02/07/2026
#নাম_ও_কাজ_অনুযায়ী_জ্বীনদের_প্রকার ⤵️
পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে নাম ও কাজ অনুযায়ী জ্বীনদের অনেক প্রকার রয়েছে। জ্বীনদের ইতিহাস ও বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখিত জ্বীনদের প্রকার কাজ নিম্নে উল্লেখ করা হলো। পবিত্র কুরআন ও সহিহ হাদিসে প্রমাণিত জ্বীন ও শয়তানের নামসমূহ⤵️
১. ইবলিস (إبليس)👉 যে সকল জ্বীন বা শয়তানের নেতা।মানুষকে পথভ্রষ্ট করা, কুমন্ত্রণা দেওয়া ও আল্লাহ তা'য়ালার পথ থেকে ফিরিয়ে রাখা।
দলিলঃ সূরা আল-বাকারা, আয়াত নং ৩৪ ; সূরা আল-কাহফ,আয়াত নং ৫০।
২. খান্নাস (الخناس)👉 যে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়,
অন্তরে ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি করে, তারপর সরে যায়। আল্লাহ তা'য়ালার যিকির করলে পিছু হটে। এরা সাধারণ ব্যবসায় অনেক ধরনের ক্ষতি করে। এদের কে অনেক সময় খাবাইস বলা হয় এবং এদের পরীদের কে খুবসি বলা হয়। এরা অপবিত্র জায়গায় এবং পানিতে পরিবার বেশি পছন্দ করে। আমাদের ওয়াশরুমে খান্নাস জ্বীন থাকে। পশ্চিমা বিশ্বে একে সুকুবাস ও ইনকিউবাস বলে অভিহিত করে। যার কথা সূরা নাস-এ উল্লেখ রয়েছে।
৩. খানজাব (خنزب)👉 নামাজে মনোযোগ নষ্ট করা ও
ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি করা। এই জ্বীন সালাতরত মানুষের মনে নানারকম চিন্তা ঢুকিয়ে নামাজ থেকে অমনোযোগী ও উদাসীন করে তুলে। ফলে তারা সালাতে ভুল করে, কত রাকাত পড়েছে মনে থাকেনা, কোনটা কি করছে সন্দেহে পড়ে যায়। এর কারণে সওয়াবও কমে যায়।
দলিলঃ সহিহ মুসলিম, কিতাবুস সালাম, হাদিস নং, ২২০৩।
৪. ইফরিত (عفريت)👉 এটি একটি শক্তিশালী জ্বীনের শ্রেণি। ইফরিতরা নিজেদের ক্ষমতা ও চতুরতার জন্য সুপরিচিত। এদের বিশাল আগুনের ডানা থাকে ও এরা আগুন ছুঁড়তে সক্ষম। এরা সাধারণত স্বভাবে হিংস্র ও দুষ্ট হয়ে থাকে।ইফরিতরা ভূগর্ভে বসবাস করে বলে বলা হয়। এরা সাধারণত অন্যান্য জ্বীনদের বিয়ে করলেও কখনো কখনো মানুষদেরও বিয়ে করে থাকে।এরা কালোজাদুর ব্যবহার করতে পারে।এরা খারাপ আত্মা। মানুষের মতো সমাজব্যবস্থা রয়েছে এদের। সাধারণ কোনো অস্ত্র তাদের ক্ষতি করতে পারেনা। তবে মানুষ চেষ্টা করলে তাদের বশে আনতে পারে, এমনকি সাদাজাদুর মাধ্যমে হত্যাও করতে পারে। সাদাজাদু মানুষ করতে পারেন। ইফরির জ্বীন সম্পর্কে সূরা আন নামল এর ৩৯ নং আয়াতে উল্লেখ আছে।
৫. জান (الجان)👉 জ্বীন জাতির আদিপুরুষ ।
দলিলঃ সূরা আল-হিজর,আয়াত নং ২৭, সূরা আর-রাহমান,আয়াত নং ১৫।
৬. মারিদ (مارد)👉 উদ্ধত ও অবাধ্য জ্বীন। মারিদ হলো জ্বীনদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রজাতি। ইসলাম পূর্ববর্তী সময়কাল থেকেই আরবের বিভিন্ন লোককথায় এর অস্তিত্বের কথা জানা যায়।আরবি ভাষায় ‘মারিদ’ শব্দের অর্থ হলো –দানব। সুবিশাল আকৃতি ও শক্তিমত্তার জন্য তাদেরকে এই নামে ডাকা হয়। তারা নিজেদের খেয়াল-খুশী মতো সবকিছু করে থাকে। তবে এরা প্রচন্ড শক্তিশালী ও বিশাল আকৃতির হওয়া সত্ত্বেও এদেরকে বশ করার মাধ্যমে বিভিন্ন কাজ করিয়ে নেয়া যায়।এ মারিদ জ্বীনদের মারাত্মক একটি রূপ ধারণ করতে পারে। এই মারিদ জ্বীন সম্পর্কে সূরা আস-সাফফাতের ৭ নং আয়াতে উল্লেখ আছে।
৭. কারীন (قرين)👉 প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে একজন সঙ্গী জ্বীন থাকে। তার কাজ হলো মানুষকে কুমন্ত্রণা দেওয়া।
দলিলঃ সূরা কাফ,আয়াত নং ২৩ ও ২৭।
(সহিহ মুসলিম)।
✍️ বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থ ও ইসলামিক দার্শনিকদের লিখিত গ্রন্থ থেকে জ্বীনদের আরো প্রকারভেদ ও কার্যাবলী উল্লেখ করা হলো ⤵️
১/ ওলহানঃ 👉 এরা হচ্ছে একপ্রকার শয়তান জ্বীন যারা মানুষকে ওযুর সময় ওয়াসওয়াসা দেয়।ওয়াসওয়াসাগ্রস্থ মানুষেরা ওযুতে ভুল করে বেশি, এক কাজ কয়েকবার করে, তবুও মনে সন্দেহ থেকে যায় ওযুর অমুক অংগ ধোয়া হয়েছে কিনা? এরা পানি বেশি অপচয় করে।
২/ গইলানঃ👉 এরা হচ্ছে যাদুকর জ্বীন এরা মানুষের পথ বদলে দেয়। হযরত সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস রা. বলেন "আমাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে আমরা গইলান দেখলে যেন আযান দেই"।( মুসনাদে আহমদ ও আল মুসান্নাফ)।
৩/ মাতিয়ানাকঃ👉 এরা হচ্ছে শক্তিশালী ও অনেক ভয়ংকর জ্বীন, মানুষের সন্তান হয়ে জন্মগ্রহণ করে।
৪/ সান্ডেকালাঃ👉 এরা হচ্ছে শক্তিশালী ও অনেক ভয়ংকর জ্বীন, সন্ধ্যা হলে সুযোগ পেলেই বাচ্চাদের ধরে নিয়ে মেরে ফেলে।
৫/ আনজারঃ👉 এরা হচ্ছে শক্তিশালী, অনেক ভয়ংকর ও হিংস্র পশুর ন্যায় স্বভাবের জ্বীন, এদের কোন কাজে ব্যাঘাত ঘটলে সব মানুষের বংশের সবার উপরে আছড় করে ও রূপের প্রলোভন দেখিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ করে এবং বেছে বেছে প্রাপ্তবয়স্ক সুদর্শন পুরুষ ও মহিলা যারা দাইয়্যূস প্রকৃতির মানুষ।
সান্ডেকালা,আনজার ও মাতিয়ানাক প্রজাতির জ্বীনেরা দুষ্ট জ্বীন এবং এরা ইবলিস শয়তানের অনুসারী হয়ে থাকে।
৬/ সাবরাদঃ👉 সাবরাদ দায়িত্বে আছে বিপদাপদে ধৈর্য হারানোর কাজ। মানুষের বিপদ বিপর্যয়ের সময় এই শয়তান তাকে অধৈর্য্য হয়ে মৃত্যুকে ডাকতে, জামাকাপড় ছিঁড়তে, বুক মুখ চাপড়াতে এবং ইসলাম-বিরোধী অজ্ঞসূচক কথাবার্তা বলতে প্ররোচিত করে।
৭/ আঊরঃ👉 আঊরের দায়িত্বে আছে জিনা-ব্যাভিচার। এই শয়তান মানুষকে জিনা-ব্যাভিচারের নির্দেশ দেয় এবং ওই কাজের দিকে আকৃষ্ট করে।
৮/ মাসূতঃ👉 মাসূতের দায়িত্বে আছে মিথ্যা সংবাদ রটানো। যেমন, এই শয়তান মিথ্যা কথা শুনে অন্য লোককে তা বলে। সে আবার তার এলাকার লোকেদের কাছে গিয়ে বলে- একজন আমাকে এইসব কথা বলেছে। তার নাম জানি না বটে, তবে সে আমার মুখচেনা।
৯/ দাসিমঃ👉 দাসিমের কাজ হলো মানুষের সাথে সাথে তার বাড়িতে আসা এবং বাড়ির লোকেদের দোষের কথাগুলো বলে দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে তাকে ক্ষেপিয়ে তোলা।
১০/ যিলনাবূরঃ👉 যিলনাবুরের দায়িত্বে আছে হাট-বাজার। সে তার (গুমরাহীর) পতাকা পুঁতে রেখেছে হাটে বাজারে।
১১/ শিকঃ👉 জ্বীন জাতির মধ্যে অন্যতম একটি প্রজাতি হলো শিক। এরা কিছুটা দানবীয় আকৃতির হলেও তুলনামূলক ভাবে দুর্বল হয়ে থাকে। এ কারণে শিকদের নিম্ন প্রজাতির জ্বীন বলে গণ্য হয়। এরা ঘৌল জ্বীনদের ন্যায় মানুষের সাথে শারীরিক সম্পর্ক করে বাচ্চা জন্ম দিতে পারে।
১২/ নাসনাসঃ👉 এরা ভিন্ন শক্তিশালী জ্বীন। এরা অর্ধেক জ্বীন এবং অর্ধেক পশু হয়। অর্ধেক জ্বীন হয় আর বাকি অর্ধেক কোন পশুপাখি, গাছপালা ইত্যাদি মত মত। এরা নোংরা জায়গায় বেশি থাকে। অর্ধেক দেখা যায় আর বাকি অর্ধেক অদৃশ্য থাকে। এরা বরাবরই মানুষের ক্ষতি করে থাকে এবং বড় বড় ক্ষমতা না থাকা সত্য না জানার খবর দেয়।
১৩/ হিনঃ👉 এরা জ্বীনের মধ্যে এমন এক জাতির অদ্ভুত প্রকৃতির হয়। এরা বড়ই আক্রমণের শিকার হয়। এরা মানুষের কোনো ক্ষতি করতে পারে না। হিন জ্বীনদের মুখটা শিয়ালের মতো কখনও কখনও ইঁদুরের মতো, হাতের আঙ্গুল তিনটা করে থাকে, তার গা রঙ কুৎসিত। এরা বোকা প্রকৃতির হয়। এরা সাধারণত কুকুরের বেশে চলাফেরা করে।
মুসলিম দার্শনিক জাকারিয়া ইবনে মুহাম্মাদ আল-কাজওয়ানি তার ‘দ্য বুক অব জ্বীন’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি সৌদি আরব, পারস্য ও ভারতে অনেকবার হিন জ্বীন দেখেছেন।
১৪/ সিলাতঃ👉 জ্বীনদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী জ্বীন হচ্ছে সিলাত জ্বীন। এরা দ্রুত আকৃতি পরিবর্তন করতে সক্ষম। বরাবরই মেয়ে জ্বীন বা পরী হয়। অত্যন্ত বুদ্ধিমান বলে মনে হয়। এরা খুব কমই মানুষের কাছে আসে। এরা সাধারণ মানুষের ক্ষতি না করে বরং পরোপকার করে থাকে। তবে এরা অনেক সময়ই বিভিন্নভাবে সাহায্য করে।
১৫/ পালিশঃ👉 সাধারণত এরা মরুভূমিতে বেশি থাকে। দেখতে প্রচন্ড কুৎসিত, শরীর খুব দুর্গন্ধময় এবং অন্ধকার ও জনমানবহীন জায়গায় বেশি থাকে। এরা বসবাসের জন্য লুকানোর জায়গা পছন্দ করে। মানুষের ক্ষতি করতে পারে এবং ভয় দেখাতেও বেশি অ্যাক্সপার্ট হতে পারে।পালিস জ্বীনরা ঘুমন্ত অবস্থায় মানুষদের উপর আক্রমণ করে এবং তাদের পা ও অন্যান্য শরীরের অংশ থেকে চেটেপুটে রক্ত খায়।
১৬/ ভেতালাঃ👉 ভেতালা জ্বীন মানুষের মৃতদেহ ধারণ করে ও অনায়াসে মানুষের মৃতদেহে ঢুকতে পারে এবং তাদের মৃতদেহ পচনের ক্ষয়ক্ষতি থেকে প্রতিরোধ করতে পারে। এরা মানুষের রক্তের সাথে খুব মিশে যেতে পারে এবং মানুষের শরীর থেকে রক্ত দ্রুত শুকিয়ে নিয়ে যেতে পারে। ভেতালা জ্বীনও অন্যান্য জ্বীনদের মতো আকৃতি পরিবর্তনে সক্ষম। অনেক সময়কে মনের ভবিষ্যতবাণী করতে পারে ও এদের আধ্যাত্নিক ক্ষমতা রয়েছে এবং অতীতে কোনো তথ্য লাভ করতে সক্ষম বলে মনে করা হয়। এরা মানুষের ব্রেইনে দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে। পশ্চিমা বিশ্বের একে জম্বি বলে অভিহিত করা হয়।
১৭/ যাথুমঃ👉 যাথুম জ্বীনকে ওভারপাওয়ারড জ্বীন বলা হয়। এরা ভয়ংকর জ্বীন। মুখ্য প্রধান আবাস বটবৃক্ষ। এরা যদি কোনো অজান্তে একবার ভূতাবিষ্ট করে তাহলে ছাড়ানো বেশ কঠিন। কোনো প্রকার তাবিজে কাজ হয় না, বিশেষ রূহানী পাওয়ার ছাড়া। এরা মেয়েকে বেশি ভূতাবিষ্ট করে।
💥তথ্যসূত্র⤵️
🌹জ্বীন জাতির বিস্ময়কর ইতিহাস : আল্লামা ইবনুল আছির।
🌹"জিন ও ফেরেশতাদের বিস্ময়কর ইতিহাস - আল্লামা ইবনে কাছীর (রহ.),আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতি রহ."।