13/05/2026
:
প্রায় একশ বছর আগে, এক নারীর অস্ত্রোপচারের সময় সার্জনরা তাঁর ডিম্বাশয়ে ছোট ছোট থলির মতো কিছু গঠন দেখতে পান। সেগুলোকে তারা এক ধরনের “সিস্ট” মনে করেছিলেন। সেই নারীটির শরীরে পুরুষ হরমোনের মাত্রা বেশি ছিল, মাসিক অনিয়মিত ছিল এবং তিনি গর্ভধারণেও সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছিলেন। তাই চিকিৎসকেরা রোগটির নাম দেন “পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম” বা PCOS।
তৎকালীন সময়ে নামটি যথার্থই মনে হয়েছিল। কিন্তু পরে গবেষণায় ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে যায়-এটি শুধু ডিম্বাশয়ের রোগ নয়। বরং এটি একটি জটিল endocrine বা হরমোনজনিত ব্যাধি, যা শরীরের নানা সিস্টেমকে প্রভাবিত করে। গত কয়েক দশকের গবেষণায় দেখা গেছে, PCOS কেবল প্রজননক্ষমতার ওপর নয়, metabolism, হৃদ্রোগতন্ত্র, ত্বক, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং ইনসুলিন প্রতিরোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও গভীর প্রভাব ফেলে। এমনকি PCOS আক্রান্ত নারীদের মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগের ঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে বেশি।
তবে “সিস্ট” শব্দটি দীর্ঘদিন ধরে রোগটির প্রকৃত স্বরূপ বোঝার পথে এক বড় বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। অস্ট্রেলিয়ার Dr. Helena Teedeবলেন, “আসলে এগুলো সত্যিকারের cyst ছিল না।” তিনি ব্যাখ্যা করেন, এগুলো ছিল এমন immature follicle বা ডিম্বাণু, যাদের বৃদ্ধি হরমোনজনিত অসামঞ্জস্যের কারণে মাঝপথে থেমে গিয়েছিল। অর্থাৎ সমস্যার মূল কারণ ছিল বৃহত্তর endocrine disruption, ডিম্বাশয়ের সিস্ট নয়। বর্তমানে রোগ নির্ণয়ের সর্বশেষ গাইডলাইন অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রেই ওভারি পরীক্ষা না করেও রোগ নির্ণয় করা সম্ভব।
তারপরও দীর্ঘদিন ধরে PCOS-কে মূলত “ওভারির রোগ” হিসেবেই দেখা হয়েছে। সম্প্রতি চিকিৎসাবিষয়ক আন্তর্জাতিক জার্নাল The Lancet-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বহু বছরের আলোচনা ও গবেষণার পর PCOS-এর নতুন নাম প্রস্তাব করা হয়েছে-“Polyendocrine Metabolic Ovarian Syndrome” বা PMOS।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নতুন নাম রোগটির প্রকৃত বৈশিষ্ট্য আরও সঠিকভাবে তুলে ধরে। কারণ এটি শুধু reproductive disorder নয়; বরং বহুমাত্রিক hormonal ও metabolic disorder।
Rachel Morman, যিনি Verity UK-এর চেয়ারপারসন এবং নিজেও এই রোগে আক্রান্ত, বলেন-“অনেক নারী এখনও মনে করেন তাঁদের ওভারিতে অসংখ্য cyst রয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক স্বাস্থ্যকর্মীও একই ধারণা পোষণ করেন।”
এই ভুল ধারণার কারণে রোগীরা প্রায়ই সঠিকভাবে মূল্যায়িত হন না। অনেক সময় তাঁদের উপসর্গকে কেবল infertility বা মাসিক সমস্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়, অথচ পেছনের metabolic ঝুঁকিগুলো অদেখাই থেকে যায়।
Dr. Helena Teede বলেন, “আমার চেম্বারে আসা অনেক নারীই কান্নায় ভেঙে পড়েন, কারণ প্রথমবার কেউ তাঁদের সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে শোনে। রোগটি আসলে কী-এটা বুঝতে পারা তাঁদের জন্য এক বিশাল স্বস্তি।”
২০১২ সালে National Institutes of Health-এর এক বৈঠকে প্রথমবার আনুষ্ঠানিকভাবে রোগটির নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব ওঠে। এরপর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চিকিৎসক, গবেষক ও রোগীদের অংশগ্রহণে দীর্ঘ আলোচনা, জরিপ ও মতামত সংগ্রহ করা হয়। অধিকাংশ রোগীই নাম পরিবর্তনের পক্ষে মত দেন।
নতুন নাম-PMOS-রোগটিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে চায়: এটি এমন একটি জটিল অবস্থা যেখানে endocrine imbalance, metabolic dysfunction এবং ovarian manifestation-তিনটিই একসঙ্গে জড়িত।
Dr. Melanie Cree মনে করেন, এই পরিবর্তন চিকিৎসা ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করবে। তাঁর ভাষায়, “এতদিন চিকিৎসার মূল ফোকাস ছিল fertility ও reproduction। কিন্তু metabolic দিকটি অনেকটাই উপেক্ষিত থেকেছে।”
তিনি জানান, অধিকাংশ নারী নিয়মিত metabolic screening পান না। ফলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, প্রিডায়াবেটিস, স্থূলতা কিংবা হৃদ্রোগের প্রাথমিক ঝুঁকি দীর্ঘদিন ধরা পড়ে না। বিশেষ করে কিশোরীদের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও উদ্বেগজনক। অনেক সময় তাঁদের শুধু জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি দিয়ে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়, কিন্তু metabolic health নিয়ে কোনো আলোচনা বা পরীক্ষা করা হয় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, PMOS-কে যদি metabolic disorder হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলে চিকিৎসার ক্ষেত্রও বিস্তৃত হবে। GLP-1 agonist-এর মতো নতুন প্রজন্মের ওষুধও ভবিষ্যতে আরও বেশি ব্যবহৃত হতে পারে।
ডা. টিডির মতে, নতুন নাম গবেষণার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনবে। তিনি বলেন, “প্রজননক্ষম বয়সী প্রায় ১৭ কোটি নারী এই সমস্যায় আক্রান্ত। তবু গবেষণায় বিনিয়োগ অত্যন্ত সীমিত ছিল। রোগটিকে নতুনভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা গেলে আরও বিস্তৃত গবেষণা ও অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হবে।”
বর্তমান গাইডলাইন অনুযায়ী, PMOS নির্ণয়ের জন্য নিম্নের তিনটি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে অন্তত দুটি থাকতে হবে-
• অতিরিক্ত androgen বা পুরুষ হরমোন
• অনিয়মিত মাসিক
• রক্তে AMH-এর উচ্চ মাত্রা
• অথবা আল্ট্রাসাউন্ডে বহু arrested follicle দেখা যাওয়া।
ডা. টিডি জানান, প্রায় ৬০% রোগীর ক্ষেত্রে প্রথম দুটি বৈশিষ্ট্যই রোগ নির্ণয়ের জন্য যথেষ্ট। অর্থাৎ তাঁদের ওভারি মূল্যায়নের দরকার হয় না। অন্যদের ক্ষেত্রে আল্ট্রাসাউন্ডের পরিবর্তে রক্ত পরীক্ষা অনেক সহজ ও সুবিধাজনক বিকল্প হতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে unnecessary internal ultrasound-এর প্রয়োজনও কমে আসবে।
আগামী কয়েক বছরের মধ্যে নতুন নামটি ধীরে ধীরে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গবেষণার মূলধারায় প্রতিষ্ঠিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালে আন্তর্জাতিক রোগ শ্রেণিবিন্যাসে (ICD) PCOS-এর পরিবর্তে PMOS অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।