25/06/2022
পদ্মাসেতু নিয়ে কেন আমি এতো উচ্ছ্বসিত? কিংবা আমরা, যারা পদ্মার ওপাড়ের মানুষ , 'বিশেষত' তারা কেন এতো বেশি আবেগাপ্লুত? এর হাজারটা কারণ রয়েছে। খুব সাধারণ - খেটে খাওয়া মানুষেরা হয়তো জানেন না, এই নদীতে প্রতি সেকেন্ডে ১,৪০,০০০ ঘনমিটার পানি প্রবাহিত হয় কি না? কিংবা এই ঘনমিটার ব্যাপারটাই বা কী! এমাজনের পরে সবচেয়ে খরস্রোত নদী এই পদ্মা কি না? কিংবা এই নদীর কত কিলোমিটার তলদেশে শক্ত পাথর? কিংবা এর তৈরিতে আসলেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাইলিং হ্যামার বানাতে হয়েছে কি না?
এসব তথ্য হয়তো তারা জানেন না, বোঝেন না। সত্য-মিথ্যার ধারও ধারেন না। এতোসব জটিল গাণিতিক হিসেব নিকেশ বোঝা তাদের জন্য ভীষণ ভার! খটোমটো । কঠিন।
যা সহজ, তা হলো - এ নদীতে কখনো সেতু হতে পারে, এই ভাবনাটাই তারা বিশ্বাসই করতে পারতেন না। অবিশ্বাস্য মনে হতো। হয়তো দশকের পর দশক ধরে তাদের ওই এক আক্ষেপ, ওই এক দীর্ঘশ্বাস, 'ইশ, কোনোদিন যদি পদ্মা বিরিজটা হইতো!
হয়তো তারা জানতেন, এ সম্ভব নয়। কিংবা জানতেন, কবে-কীভাবে সম্ভব, তা অনির্দিষ্ট , অনির্দেশ্য , অনিশ্চিত । তারপরও ওই স্বপ্নটা দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে প্রবাহিত হতোই।
প্রমত্তা পদ্মাকে কে না জানে? কে শোনেনি পদ্মার পরিচয়ে 'সর্বনাশা পদ্মা' অভিধার কথা? এই পদ্মার সর্বনাশা রূপ নিয়ে অসংখ্য গান, কবিতা, উপন্যাস, চলচ্চিত্র , জীবনাখ্যানের কথা?
পদ্মা সর্বনাশা, পদ্মা দুর্বিনীত , উদ্ধত , বুনো, দানবীয় , উন্মত্ত।
এ তো মিথ্যে নয়!
ক্রমশই নাব্যতা হারানো পদ্মা এখনো হাড় হিম করে দিতে পারে ভরা বর্ষায়। তার পাড়ে দাঁড়ালে পায়ের তলার মাটি থরথর করে কাঁপে, প্রলয়ঙ্করী ঢেউ আর উন্মাতাল স্রোতের শো শো শব্দে থরহরি কম্প বুক।
সেই পদ্মা আমরা পাড়ি দেই। জীবন হাতের মুঠোয় নিয়ে উত্তাল ঝঞ্জার বুকে খড়কুটোর মতো ভেসে যাই প্রয়োজনে, প্রিয়জনে। উৎসবে, বিয়োগের দুঃখে, উদযাপনে।
আমাদের মায়েরা-বাবারা খানিক পরপর উৎকণ্ঠিত স্বরে ফোন করেন, 'বাজান, পদ্মা পার হইছ? আল্লাহর নাম নিয়া পার হবা বাজান। গাঙ্গে ঢেউ কি বেশি? ঘাটে লোক কেমুন? স্পীড বোটে চইরো না। দেরী হোক, তাও ফেরীতে আইসো। ইন্নাল্লাহা বিন নাসি লা রউফুর রহিম। ' - বলে আমাদের উদ্দেশ্যে দোয়া পড়ে হাওয়ায় ফুঁ দেন তারা। যেন সন্তান বাড়ি ফেরে নিরাপদে ওই পদ্মা পেরিয়ে।
আমরা ঈদে, উদযাপনে ওই এক পদ্মা পাড়ে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের যান ও জনজটে কেবল মাওয়া ঘাটেই ৭ ঘণ্টা, ১১ ঘন্টা, ১৩ ঘণ্টা কিংবা তারও বেশি বসে থাকি। খোলা আকাশের নিচে তীব্র শীত, তুমুল বৃষ্টি কিংবা আগুনমুখী রোদ ঝলসে বসে থাকি। জানি না, কতক্ষণে ওই নদী পেরোতে পারব। কতক্ষণে পৌঁছাতে পারব বাড়ি।কিন্তু তারপরও রাত জাগা উৎকণ্ঠিত মা-বাবা প্রিয়জনদের আর উৎকণ্ঠায় রাখতে ইচ্ছে হয় না। পদ্মা না পেরিয়েও তাই কতবার যে মাকে মিছেমিছি আশ্বস্ত করেছি, 'মা আপনি ঘুমান। এখন রাত তিনটা। আর জেগে থাকবেন না। এইতো পদ্মা পাড় হয়ে গেছি। কিংবা যাচ্ছি । পদ্মা পেরোলেই আর চিন্তা কী? ওইতো বাড়ি।'
তারপরও মায়েরা ঘুমান না। নির্নিমেষ অপেক্ষায় জেগে থাকেন। কখনো কখনো অসহনীয় জার্নি শেষে ঈদের ভোর রাতে বাড়ি পৌঁছাই। কখনো কখনো ৩০, ৩৫ ঘণ্টার অবিশ্বাস্য , অমানবিক, ভয়াল যাত্রা শেষেও পৌঁছাতে পারি না সঠিক সময়ে... সব আনন্দ ফিঁকে হয়ে যায়। আবার শুরু হয় ঢাকা ফেরার আতঙ্ক।
আতঙ্কে কাঁপে অজস্র দিশেহারা চোখ, মুখ, মন। মুমূর্ষু মা কিংবা সন্তান কিংবা প্রিয়জনের শেষ নিঃশ্বাসটুকু ধরে রাখার অন্তহীন চেষ্টায় , হাহাকারে বিদির্ণ হৃদয়। কখন আসবে ফেরী ? কখন পদ্মা পার হবে এম্বুলেন্স ? কখন পৌঁছাবে ঢাকা!
সেই পদ্মায় সত্যি সত্যি ব্রিজ হবে?
এ এক স্বপ্নের মতো ব্যাপার। কিংবা তারচেয়েও বেশি কিছু। আমাদের শৈশবে আমাদের বাবা-চাচারা সেসব স্বপ্ন দেখতেন বৈকি! কিন্তু তাদের বলার ধরন দেখেই বুঝতাম, এ এক অসম্ভব স্বপ্ন, তা তারাও জানেন। কিংবা সুনীলের সেই 'কেউ কথা রাখেনি'- কবিতার মতো, 'বাবা আমার কাঁধ ছুঁয়ে বলেছিলেন, দেখিস, একদিন আমরাও...'। তারপর ... 'বাবা এখন অন্ধ... আমাদের দেখা হয়নি কিছুই...'- এর মতো সময়ের অমোঘ ঘুর্ণিপাকে ওই স্বপ্ন দেখা আমাদের কত কত বাবা-চাচারাও আর নেই!
কে জানে, এই আক্ষেপ কিংবা স্বপ্ন বুকে পুষে আমরাও সময়ের সঙ্গী হওয়ার কথাই হয়তো ভেবেছিলাম।
কে জানত, সেই ভাবনা সত্যি সত্যিই একদিন এমন করে বদলে যাবে? চোখের সামনে মূর্ত হয়ে উঠবে সেই অবিশ্বাস্য , বিমূর্ত স্বপ্ন। কিংবা তারচেয়েও বেশি কিছু। কে জানত?
এই সেতু নিয়ে অনেক কথা, ভালো লাগা, ভালোবাসা, উচ্ছ্বাস। সঙ্গে সমালোচনাও। থাকুক। জগতে কোন কাজটিই বা অবিসংবাদিত ? কোনোকিছু না।
তারপরও পদ্মার ওপাড়ের ওই লক্ষ লক্ষ মানুষের চোখে যে আলো জ্বেলে দিল এই সেতু, সেই আলোর বিচ্ছুরণ কে ঠেকাবে? কীভাবে ঠেকাবে?
কোটি কোটি মানুষের বুকে যে মায়া মেখে দিল এই সেতু সেই মায়া কে মুছে দেবে? কারো সাধ্য নেই তা। কারো না।
এ এক স্বপ্নযাত্রার সারথি । ধন্যবাদ বাংলাদেশের মানুষ , এই প্রাপ্তি আমার, আপনার, আমাদের সবার। ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রী , এই অসাধারণ প্রতিজ্ঞা ও প্রচেষ্টাটি আপনার।
এ সত্যি সত্যিই স্বপ্ন । কিংবা স্বপ্নের চেয়েও বেশি কিছু। হ্যাঁ, বেশিই।
এই সেতু স্বপ্নের চেয়েও বেশি... স্বপ্নের চেয়েও বড়...
~ সাদাত হোসাইন