পুরো দায়িত্ব নেবে। হয়তো মেয়ে নিজের সংসারে চলে যাবে। হয়তো এক সন্ধ্যায় স্ত্রী আর আমি উঠানে বসে শুধু চুপচাপ চা খাব। কোনো shipment থাকবে না, কোনো payment-এর চিন্তা থাকবে না, কোনো হিসাব থাকবে না—শুধু পাশাপাশি বসে থাকা থাকবে। হয়তো সেদিন বুঝব, জীবন আসলে এতদিন যে জিনিসটাকে “সময় নষ্ট” ভেবেছি, সেটাকেই সবচেয়ে বেশি খুঁজছিল—প্রিয় মানুষগুলোর পাশে কিছুটা সময়।

সেদিন রাতে ঘুমানোর আগে হাঁটুর ব্যথাটা আবার অনুভব করলাম। পাশ ফিরলাম না। স্থির হয়ে শুয়ে রইলাম। জানালার বাইরে রাত গভীর হচ্ছে। ঘরের ভেতর স্ত্রী শান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে, ছেলেমেয়েরা নিজেদের ঘরে। সবাই নিরাপদ। আমার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত প্রশান্তি এলো। মনে হলো—শরীর যে থামতে বলছে, সেটা হয়তো পরাজয়ের কথা নয়। হয়তো সেটা জীবনেরই আরেকটি ভাষা। আর হয়তো সেই ভাষা বুঝতে শেখাটাই আমার জীবনের পরবর্তী অধ্যায়।

চলবে…

🌿 পর্ব ৪

“রোগীর শরীর, মন ও জীবনের সব সূত্র এক জায়গায় এসে মিলল—কিন্তু উত্তরটা কি এত সহজ?”

একটি রোগীর আত্মকথা — জীবন, অনুভূতি, পরিবার ও Materia Medica-র গল্পে গল্পে পাঠ।

20/08/2026

🌿 একটি রোগীর আত্মকথা, রেমিডি -২

পর্ব ২ — “সবাইকে সামলাতে গিয়ে, নিজেকেই কখন যে ভুলে গিয়েছিলাম…”

সেদিন রাতে ঘুমটা ভালো হয়নি। হাঁটুর ব্যথা বারবার ঘুম ভেঙে দিচ্ছিল। পাশ ফিরে শোয়ার চেষ্টা করলেই অস্বস্তি, একটু নড়লেই যেন ব্যথাটা আরও জেগে ওঠে। শেষ পর্যন্ত একসময় চিৎ হয়ে শুয়ে স্থির হয়ে রইলাম। মনে হলো, শরীরের সঙ্গে যদি কোনো চুক্তি করা যায়, তবে আজকের রাতের জন্য সেই চুক্তিটা হবে—আমি নড়ব না, তুমি আমাকে একটু শান্তিতে থাকতে দাও।

ভোরে আজানের শব্দে ঘুম ভাঙল। জানালার ফাঁক দিয়ে তখনও আলো পুরোপুরি ঢোকেনি। দূরে কারও হাঁস-মুরগির ডাক, পাশের বাড়ির উঠানে ঝাড়ু দেওয়ার শব্দ, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা পেঁয়াজ ভাজার গন্ধ—সব মিলিয়ে আমার চেনা সকাল। এই সকালটা আমার খুব প্রিয়। জীবনের কত বছর যে এই একই উঠান, একই দরজা, একই মানুষের মুখ দেখে শুরু করেছি!

বিছানা থেকে উঠতে গিয়ে আবার হাঁটুর কথা মনে হলো। কিছুক্ষণ বসে থাকলাম। মনে হলো, শরীরটা একটু সময় চায়। কিন্তু নিচতলায় স্ত্রী ইতিমধ্যে নাশতার আয়োজন করছে। ছেলে ব্যবসার কিছু কাগজ নিয়ে অপেক্ষা করছে। মেয়েরও আজ কোথাও যাওয়ার কথা।

আমি জানি, সবাই আমার ওপর কিছুটা নির্ভর করে।

এই নির্ভরতার মধ্যে একটা অদ্ভুত আনন্দ আছে।

কেউ এসে জিজ্ঞেস করে, “আব্বু, এটা কী করব?”
কেউ বলে, “আপনি না থাকলে এই সিদ্ধান্তটা নিতে পারছি না।”
স্ত্রী বলে, “বাজারের হিসাবটা একবার দেখে দিন।”
ব্যবসার লোকজন ফোন করে বলে, “স্যার, আপনার অনুমতি দরকার।”

এইসব কথার মধ্যে কোথাও একটা অদৃশ্য ভালোবাসা আছে। আবার সেই ভালোবাসার মধ্যেই একটা ভারও আছে।

আমি সেই ভারটা নামাতে চাই না।

কারণ এতদিন ধরে আমিই তো সংসারের ছাদ হয়ে আছি।

নিচে নেমে দেখি ছেলে টেবিলে বসে কাগজপত্র দেখছে। আমাকে দেখেই বলল, “আব্বু, আজকে আপনি অফিসে যাবেন?”

আমি চেয়ার টেনে বসলাম।

“যাব।”

সে একটু ইতস্তত করে বলল, “হাঁটুর অবস্থা তো ভালো না। আপনি না গেলেও তো আমরা সামলে নিতে পারি।”

আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম, “তোমরা সামলাবে, সেটা আমি জানি। কিন্তু কিছু সিদ্ধান্ত নিজের চোখে না দেখে নিতে ভালো লাগে না।”

সে আর কিছু বলল না।

আমি জানি, আমার এই কথার ভেতরে শুধু ব্যবসা নেই। আছে অভ্যাস। আছে দায়িত্ব। আছে নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়। বহু বছর ধরে নিজের হাতে যে জিনিস গড়ে তুলেছি, সেটাকে হঠাৎ অন্যের হাতে ছেড়ে দিতে মন চায় না।

ব্যবসায় আমি ভুল পছন্দ করি না। কথা পরিষ্কার চাই। কাজ সময়মতো চাই। কেউ একই কথা বারবার বললে বিরক্ত হয়ে যাই। অপ্রয়োজনীয় আলোচনা আমার ভালো লাগে না। আমি চাই, যার যা বলার—সরাসরি বলুক; তারপর আমাকে আমার কাজ করতে দিক।

সেদিন অফিসে যাওয়ার আগে স্ত্রী দরজার কাছে এসে বলল, “আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরবেন?”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কেন?”

“মেয়েটা আপনার সঙ্গে কিছু কথা বলবে।”

আমি বললাম, “কী কথা?”

সে মুচকি হেসে বলল, “আপনি আগে বাসায় আসুন, তারপর শুনবেন।”

আমি কিছু বললাম না। কিন্তু মনে মনে ভাবলাম—আজ আবার কী নতুন চিন্তা!

অফিসে পৌঁছানোর পর একের পর এক মানুষ আসতে লাগল। কারও payment আটকে আছে, কারও shipment নিয়ে সমস্যা, কেউ নতুন business proposal নিয়ে এসেছে। আমি একটার পর একটা শুনছি, সিদ্ধান্ত দিচ্ছি, হিসাব করছি। মাঝে মাঝে হাঁটুর ব্যথা মনে করিয়ে দিচ্ছে—শরীর বসে থাকতে চায়।

কিন্তু অফিসে বসে থাকা আমার কাছে খুব একটা সমস্যা নয়।

বরং চলাফেরাটাই কষ্টকর।

একজন কর্মচারী বলল, “স্যার, আপনি একটু হাঁটবেন? ডাক্তার তো বলেছেন নড়াচড়া দরকার।”

আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, “এখন এসবের সময় নেই। কাজটা আগে শেষ করো।”

সে চুপ করে গেল।

কিছুক্ষণ পর নিজের কথাটা মনে করে একটু খারাপ লাগল। মানুষটা তো আমার ভালোর কথাই বলেছিল। কিন্তু ব্যথার সময় অপ্রয়োজনীয় কথা যেন সহ্য হয় না।

দুপুরে গলা শুকিয়ে গেল।

আমি এক গ্লাস পানি নিলাম।

শেষ করলাম।

তারপর আরেক গ্লাস।

কেউ বলল, “স্যার, এত পানি একসঙ্গে?”

আমি হেসে বললাম, “তৃষ্ণা পেয়েছে। একটু একটু করে খেলে আমার তৃষ্ণা মেটে না।”

পানি শেষ করে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকলাম।

জানালার বাইরে রোদ।

চারপাশ শুকনো।

মনে হলো, আমার শরীরটাও যেন সেই রোদের মতো—শুষ্ক, ক্লান্ত, তৃষ্ণার্ত।

বিকেলে বাড়ি ফিরে দেখি মেয়ে বসে আছে।

আমাকে দেখেই উঠে এল।

“বাবা, আপনার সঙ্গে একটু কথা ছিল।”

আমি বললাম, “বলো।”

সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আপনি কি আমাদের জন্য একটু সময় বের করতে পারেন?”

আমি অবাক হলাম।

“এটা আবার কী কথা?”

“আপনি আমাদের জন্য সারাজীবন কাজ করেছেন। কিন্তু এখন আমরা চাই আপনি আমাদের সঙ্গে থাকেন।”

আমি হেসে বললাম, “আমি তো আছি।”

সে মাথা নাড়ল।

“না বাবা। আপনি শরীরে থাকেন, কিন্তু আপনার মাথা সবসময় ব্যবসায় থাকে।”

কথাটা শুনে আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।

কী উত্তর দেব বুঝলাম না।

মেয়েটা আমার পাশে এসে বসে আমার হাঁটুর দিকে তাকাল।

আস্তে করে বলল,

“ব্যথা করছে?”

আমি বললাম, “আছে একটু।”

“তাহলে আজ বাইরে যাবেন না।”

আমি বললাম, “না, যাব না।”

সে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল। হয়তো ভাবেনি আমি এত সহজে রাজি হব।

তারপর মাথাটা আমার কাঁধে রেখে বলল,

“বাবা, আপনি সবসময় আমাদের শক্ত থাকতে শিখিয়েছেন। এবার একটু আমাদেরও সুযোগ দিন আপনাকে আগলে রাখার।”

আমার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।

জীবন কি সত্যিই এমন?

একদিন সন্তানকে হাত ধরে হাঁটতে শেখাই।

আর একদিন সেই সন্তানই এসে বলে—

“বাবা, এবার আপনি একটু ধীরে হাঁটুন।”

রাতে সবাই একসঙ্গে খেতে বসেছিলাম। স্ত্রী ভাত বেড়ে দিচ্ছে, ছেলে দিনের ব্যবসার কথা বলছে, মেয়ে তার ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলছে। মাঝে মাঝে হাসি উঠছে। কোনো একটা কথায় সবাই হেসে ফেলল। আমিও হাসলাম।

সেই হাসির মুহূর্তে মনে হলো—জীবনের সবচেয়ে বড় লাভ হয়তো কোনো ব্যবসার খাতায় লেখা থাকে না।

এগুলোই আসল লাভ।

স্ত্রীর হাতের খাবার।

সন্তানের হাসি।

বাড়ির মানুষের নির্ভরতা।

আর দিনের শেষে নিজের ঘরে ফিরে আসার শান্তি।

তবু রাত গভীর হলে আবার আমার মাথায় হিসাব শুরু হলো।

কালকের meeting।

পরের সপ্তাহের payment।

ব্যবসার একটা নতুন পরিকল্পনা।

আমি নিজেকে বললাম,

“আরেকটু সামলাই। তারপর বিশ্রাম নেব।”

হাঁটু তখনও স্থির থাকতে চাইছে।

গলা আবার শুকিয়ে আসছে।

পাশের টেবিলে রাখা পানির গ্লাসটা হাতে তুলে এক নিঃশ্বাসে শেষ করলাম।

স্ত্রী ঘুমের ঘোরে বলল,

“আবার এত পানি?”

আমি মৃদু হেসে বললাম,

“তৃষ্ণা পেয়েছিল।”

তারপর আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম।

সেদিন প্রথমবার মনে হলো—

হয়তো শরীর আমাকে থামাতে চাইছে না।

হয়তো শরীর আমাকে শুনতে চাইছে।

কিন্তু এত বছরের অভ্যাসে আমি কি কখনো নিজের শরীরের ভাষা শুনেছি?

নাকি সবসময় শুধু দায়িত্বের ভাষাই বুঝেছি?

চলবে…

🌿 পর্ব ৩

“যেদিন ব্যথার সঙ্গে তার পুরোনো জীবনের কিছু হিসাব খুলে গেল…”

19/08/2026

🌿 একটি রোগীর আত্মকথা - রেমিডি -০২

পর্ব ১ — যে মানুষটি থামতে জানত না

আমার বয়স পঞ্চাশ। জীবনের এই জায়গায় এসে মাঝে মাঝে পেছন ফিরে তাকাই। মনে হয়, জীবনটা আসলে কত অদ্ভুত—ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে বাজারে যেতাম, বাবার পকেট থেকে দুটো টাকা চেয়ে জিলাপি কিনতাম; আজ আমার নিজের সন্তানরা বাজারে গেলে তাদের হাতে টাকা তুলে দিই। তখন বুঝিনি, একদিন সেই ছোট্ট হাতটাই সংসারের বড় দায়িত্ব হয়ে যাবে। মানুষ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুধু বয়সী হয় না, তার সঙ্গে বাড়ে দায়িত্ব, অভিজ্ঞতা, স্মৃতি আর কিছু না বলা ক্লান্তি।

আমাদের বাড়িটা শহরের একেবারে ভেতরে নয়। সকালে এখনো পাখির ডাক শোনা যায়, পাশের বাড়ির চাচার আজানের শব্দ ভেসে আসে, রাস্তার মাথায় চায়ের দোকানে বসে কয়েকজন পরিচিত মানুষ দেশের রাজনীতি থেকে শুরু করে বাজারদর—সবকিছু নিয়ে আলোচনা করেন। আমি মাঝে মাঝে জানালার পাশে বসে সেইসব শুনি। চায়ের কাপটা হাতে থাকে, কিন্তু মন পড়ে থাকে অন্য কোথাও। ব্যবসার হিসাব, কর্মচারীদের বেতন, পাওনা টাকা, নতুন অর্ডার, ছেলের ভবিষ্যৎ, মেয়ের বিয়ের চিন্তা—সবকিছু যেন আমার মাথার ভেতর একসঙ্গে জায়গা করে নিয়েছে।

আমার স্ত্রী প্রায়ই বলে, “আপনি একটু বসে আমাদের সঙ্গে গল্প করেন না কেন? সবসময় কী যেন ভাবেন।” আমি হেসে বলি, “ভাবছি তো তোমাদের কথাই।” সে তখন মুচকি হেসে বলে, “আমাদের কথা ভাবলে এত হিসাব করতে হয়?” তার কথায় সবাই হেসে ওঠে। আমিও হাসি। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে সত্যিটা হলো—আমি সংসারকে খুব ভালোবাসি। হয়তো সেই ভালোবাসার কারণেই সবকিছু নিজের হাতে ধরে রাখতে চাই। মনে হয়, আমি যদি একটু ছেড়ে দিই, কিছু একটা ভুল হয়ে যাবে।

আমার দুই সন্তান। ছেলে বাবার মতো ব্যবসা করতে চায়, আর মেয়ে বলে, “বাবা, আপনি সারাজীবন ব্যবসা করেছেন, এবার একটু জীবনও উপভোগ করেন।” মেয়ের কথাটা শুনলে বুকের ভেতর কেমন একটা লাগে। সে বুঝতে পারে না, জীবন উপভোগ করার সংজ্ঞাটাই হয়তো আমার কাছে আলাদা। সন্ধ্যায় সবাই একসঙ্গে বসে ভাত খাওয়া, স্ত্রীর হাতের রান্না নিয়ে একটু হাসাহাসি, ছেলের কোনো নতুন পরিকল্পনা শুনে তাকে পরামর্শ দেওয়া—এসবই তো আমার আনন্দ। শুধু আমি আনন্দের মধ্যেও হিসাব খুঁজে নিই।

কিন্তু শরীরটা ইদানীং আমাকে একটু অন্যভাবে চিনতে শিখিয়েছে।

প্রথমে হাঁটুর ব্যথা। দুটো হাঁটুর জয়েন্টেই মাঝে মাঝে এমন ব্যথা হয় যে, মনে হয় হাড়ের ভেতর শুকনো কোনো শব্দ হচ্ছে। কিছুক্ষণ বসে থাকার পর উঠে দাঁড়ালে প্রথম কয়েক পা খুব কষ্টের। হাঁটতে শুরু করলে মনে হয় প্রতিটি পদক্ষেপ হাঁটুকে মনে করিয়ে দিচ্ছে—“তুমি আর আগের মতো নেই।” সিঁড়ি দিয়ে ওঠা-নামা এখন আমার কাছে ছোটখাটো পরীক্ষা। আগে যে সিঁড়ি দিয়ে দুটো ধাপ একসঙ্গে লাফিয়ে উঠতাম, এখন সেখানে ধীরে ধীরে পা ফেলি।

একদিন ছেলে বলল, “আব্বু, বিকেলে চলেন মাঠের দিকে একটু হাঁটতে যাই।”

আমি বললাম, “তুমি যাও। আমার কিছু কাজ আছে।”

সে হেসে বলল, “আপনার কাজ কখন শেষ হবে?”

আমি বললাম, “ব্যবসার কাজ শেষ হয় নাকি?”

সে কিছু বলল না। শুধু আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। সেই দৃষ্টিতে যেন একটু অভিমান ছিল, একটু মায়াও ছিল। আমি বুঝলাম, ছেলে আমাকে হাঁটাতে নিতে চায়নি শুধু শরীর ভালো রাখার জন্য; সে হয়তো বাবার সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে চেয়েছিল।

সেদিন রাতে হাঁটুর ব্যথাটা একটু বেশি ছিল। স্ত্রী গরম পানির ব্যাগ এনে হাঁটুর কাছে ধরতে বলল। আমি বললাম, “থাক, এত কিছু করতে হবে না।”

সে বলল, “আপনি সবার জন্য করেন, নিজের জন্য কেউ কিছু করলে এত আপত্তি কেন?”

আমি আর কিছু বলিনি।

শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলাম।

শরীরটা যেন সত্যিই শুকিয়ে যাচ্ছে। মুখ শুকনো, ঠোঁট শুকনো, গলা শুকনো। তৃষ্ণা পেলে অল্প অল্প করে পানি খেতে ভালো লাগে না। একবারে অনেকটা পানি খেতে ইচ্ছে করে। এক গ্লাস শেষ করি, তারপর আরেক গ্লাস। স্ত্রী মাঝে মাঝে বলে, “এত পানি একসঙ্গে খাবেন না।” আমি হেসে বলি, “তৃষ্ণা তো আর আমার কথা শুনে আসে না।”

আমার কোষ্ঠকাঠিন্যও হয়েছে অনেকদিন। মল অনেক সময় শুকনো ও শক্ত থাকে। শরীরের ভেতরেও যেন একটা ধীরতা তৈরি হয়েছে। কখনো মনে হয়, শুধু হাঁটু নয়—শরীরের অনেক কিছুই যেন আগের মতো সহজে চলছে না। অথচ মাথার ভেতর চিন্তাগুলো এক মুহূর্তের জন্যও থামে না।

সকালে নাশতার টেবিলে স্ত্রী বলছিল, “আজ বাজারে যেতে হবে। চালও শেষ, ডালও শেষ।”

মেয়ে বলল, “বাবা, আপনি যাবেন না। আমি নিয়ে আসব।”

আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, “না, তুমি কেন যাবে? আমি যাব।”

সে বলল, “আপনার হাঁটুর ব্যথা তো!”

আমি একটু বিরক্ত হয়ে বললাম, “ব্যথা হলেই কি মানুষ ঘরে বসে থাকবে?”

কথাটা বলার পর নিজের কাছেই একটু খারাপ লাগল। মেয়েটা চুপ করে গেল। কিছুক্ষণ পর এসে আমার পাশে বসে আস্তে করে বলল, “বাবা, আমরা আপনাকে থামাতে চাই না। শুধু চাই, আপনি একটু নিজের কথাও ভাবুন।”

আমি তার মাথায় হাত রাখলাম।

কী আশ্চর্য—একসময় আমিই তাকে হাঁটতে শেখাতাম। আজ সে আমাকে থামতে শেখাচ্ছে।

জীবন বোধহয় এভাবেই বদলে যায়।

যে সন্তানকে একদিন হাত ধরে রাস্তা পার করিয়েছি, একদিন সে-ই এসে আমার হাত ধরে বলে—“বাবা, সাবধানে হাঁটবেন।”

সেদিন রাতে ঘুমানোর আগে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলাম। মনে হচ্ছিল, শরীর আমাকে ধীরে ধীরে একটা ভাষা শেখাচ্ছে। সে বলছে—সবসময় দৌড়াতে হয় না। সবকিছু নিজের হাতে রাখতে হয় না। কখনো কখনো বসে থাকতে হয়। প্রিয় মানুষগুলোর কথা শুনতে হয়। নিজের শরীরের কথাও শুনতে হয়।

কিন্তু আমার মন তখনও রাজি নয়।

কাল সকালে একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক মিটিং আছে।

একটা বড় deal-এর কথা চলছে।

পাওনা টাকার একটা হিসাব মেলাতে হবে।

আমি চোখ বন্ধ করলাম।

হাঁটু বলল—“স্থির থাকো।”

গলা বলল—“পানি চাই।”

শরীর বলল—“একটু বিশ্রাম দাও।”

আর আমার মন?

সে খুব আস্তে করে বলল—

“আরেকটু কাজ করি। তারপর বিশ্রাম নেব।”

আমি জানি না, সেই “আরেকটু” কখন শেষ হবে।

হয়তো জীবন আমাকে সেই উত্তরটাই শেখাতে চলেছে।

চলবে…

পর্ব ২

“ব্যথা শুধু হাঁটুতে ছিল না—শরীর যখন থামতে বলল, তখন তার জীবনের পুরোনো গল্পগুলো একে একে ফিরে আসতে শুরু করল…”

মুখের ঘা—যে অতিথি বারবার ফিরে আসে“ডাক্তার সাহেব, মুখের ঘাটা সেরে যায়… কিন্তু কিছুদিন পর আবার ফিরে আসে।”কথাটা বলতে বলতে ...
15/08/2026

মুখের ঘা—যে অতিথি বারবার ফিরে আসে

“ডাক্তার সাহেব, মুখের ঘাটা সেরে যায়… কিন্তু কিছুদিন পর আবার ফিরে আসে।”

কথাটা বলতে বলতে রোগী একটু থেমে গেলেন।

কখনো জিহ্বার পাশে, কখনো ঠোঁটের ভেতরে, কখনো গালের নরম অংশে—ছোট্ট একটি ঘা। প্রথমে সামান্য জ্বালা, তারপর ব্যথা। খেতে গেলে কষ্ট, কথা বললেও অস্বস্তি।

ওষুধ খেলে কয়েকদিনের মধ্যে ঘাটা মিলিয়ে যায়। মনে হয়—সমস্যা শেষ।

কিন্তু কিছুদিন পর আবার সেই একই গল্প।

আবার ঘা।
আবার জ্বালা।
আবার ব্যথা।
আবার খাবারের সময় অস্বস্তি।

তখন প্রশ্নটা শুধু “ঘা কীভাবে সারাব?”—এখানে থেমে থাকে না।

প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—

কেন ঘাটা বারবার ফিরে আসছে?

মুখের ঘা কখনো সাময়িক ও সাধারণ কারণে হতে পারে, আবার কখনো মুখের আঘাত, পুষ্টির ঘাটতি, কিছু ওষুধ, সংক্রমণ বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে। তাই বারবার হলে শুধু ঘা ঢেকে দেওয়া নয়—এর পেছনের কারণটাও খুঁজে দেখা জরুরি।

আর হোমিওপ্যাথিক case-taking-এর ভাষায়, প্রতিটি রোগীর গল্প আলাদা।

ঘা কোথায়?
কেমন দেখতে?
কীসে বাড়ে?
কীসে কমে?
জ্বালা বেশি, নাকি ব্যথা?
কতদিন থাকে?
কত ঘন ঘন ফিরে আসে?
সঙ্গে শরীরের অন্য কোনো পরিবর্তন আছে কি?

রোগের নাম এক হতে পারে, কিন্তু রোগীর গল্প এক নয়।

তাই একজন চিকিৎসকের কাজ শুধু ঘাটাকে দেখা নয়—ঘাটার পেছনে থাকা মানুষটাকেও দেখা।

ছোট একটি ঘা কখনো কখনো শরীরের একটি বড় গল্পের ছোট্ট অধ্যায় হয়ে আসে।

বারবার মুখে ঘা হলে অবহেলা না করে কারণটি জানুন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

07/08/2026

📖 একটি রোগীর আত্মকথা — রেমেডির আত্মপ্রকাশ

এই আত্মকথাটি ছিল Alumina-এর।

অনেকেই ভাবতে পারেন, এটি গলায় মাছের কাঁটা আটকে থাকার গল্প। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল একটি বিশ্বাসের গল্প।

Alumina রোগী শুধু একটি উপসর্গ নিয়ে আসে না; সে নিয়ে আসে এমন একটি অনুভূতি, যা তার কাছে বাস্তব, যদিও পৃথিবীর কাছে তার কোনো প্রমাণ নেই। রিপোর্ট, পরীক্ষা, চিকিৎসক—সবাই যখন বলে "কিছু নেই", তখনও তার অন্তর বলে, "আমি যা অনুভব করছি, সেটাই সত্য।"

এই কেসে গলার কাঁটা ছিল একটি প্রতীক। প্রকৃত রোগ ছিল সেই স্থির বিশ্বাস (Fixed Idea), যেখান থেকে রোগী বের হতে পারছিল না।

এর সঙ্গে ছিল Alumina-এর আরেকটি গভীর বৈশিষ্ট্য—ধীরতা। শরীরের ধীরতা, মনের ধীরতা, সিদ্ধান্তের ধীরতা, এমনকি মলত্যাগের ধীরতাও। Re**um যেন নিজের কাজ ভুলে গেছে; মল নরম হলেও বের হতে চায় না। শরীর ও মন—দুটোই যেন স্থবির।

ক্লাসিক্যাল হোমিওপ্যাথি শুধু গলার অনুভূতির চিকিৎসা করেনি। চিকিৎসা করেছে পুরো মানুষটির। যখন Vital Force নিজের স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে পেল, তখন শুধু কোষ্ঠকাঠিন্য নয়, ধীরে ধীরে সেই অদৃশ্য কাঁটার বিশ্বাসও মিলিয়ে গেল। রোগী একদিন হঠাৎ আবিষ্কার করল—সে আর গলার কথা ভাবছে না।

এটাই Alumina-এর শিক্ষা।

কখনো কখনো রোগ শরীরে থাকে না; রোগ বাসা বাঁধে মানুষের অনুভূতিতে। আর একজন প্রকৃত ক্লাসিক্যাল হোমিওপ্যাথ সেই অনুভূতির ভাষা পড়তে জানেন।

পরবর্তী আত্মকথায় দেখা হবে আরেকজন মানুষ, আরেকটি মানসিক জগৎ, আরেকটি রেমেডির আত্মার সঙ্গে।

Address

Lauhati Bazar
Delduar

Opening Hours

Monday 08:00 - 20:00
Tuesday 08:00 - 20:00
Wednesday 08:00 - 20:00
Thursday 08:00 - 20:00
Friday 08:00 - 20:00
Saturday 08:00 - 20:00
Sunday 08:00 - 20:00

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when আদর্শ হোমিও চেম্বার posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share