21/08/2026
🌿 একটি রোগীর আত্মকথা ( রেমিডি -২)
পর্ব ৩ — যেদিন পুরোনো হিসাবের খাতা খুলে গেল
কিছু রাত আসে, যখন ঘুম আসে না—কিন্তু তার কারণ শুধু শরীরের ব্যথা নয়। বিছানায় শুয়ে থাকতে থাকতে জীবনের পুরোনো দরজাগুলো একে একে খুলে যায়। ভুলে যাওয়া মুখ মনে পড়ে, পুরোনো কথাগুলো আবার কানে বাজে, আর মানুষ হঠাৎ আবিষ্কার করে—তার বুকের ভেতর কত কথা জমে আছে, অথচ কাউকে কোনোদিন বলা হয়নি। সেদিনও তেমন একটি রাত ছিল। ঘরের সবাই ঘুমিয়ে গেছে। স্ত্রী আমার পাশে শান্ত হয়ে শুয়ে আছে। ছেলের ঘরের দরজা বন্ধ, মেয়ের ঘর থেকেও কোনো শব্দ নেই। অথচ আমার চোখে ঘুম নেই। হাঁটুর নিচে বালিশ দিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে আছি। পাশ ফিরতে ইচ্ছে করছে না। একটু নড়লেই হাঁটুর ভেতর থেকে ব্যথা যেন আমাকে সতর্ক করে দেয়—“স্থির থাকো।” আমি স্থির হয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
হঠাৎ মনে হলো, এই পঞ্চাশ বছরে আমি আসলে কতটা পথ হেঁটেছি! শুধু রাস্তার পথ নয়—দায়িত্বের পথ। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে বাজারে যেতাম। বাবার একটা ছোট ব্যবসা ছিল। খুব বেশি টাকা ছিল না, কিন্তু সংসার চালানোর জন্য তাঁর মুখে কখনো হতাশা দেখিনি। একদিন দোকান বন্ধ করার সময় বাবা আমার কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন, “জীবনে সংসারের দায়িত্ব নিলে পিছনে তাকাস না। যত কষ্টই হোক, মানুষকে ধরে রাখতে হয়।” তখন কথাটার গভীরতা বুঝিনি। আজ বুঝি। বাবা নেই বহু বছর। অথচ তাঁর সেই কথাটা এখনও আমার জীবনের ভিতরে কোথাও বাজে—পিছনে তাকাস না।
আমি সত্যিই পিছনে তাকাইনি। ব্যবসায় লোকসান হয়েছে—চুপ থেকেছি। পকেট খালি হয়েছে—স্ত্রীকে বুঝতে দিইনি। কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার সময় নিজের প্রয়োজন পিছিয়ে দিয়েছি। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে গিয়ে নিজের কত ইচ্ছা যে মাটিচাপা দিয়েছি, তার হিসাব নেই। তখন মনে হতো, এটাই তো পুরুষের দায়িত্ব—নিজে কষ্ট পাবে, কিন্তু পরিবারের মানুষকে কষ্ট পেতে দেবে না। হয়তো সেই থেকেই আমার একটা স্বভাব তৈরি হয়েছে—কষ্ট হলে চুপ থাকা, সমস্যা হলে নিজেই সামলানো, আর যতক্ষণ সম্ভব কাজ করে যাওয়া। কেউ বেশি প্রশ্ন করলে বিরক্তি আসে, কেউ একই কথা বারবার বললে ভালো লাগে না। মনে হয়, যা বলার সরাসরি বলো, তারপর আমাকে আমার কাজ করতে দাও। কখন যে এই স্বভাবটা আমার চরিত্রের অংশ হয়ে গেছে, বুঝতেই পারিনি।
স্ত্রী হঠাৎ ঘুমের মধ্যে একটু নড়েচড়ে উঠল। চোখ না খুলেই বলল, “ঘুমাননি?” আমি আস্তে বললাম, “না।” সে জিজ্ঞেস করল, “হাঁটু ব্যথা করছে?” আমি বললাম, “একটু।” সে উঠে বসতে চাইল। আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, “না, না। তুমি শুয়ে থাকো। কিছু লাগবে না।” সে আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। বলল, “আপনি এখনও আগের মতোই আছেন।” আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, “কীভাবে?” সে বলল, “অসুবিধা হলেও কাউকে কিছু বলতে চান না।” আমি চুপ করে গেলাম। এই মানুষটির সঙ্গে আমার এত বছরের সংসার। কত সুখ-দুঃখ একসঙ্গে পার করেছি। অথচ আমার ভেতরের অনেক কষ্টই সে জানে না। ভালোবাসা সত্যিই অদ্ভুত—কখনো কখনো যাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি, তার কাছেই নিজের দুর্বলতাটা প্রকাশ করতে সবচেয়ে বেশি সংকোচ হয়। মনে হয়, “আমি দুর্বল হয়ে গেলে, ওরা ভরসা করবে কাকে?”
ভোরের দিকে একটু ঘুম এসেছিল। সকালে ছেলে এসে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বলল, “আব্বু, আজ অফিসে না গেলেও হবে।” আমি বললাম, “কেন?” সে বলল, “আপনার হাঁটুর অবস্থা ভালো না। আজ একটু বিশ্রাম নিন। অফিস আমরা সামলে নেব।” আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, “তুমি কি এখন আমাকে শেখাবে কখন অফিসে যেতে হবে?” কথাটা মুখ থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বুঝলাম—আমি একটু বেশি কঠিন হয়ে গেছি। ছেলে চুপ করে গেল। তার চোখে যে কষ্টটা দেখলাম, সেটা হাঁটুর ব্যথার চেয়েও বেশি লাগল। আমি তাকে ডাকলাম, “এই শোন।” সে ফিরে তাকাল। আমি একটু নরম হয়ে বললাম, “রাগ করিস না। ব্যথার জন্য মেজাজটা খারাপ হয়ে গেছে।” সে মৃদু হেসে বলল, “আমি জানি, আব্বু।” তারপর কাছে এসে খুব শান্ত গলায় বলল, “আপনি আমাদের ওপর রাগ করতে পারেন। কিন্তু নিজের ওপর এত রাগ করবেন না।” আমি থেমে গেলাম। নিজের ওপর রাগ? হয়তো সত্যিই করি। বয়স বাড়ছে—এটা মেনে নিতে পারি না। শরীর আগের মতো চলছে না—এটা মেনে নিতে পারি না। যে কাজগুলো একসময় একাই করতাম, সেগুলো এখন অন্যের হাতে তুলে দিতে হচ্ছে—এটাও মেনে নিতে কষ্ট হয়। হয়তো আমি শুধু রোগের সঙ্গে লড়ছি না; আমি লড়ছি নিজের বদলে যাওয়া বয়সের সঙ্গে।
দুপুরে অফিস থেকে একের পর এক ফোন এলো। একটা shipment আটকে আছে, একজন গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা কিছু পরিবর্তন চেয়েছে, একটা payment এখনও আসেনি। একজন কর্মচারীও ভুল করেছে। আমি একটার পর একটা ফোন করলাম, নির্দেশ দিলাম, হিসাব মিলালাম, সমস্যার সমাধান করলাম। সবাই আমার কাছে উত্তর চায়। কারণ এত বছর ধরে আমি তাদের শিখিয়েছি—সমস্যা হলে আমার কাছে আসতে। কিন্তু ফোনগুলো শেষ হওয়ার পর যখন ঘরটা একটু নীরব হলো, তখন হঠাৎ বুঝলাম—আমার নিজের শরীরের সমস্যার উত্তরটাই আমি জানি না। চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করলাম। একজন কর্মচারী এসে বলল, “স্যার, একটু হাঁটবেন? সারাদিন বসে আছেন।” আমি বললাম, “না। এখন না। আমাকে একটু শান্তিতে থাকতে দিন।” কথাটা খুব সাধারণ, কিন্তু নিজের কানে শুনে মনে হলো, এই কথাটা শুধু আজকের নয়। হয়তো বহু বছর ধরে আমার ভেতরে একটা কথাই ছিল—আমাকে একটু শান্তিতে থাকতে দাও; আমাকে আমার মতো কাজ করতে দাও; অপ্রয়োজনীয় কথা বলো না; আমার কাজে বাধা দিও না; আমাকে আমার দায়িত্বটা শেষ করতে দাও। হয়তো আমার হাঁটুর ব্যথার সঙ্গে আমার স্বভাবেরও একটা পুরোনো সম্পর্ক আছে। শরীর এখন নড়াচড়া কমাতে চাইছে, আর মন চাইছে সবকিছু নিজের মতো চলুক।
বিকেলে মেয়ে এসে আমার পাশে বসে বলল, “বাবা, আপনি ছোটবেলায় কেমন ছিলেন?” আমি হেসে বললাম, “হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?” সে বলল, “জানতে ইচ্ছে করছে।” অনেকদিন পর আমি নিজের শৈশবের কথা বলতে শুরু করলাম—বাবার ছোট দোকান, বর্ষার কাদামাখা রাস্তা, মায়ের রান্নাঘর, ঈদের নতুন জামা, বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে ফুটবল খেলা, সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলে মায়ের বকুনি। কী আশ্চর্য—এত বছর পর সেইসব স্মৃতি এখনও কত জীবন্ত! গল্প করতে করতে একসময় নিজেই হেসে ফেললাম। মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “বাবা, আপনাকে আজ অনেকদিন পর এত হাসতে দেখলাম।” আমি চুপ করে গেলাম। হয়তো জীবন আমাদের খুব ধীরে ধীরে বদলে দেয়। একসময় আমরা শুধু বাঁচি, তারপর সংসার করি, দায়িত্ব নিই, সন্তানদের বড় করি। তারপর তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে ভাবতে একদিন বুঝতে পারি—নিজের জীবনের কতটা সময় আমরা শুধু দায়িত্বের পেছনে রেখে এসেছি।
রাতে স্ত্রী আমার জন্য এক গ্লাস পানি এনে টেবিলে রেখে দিল। আমি গ্লাসটা হাতে নিয়ে একবারে অনেকটা পানি খেলাম। সে বলল, “আস্তে খান।” আমি মৃদু হেসে বললাম, “আমার তৃষ্ণাটা একটু অন্যরকম।” সে হেসে বলল, “আপনার সবকিছুই একটু অন্যরকম।” আমি বললাম, “হয়তো।” তারপর হাঁটুর দিকে তাকালাম। ব্যথা আছে। শরীরের শুষ্কতা আছে। বিশ্রাম চাইছে শরীর। কিন্তু আশ্চর্য—আজ আর শরীরের ওপর রাগ হলো না। মনে হলো, এতদিন শরীর আমার সঙ্গে লড়াই করেনি। সে শুধু আমাকে একটা কথা বোঝানোর চেষ্টা করেছে—“তুমি সারাজীবন অনেকের দায়িত্ব নিয়েছ। এবার একটু আমার দায়িত্বও নাও।”
আমি জানি না আগামীকাল কী হবে। ব্যবসা চলবে, সংসার চলবে, ছেলেমেয়েরা নিজেদের জীবন তৈরি করবে। একদিন হয়তো তারা নিজেরাও বাবা-মা হবে। আর আমি হয়তো আরও ধীরে হাঁটব। হয়তো একদিন ছেলে অফিসের পুরো দায়িত্ব নেবে। হয়তো মেয়ে নিজের সংসারে চলে যাবে। হয়তো এক সন্ধ্যায় স্ত্রী আর আমি উঠানে বসে শুধু চুপচাপ চা খাব। কোনো shipment থাকবে না, কোনো payment-এর চিন্তা থাকবে না, কোনো হিসাব থাকবে না—শুধু পাশাপাশি বসে থাকা থাকবে। হয়তো সেদিন বুঝব, জীবন আসলে এতদিন যে জিনিসটাকে “সময় নষ্ট” ভেবেছি, সেটাকেই সবচেয়ে বেশি খুঁজছিল—প্রিয় মানুষগুলোর পাশে কিছুটা সময়।
সেদিন রাতে ঘুমানোর আগে হাঁটুর ব্যথাটা আবার অনুভব করলাম। পাশ ফিরলাম না। স্থির হয়ে শুয়ে রইলাম। জানালার বাইরে রাত গভীর হচ্ছে। ঘরের ভেতর স্ত্রী শান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে, ছেলেমেয়েরা নিজেদের ঘরে। সবাই নিরাপদ। আমার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত প্রশান্তি এলো। মনে হলো—শরীর যে থামতে বলছে, সেটা হয়তো পরাজয়ের কথা নয়। হয়তো সেটা জীবনেরই আরেকটি ভাষা। আর হয়তো সেই ভাষা বুঝতে শেখাটাই আমার জীবনের পরবর্তী অধ্যায়।
চলবে…
🌿 পর্ব ৪
“রোগীর শরীর, মন ও জীবনের সব সূত্র এক জায়গায় এসে মিলল—কিন্তু উত্তরটা কি এত সহজ?”
একটি রোগীর আত্মকথা — জীবন, অনুভূতি, পরিবার ও Materia Medica-র গল্পে গল্পে পাঠ।