13/09/2026
ডেঙ্গু হলে কী করবেন, কী করবেন না; এক পোস্টে গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য, জনস্বার্থে শেয়ার করুন...
ডেঙ্গু শুধু জ্বরের রোগ নয়। বেশিরভাগ রোগী সুস্থ হয়ে গেলেও কিছু রোগীর ক্ষেত্রে হঠাৎ করে গুরুতর ডেঙ্গু হতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জ্বর কমে গেলেই বিপদ কেটে গেছে এমনটা ভাববেন না। বরং জ্বর কমার সময় এবং পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় অনেক রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে পারে। সাধারণত অসুস্থতার ৩ থেকে ৮ দিনের মধ্যে ক্রিটিক্যাল ফেজ দেখা দিতে পারে।
১. ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণ কী?
হঠাৎ জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও জয়েন্টে ব্যথা, বমি বমি ভাব, বমি, দুর্বলতা এবং কখনো ত্বকে র্যাশ দেখা দিতে পারে। শুধু এসব লক্ষণ দেখে নিশ্চিতভাবে ডেঙ্গু বলা যায় না, প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করতে হয়।
২. ডেঙ্গু হলে প্রথম কাজ কী?
বিশ্রাম নিন এবং পর্যাপ্ত তরল পান করুন। পানি, ওরস্যালাইন এবং উপযুক্ত ইলেক্ট্রোলাইটযুক্ত তরল গ্রহণ করুন। বমি বা পানিশূন্যতা থাকলে বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
৩. জ্বর কমানোর জন্য কী করবেন?
প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যায়। শিশুদের ক্ষেত্রে ওজন অনুযায়ী সঠিক ডোজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৪. কোন ওষুধ এড়িয়ে চলবেন?
অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন এবং অন্যান্য NSAID জাতীয় ব্যথার ওষুধ এড়িয়ে চলুন। এগুলো রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। নিজের ইচ্ছায় কোনো ব্যথার ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করবেন না।
৫. অযথা স্যালাইন দেবেন না
ডেঙ্গু হলেই সবার শিরায় স্যালাইন দেওয়ার প্রয়োজন নেই। যাদের সতর্কসংকেত নেই এবং মুখে পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ করতে পারছেন, তাদের ক্ষেত্রে সাধারণত মুখে তরলই যথেষ্ট। অতিরিক্ত IV fluid দিলে fluid overload এবং শ্বাসকষ্টের মতো জটিলতা হতে পারে। স্যালাইন প্রয়োজন কি না, তা রোগীর অবস্থা দেখে চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেবেন।
৬. শুধু প্লেটলেট দেখেই রোগীর অবস্থা বিচার করবেন না
ডেঙ্গুতে প্লেটলেট কমতে পারে, কিন্তু শুধু প্লেটলেটের সংখ্যা দেখে রোগীর ঝুঁকি নির্ধারণ করা ঠিক নয়। রোগীর রক্তচাপ, পালস, শ্বাসপ্রশ্বাস, প্রস্রাবের পরিমাণ, পানিশূন্যতা, রক্তপাত, হেমাটোক্রিট এবং সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
৭. প্লেটলেট কমলেই প্লেটলেট দিতে হবে কি?
না। শুধু প্লেটলেটের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে নিয়ম করে prophylactic platelet transfusion দেওয়া সুপারিশ করা হয় না। উল্লেখযোগ্য সক্রিয় রক্তপাত বা নির্দিষ্ট ক্লিনিক্যাল পরিস্থিতিতে রক্ত বা অন্যান্য blood product প্রয়োজন হতে পারে, যা চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেবেন।
৮. কোন লক্ষণগুলো সবচেয়ে বিপজ্জনক?
তীব্র পেটব্যথা বা পেটে চাপ দিলে ব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া, বমি বা পায়খানায় রক্ত, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্থিরতা বা ঘুমঘুম ভাব, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, খুব বেশি তৃষ্ণা, ফ্যাকাশে বা ঠান্ডা ত্বক, প্রস্রাব কমে যাওয়া কিংবা চেতনার পরিবর্তন হলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
৯. জ্বর কমে গেলে কী করবেন?
জ্বর কমে যাওয়াকে সবসময় সুস্থ হওয়ার লক্ষণ ভাববেন না। ডেঙ্গুর ক্রিটিক্যাল ফেজ অনেক সময় জ্বর কমার সময় শুরু হয়। তাই জ্বর কমার পরও রোগীকে সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
১০. প্রস্রাবের দিকে নজর রাখুন
রোগী স্বাভাবিকভাবে প্রস্রাব করছে কি না লক্ষ্য করুন। প্রস্রাবের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে, বিশেষ করে দুর্বলতা বা মাথা ঘোরার সঙ্গে থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
১১. শিশুর ক্ষেত্রে আরও সতর্ক থাকুন
শিশু ঠিকমতো পানি বা তরল খাচ্ছে কি না, বারবার বমি করছে কি না, প্রস্রাব কমেছে কি না, অতিরিক্ত ঘুমাচ্ছে বা অস্বাভাবিক বিরক্ত হচ্ছে কি না এবং শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে কি না খেয়াল করুন। খুব ছোট শিশুদের অবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।
১২. গর্ভবতী নারী ও কিছু বিশেষ রোগীর ক্ষেত্রে সতর্কতা বেশি
গর্ভাবস্থা, কিডনি বা লিভারের রোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, asthma, peptic ulcer disease, anticoagulant ব্যবহারসহ কিছু অবস্থায় হাসপাতালে পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হতে পারে। খুব ছোট শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রেও বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
১৩. রোগীকে মশার কামড় থেকে রক্ষা করুন
ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে মশা কামড়ালে সেই মশার মাধ্যমে অন্য মানুষের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই অসুস্থ অবস্থায় বিশেষ করে জ্বরের সময় রোগীকে মশারির মধ্যে রাখা এবং মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত রাখা জরুরি।
১৪. বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি সরান
ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, বোতল, ডাবের খোসা, নির্মাণসামগ্রী বা যেকোনো জায়গায় জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননস্থল হতে পারে। নিয়মিত এসব জায়গা পরিষ্কার করুন এবং পানির পাত্র ঢেকে রাখুন।
১৫. কখন হাসপাতালে যাবেন?
উপরের যেকোনো সতর্কসংকেত দেখা দিলে অপেক্ষা করবেন না। বিশেষ করে জ্বর কমার পর পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্থিরতা, ঘুমঘুম ভাব বা প্রস্রাব কমে গেলে দ্রুত হাসপাতালে যান। গুরুতর ডেঙ্গু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মারাত্মক আকার নিতে পারে।
প্রচারে- সরকারী ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মিরপুর ১৩ ঢাকা।