20/05/2026
রক্তের রিপোর্টে Serum Creatinine স্বাভাবিক থাকার পরেও যদি eGFR অনেক কমে যায়, তবে সেটি একটি বড় চিন্তার বিষয়। ল্যাবরেটরি বিজ্ঞানের আধুনিক ডায়াগনোসিসে আমরা প্রায়ই এমন রোগী দেখি, যারা ক্রিয়েটিনিন নরমাল দেখে ভাবেন কিডনি একদম সুস্থ, কিন্তু eGFR এর দিকে তাকালে দেখা যায় কিডনির কার্যক্ষমতা অলরেডি কমে গেছে। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় কিডনি রোগের প্রাথমিক বা সুপ্ত ধাপ বলা যেতে পারে।
আজ আপনাদের জানাবো ক্রিয়েটিনিন স্বাভাবিক থাকার পরেও কেন eGFR কমে যায়, এর পেছনের প্রকৃত মেকানিজম এবং এই eGFR এর মান বাড়াতে আপনার করণীয় কী।
ক্রিয়েটিনিন নরমাল কিন্তু eGFR কম কেন?
eGFR-এর পূর্ণ রূপ হলো Estimated Glomerular Filtration Rate। সহজ কথায়, আপনার কিডনি প্রতি মিনিটে ঠিক কত মিলিলিটার রক্ত ছেঁকে পরিষ্কার করতে পারছে, এটি হলো তার পরিমাপ।
👉 আসল মেকানিজম: ক্রিয়েটিনিন হলো আমাদের মাংসপেশি থেকে তৈরি হওয়া একটি বর্জ্য। ল্যাবরেটরিতে আমরা যখন eGFR হিসাব করি, তখন শুধু ক্রিয়েটিনিনের মান দেখা হয় না; এর সাথে রোগীর বয়স, লিঙ্গ, ওজন এবং জাতিগত বৈশিষ্ট্য একটি গাণিতিক সূত্রে বসিয়ে হিসাব করা হয়।
১. মাসল মাস বা পেশির পরিমাণ কম হওয়া: ক্রিয়েটিনিন যেহেতু পেশি থেকে আসে, তাই কোনো ব্যক্তি যদি বয়স্ক হন, শারীরিকভাবে অনেক চিকন হন বা নারীদের ক্ষেত্রে (যাদের মাংসপেশি পুরুষদের চেয়ে কম), তাদের শরীরে ক্রিয়েটিনিন এমনিতেই কম তৈরি হয়। এর ফলে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা স্বাভাবিক (যেমন- 0.8 বা 0.9 mg/dL) দেখাতে পারে।
২. কিডনির ব্লাইন্ড রেঞ্জ (Blind Range): কিডনি বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় সত্য হলো, কিডনি তার কার্যক্ষমতার প্রায় ৫০% না হারানো পর্যন্ত রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা সহজে বাড়ে না। কিন্তু eGFR সূত্রটি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় কিডনির সামান্যতম ক্ষতিও (Early Stage Kidney Damage) এটি দ্রুত ধরে ফেলে। তাই ক্রিয়েটিনিন নরমাল থাকলেও eGFR কমে ৬০ বা তার নিচে নেমে যেতে পারে।
eGFR বাড়াতে বা কিডনি সচল রাখতে করণীয় কী?
যদি ল্যাব রিপোর্টে eGFR কমে যেতে দেখেন, তবে দ্রুত সচেতন হলে কিডনিকে পুনরায় সুস্থ বা স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এর জন্য নিচের গাইডলাইনগুলো মেনে চলতে হবে:
👉 ১. পর্যাপ্ত ও সঠিক পরিমাণে পানি পান:
শরীরে পানির অভাব বা ডিহাইড্রেশন হলে eGFR সাময়িকভাবে অনেক কমে যায়। তাই প্রতিদিন শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী (সাধারণত আড়াই থেকে তিন লিটার) পানি পান করতে হবে যাতে কিডনি সহজে রক্ত ছাঁকতে পারে। (তবে কিডনি রোগ তীব্র হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পানি মেপে খেতে হবে)।
👉 ২. ব্লাড প্রেসার ও ডায়াবেটিস কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখা:
উচ্চ রক্তচাপ এবং হাই সুগার হলো কিডনির ফিল্টার বা গ্লোমেরুলাসের প্রধান শত্রু। প্রেসার সবসময় ১২০/৮০ এর আশেপাশে এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখলে কিডনির ওপর চাপ কমে এবং eGFR উন্নত হয়।
👉 ৩. ব্যথানাশক ওষুধ (NSAIDs) সম্পূর্ণ বর্জন:
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যত্রতত্র পেইন কিলার বা ব্যথানাশক ট্যাবলেট (যেমন- ডাইক্লোফেনাক, নেপ্রোক্সেন, কিটোরোলাক) খাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। এই ওষুধগুলো কিডনির রক্তপ্রবাহ কমিয়ে মুহূর্তের মধ্যে eGFR মারাত্মক কমিয়ে দেয়।
👉 ৪. খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন:
খাবারে অতিরিক্ত লবণ খাওয়া বন্ধ করতে হবে, কারণ লবণ রক্তচাপ বাড়ায় এবং কিডনিকে দুর্বল করে। একই সাথে অতিরিক্ত প্রোটিন বা লাল মাংস (Red Meat) খাওয়া কমাতে হবে, যা কিডনির ফিল্টারিং লাইনের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
ল্যাবরেটরিতে কোন বিষয়গুলো খেয়াল করবেন?
eGFR এর প্রকৃত অবস্থা এবং কিডনির সুপ্ত ক্ষতি নিশ্চিত হতে ল্যাবরেটরিতে নিচের টেস্টগুলো করা জরুরি:
eGFR with Cystatin C: ক্রিয়েটিনিনের ভুলের ঊর্ধ্বে গিয়ে কিডনির শতভাগ সঠিক ফিল্টারিং রেট জানতে এই আধুনিক টেস্টটি করা উচিত।
Urine ACR (Albumin-to-Creatinine Ratio): কিডনির ফিল্টার ফুটো হয়ে প্রস্রাব দিয়ে প্রোটিন বা অ্যালবুমিন যাচ্ছে কি না তা দেখার জন্য।
প্রফেশনাল পরামর্শ:
আমি যখন ল্যাবরেটরিতে আপনাদের রিপোর্টগুলো বিশ্লেষণ করি, তখন অনেক রোগীকে দেখি যারা শুধু ক্রিয়েটিনিন নরমাল দেখে নিশ্চিন্তে বসে থাকেন। এটি ভুল। সবসময় রিপোর্টের নিচে থাকা eGFR এর মানটি খেয়াল করবেন। যদি eGFR এর মান ৬০ এর নিচে নেমে যায়, তবে দেরি না করে একজন নেফ্রোলজিস্ট বা কিডনি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। প্রাথমিক ধাপে লাইফস্টাইল পরিবর্তন এবং সঠিক যত্নের মাধ্যমে কিডনির কার্যক্ষমতা আবার বৃদ্ধি করা বা অন্তত ড্যামেজ হওয়া থেকে বাঁচানো পুরোপুরি সম্ভব।
ক্লিনিক্যাল ডায়েটিশিয়ান এন্ড নিউট্রশনিষ্ট
সুরাইয়া নাজনীন তুলি
ইউনিটি এইড হাসপাতাল লিঃ
দক্ষিণ বনশ্রী ঢাকা