07/05/2026
ওটিতে ঢুকে রাব্বান স্যার বললেন,
এই যে তোরা রোগীটা দেখছিস? এর স্বামী বেটাকে একটা নোবেল দেয়া উচিত।
-আমাদের সবার কৌতূহলটা বেড়ে গেলো। কেন?
-স্যারের সামনে তখন অপারেশন বেডে শুয়ে আছে বছর ২৫ এর একটি মেয়ে। অজ্ঞান, নিস্তব্ধ। একটু পরেই অপারেশন শুরু হবে।
ওর হাসবেন্ড যখন ভালোবেসে ওকে বিয়ে করে তখন জানতো যে তার ভালোবাসার মানুষটির দুটো কিডনিই প্রায় নষ্টের পথে। বিবাহের ১ বছরের মাথায় দুটো কিডনি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেলো। প্রস্রাব হতো না একটুও।জীবন ঝুলে গেলো ডায়ালাইসিস মেশিনের সাথে।
দিনমজুর স্বামী নিজের ঘাম দিয়ে কিনে আনতে লাগলো স্ত্রীর জন্য বেঁচে থাকার সময়। টানা তিন বছর এই মানুষটা কোন অভিযোগ ছাড়াই ব্যায়বহুল এই ডায়ালাইসিস এর খরচ চালিয়ে যাচ্ছেন নীরবে। এর সাথে এসে জুটেছে Diabetes আর Hepatitis.
তারপরও জীবন থেমে থাকেনি। গত বছর তার স্ত্রী আশার আলো জ্বালিয়ে সন্তানসম্ভবা হলেন। কিন্তু ৭ মাসে এসে সেই আলো নিভে গেলো। শিশুটাকে বাঁচানো গেল না।
আবারো ধাক্কা!
এর পরপরই ধরা পড়লো Ovarian টিউমার। আবার অপারেশন। কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ হলো না। কিছুদিনের মধ্যেই পেটে পানি জমতে শুরু করলো। পেট ফুলে গেছে অস্বাভাবিক রকম। আজকে তার জন্যই আবার অপারেশনে এসেছে। কিন্তু স্যার পেট থেকে বের করলেন বড়ো গামলার আধা গামলা জমাট বাঁধা রক্ত(ছবিতে যেটা দেখা যাচ্ছে)।
-সবকিছু শুনে এর বেচারা স্বামীকে আমার দেখতে মন চাইলো। অপারেশন শেষে বাইরে বেরিয়ে দেখলাম তিনি
দাঁড়িয়ে আছে চোখে মুখে একরকম উৎকণ্ঠা নিয়ে।
জিজ্ঞেস করে জানলাম তিনিই পেশেন্ট এর হাসবেন্ড।
বয়স ২৫/২৬ হবে। সুন্দর সুঠাম দেহ। পাশে দাড়ানো মহিলাটি তার শাশুড়ী।
আমি গল্পটা আবার শুনতে চাইলাম।
সে আবারও বললো একইভাবে। শেষে হাসিমুখে বললো, কি করি কন স্যার? নিজের মানুষ তো......
স্যার একটু দোয়া কইরেন। ওর এখন কী অবস্থা? ঠিক আছে তো? পাশে তার শাশুড়ী শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে আছে জামাইয়ের দিকে।
আমি কিছু সান্ত্বনা দিয়ে চলে আসলাম।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে চিন্তা করলাম লোকটা যদি একটু বেশি শিক্ষিত হতো, হয়তো নিজের জীবনের হিসাবটা একটু ভালো করে মিলাতে পারতো। হয়তো এত কষ্ট নিজের কাঁধে তুলে নিত না। এই মেয়েটাকে ছেড়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করতো। একটা সহজ, স্বাভাবিক জীবন বেছে নিত।
-তারপরই আবার মনে হলো, তাহলে স্যার এই বোকা লোকটারে নোবেলটা কিসের জন্য দিতে চাইলেন?
কি জানি.......!
হয়তো এই বোকা লোকটাই আসলে ভালোবাসার সবচেয়ে জটিল অঙ্কটা মেলাতে পেরেছে তাই। কিন্তু এরকম অঙ্কতে তো নোবেল দেয় না!
নাকি জীবনকে কঠিন জেনেও পাশে থাকার সাহসের জন্য? যেখানে লাভ-ক্ষতির হিসেব নেই, শুধু আছে থেকে যাওয়ার মতো একগুঁয়ে এক টান!
[ডা.সাওবান মাতুব্বর ]