18/07/2026
'স্যার, আমার পড়ালেখায় একদম মন বসে না, কোনো কাজই মনোযোগ দিয়ে করতে পারি না। সারাক্ষণ মনে হয় কী যেন করিনি, কিছু একটা যেন মিস করে যাচ্ছি।'
কথাগুলো বলার সময় ছেলেটা খুব নার্ভাস হয়ে যাচ্ছিল। ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কী কর?
'স্যার, আমি অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র। আগে বন্ধুবান্ধবের সাথে অনেক আড্ডা দিতাম, সারাদিন বাইরে ঘুরাঘুরি করতাম। কিন্তু এডমিশনের সময় থেকে সব বাদ দিয়ে পড়ালেখায় মন দিয়েছি, সারাদিন ঘরেই থাকি।'
সমস্যাটা কবে থেকে?
'অনার্সে ভর্তি হওয়ার পর থেকে। পাবলিক ভার্সিটিতে চান্স পাইনি, এটা নিয়ে অনেক হতাশ ছিলাম।'
এখন কি আগের মতো আড্ডা দাও?
'না স্যার। এখন কারো সাথে মিশতে ইচ্ছা করে না। নতুন কারো সাথে পরিচিত হতে হেজিটেশন লাগে। আগে সহজেই সবার সাথে মিশে যেতে পারতাম, এখন পারি না।'
ঘুমের কোনো সমস্যা হয়?
'জ্বি স্যার, মাঝে মাঝে ছোট শব্দেও ঘুম ভেঙে যায়, এরপর আবার ঘুম আসতে কষ্ট হয়।'
পানির কলের টুপটাপ শব্দে রাতে ঘুম ভেঙেছে কখনো?
'জ্বি স্যার, উঠে গিয়ে বন্ধ করে এসেছি, এমন অনেকবার হয়েছে।'
রাতে শুয়ে পড়ার পর দরজা নিয়ে কোনো চিন্তা হয়?
'জ্বি স্যার। ভালো করে দরজা লাগিয়েই শুয়েছিলাম, তারপরও মনে হতো ঠিকমতো লাগেনি। উঠে গিয়ে চেক করে দেখি ঠিকই লাগানো আছে। কিন্তু এসে শুয়ে শুয়ে আবার দরজা নিয়েই ভাবতে থাকি।'
(এরকম একবার মনে হওয়া, উঠে একবার চেক করে আসা, এটা অনেকেরই হয়, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু চেক করে নিশ্চিত হওয়ার পরও সন্দেহ না কাটা, শুয়ে শুয়েও একই চিন্তা মাথায় ঘুরতে থাকা, এখানেই পার্থক্য, কেন সামনে জানবেন)
গোসল করতে কতক্ষণ লাগে? শরীরের একই জায়গায় বারবার সাবান ঘষো? একই জায়গায় বারবার পানি ঢালো?
ছেলেটা অবাক হয়ে গেল, আরে স্যার কীভাবে জানল! বলল, 'জ্বি স্যার, গোসল করতে অনেক সময় লেগে যায়। প্রতিবার ভাবি আজ ৫ মিনিটে বের হব, কিন্তু পারি না।'
রুম কি সবসময় গুছিয়ে রাখো? কেউ রুমে ময়লা করলে বিরক্ত লাগে?
আবারও অবাক হলো ছেলেটা। বলল, 'জ্বি স্যার, আমি নিজে সবসময় পরিষ্কার থাকি, রুমও পরিষ্কার রাখি। কেউ অগোছালো করলে খুব রাগ লাগে।'
আসার সময় কীসে করে এসেছ? গায়ে ধুলাবালি লেগেছে? বাসায় গিয়ে জামাটা কি ধুয়ে ফেলবে?
'জ্বি স্যার, রাস্তায় অনেক ধুলাবালি লেগেছে, বাসায় গিয়ে জামাটা ধুয়ে ফেলতে হবে।'
সিগারেট খাও? চা-কফি বেশি খাওয়া হয়?
'না স্যার, সিগারেট খাই না। চা মাঝে মধ্যে খাই, তবে রেগুলার না।'
ডাক্তার আর প্রশ্ন করলেন না। একটা CBC আর থাইরয়েড প্রোফাইল টেস্ট দিয়ে বললেন, রিপোর্ট নিয়ে এসো। শারীরিক অন্য কোনো কারণ আছে কিনা সেটা আগে বাদ দিতে হবে।
রিপোর্ট সব স্বাভাবিক এলো।
ডাক্তার বললেন, এটা OCD - Obsessive Compulsive Disorder।
ভয়ের কিছু না, এটা মস্তিষ্কের একটা নিউরোবায়োলজিক্যাল কন্ডিশন। বারবার একই অবাঞ্ছিত চিন্তা মাথায় আসে (obsession), আর সেই অস্বস্তি কমাতে একই কাজ বারবার করতে ইচ্ছা করে (compulsion) যেমন এই ছেলেটার বারবার হাত ধোয়া, গোসলে বেশি সময় নেওয়া, সব গুছিয়ে রাখার প্রবণতা।
তবে শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে ভালোবাসাই কিন্তু OCD না। যখন এসব অভ্যাস সময় নষ্ট করে, দৈনন্দিন কাজে বাধা দেয়, বন্ধু-পরিবারের সাথে সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি করে তখনই এটা রোগের পর্যায়ে চলে যায়।
ওষুধ শুরু হলো, সাথে দিনে ১ কাপের বেশি চা না খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলো, বেশি ক্যাফেইন উদ্বেগ আর ঘুমের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। ডাক্তার এটাও বলে দিলেন, নিয়ম মেনে ওষুধ খাওয়ার পরও যদি পুরোপুরি ভালো না হয় তাহলে থেরাপি লাগতে পারে। মানসিক রোগের ওষুধ কাজ শুরু করতে সময় নেয়, তাই ধৈর্য ধরে নিয়ম মেনে খেয়ে যেতে বলা হলো ছেলেটাকে। ধীরে ধীরে তার মধ্যে পরিবর্তন আসতে শুরু করল। আগের মতো বন্ধুদের সাথে মিশতে পারছে, ঘুম ভালো হচ্ছে, গোসলেও আর আগের মতো সময় লাগছে না। জীবনটা আবার স্বাভাবিক হয়ে এলো।
আমরা অনেকেই এরকম কিছু না কিছু নিয়ে বছরের পর বছর একা একা লড়ে যাই। কাউকে বলতে পারি না, লজ্জা লাগে। সাহস করে বললেও অনেক সময় মানুষ হেসে উড়িয়ে দেয়- "এটা আবার কোনো অসুখ নাকি!"
কিন্তু এটা সত্যিই একটা অসুখ। ঠিক যেমন ডায়াবেটিস বা প্রেশার শরীরের অসুখ, মস্তিষ্কেরও অসুখ হয়। আর সেটাও চিকিৎসাযোগ্য। সঠিক সময়ে একজন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে গিয়ে নিয়ম মেনে চিকিৎসা নিলে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়া সম্ভব।
তাই নিজের কষ্টটা লুকিয়ে রাখবেন না। নিজের বা কাছের মানুষের মধ্যে এমন কিছু চোখে পড়লে দেরি না করে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যান। মানসিক রোগ নিয়ে লজ্জার কিছু নেই, লজ্জার বিষয় বরং এটা নিয়ে চুপ করে থাকা।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা দান করুন। 🤍
- শাহরিয়ার, এমবিবিএস ফাইনাল ইয়ার।