23/04/2026
নতুন শিশুর মা-বাবা যা জানতে চায়
এমবিবিএস পড়ার সময় পেডিয়াট্রিক্সের প্রফেসর ম্যাডামকে আমি বেশ ভয় পেতাম। এতে উপকার যেটি হয়েছে সবচেয়ে ভালো পড়া হয়েছিল পেডিয়াট্রিক্সই।
আবিদ হোসেন মোল্লা স্যারের একটি লাল বই ছিল তখন, যেটির প্রায় পুরোটাই মেমোরাইজ হয়ে গিয়েছিল। যতোদূর মনে পড়ে, ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষায় পেডিয়াট্রিক্স থেকে কোনো প্রশ্নেই আটকাইনি।
পরবর্তী সময়ে ম্যাডামের মাতৃসুলভ স্নেহ ও আন্তরিকতা কখনও ভোলার না।
আমার কন্যা ইনশিরাহ মেহরিশ খান-এর জন্মের আগ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত নিওন্যাটালজির (নবজাতক) দেশ-বিদেশের অথেন্টিক সোর্সের কতো আর্টিকেল যে পড়েছি তার কোনো হিসেব নেই!
নতুন শিশু যেমন অনেক আনন্দ আর উত্তেজনা নিয়ে আসে, আবার তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তারও অন্ত থাকে না নতুন প্যারেন্টের।
ভাবছি নন-ডক্টর প্যারেন্টদের জন্য যদি বাংলা ভাষায় কিছু সাধারণ বিষয় ধারাবাহিকভাবে লিখি তো কেমন হয়? মনে হয় তারা দু'আ করবে।
১. গোল্ডেন আওয়ার বলে একটা টার্ম শোনা যায়। বিষয়টি আসলে কী?
জন্মের পরবর্তী প্রথম ৬০ মিনিট বা এক ঘণ্টাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে 'গোল্ডেন আওয়ার' বলা হয়। এই সময়টি শিশুর নতুন পৃথিবীর সাথে মানিয়ে নেয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
জন্মের পরপরই শিশুকে মায়ের পেটের ওপর বা বুকের ওপর রাখা হয়। স্কিন টু স্কিন কনটাক্ট। এতে শিশুর শরীরের তাপমাত্রা স্থিতিশীল থাকে এবং সে মায়ের শরীরের পরিচিত গন্ধ ও হৃদস্পন্দনে নিরাপদ বোধ করে।
এই এক ঘণ্টার মধ্যেই শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা শুরু করতে হবে। এই সময়ে শিশু বেশ অ্যালার্ট থাকে, যা বুকের দুধ টানার অভ্যাস তৈরি করতে সাহায্য করে।
এটি শিশুর কান্নাকাটি কমায়, রক্তে শর্করার মাত্রা ঠিক রাখে এবং মা ও শিশুর মধ্যে গভীর বন্ধন তৈরি করে।
স্কিন-টু-স্কিন কন্টাক্টের ফলে মায়ের শরীরে অক্সিটোসিন বাড়ে, যা দুধ নিঃসরণ সহজ করে এবং জরায়ুর রক্তক্ষরণ কমায়।
(National Strategy for Infant and Young Child Feeding in Bangladesh Guidelines)
২. শালদুধ কি ফেলে দিতে হবে?
প্রসবের পর প্রথম ২-৩ দিন মায়ের স্তন থেকে যে ঘন, আঠালো এবং কিছুটা হলুদ রঙের দুধ বের হয়, তাকেই শাল দুধ বলা হয়। অনেক জায়গায় ভুলবশত এটি ফেলে দেওয়া হয়, যা শিশুকে চরমভাবে বঞ্চিত করার নামান্তর।
এটিকে শিশুর প্রথম টিকা বলা হয়। শাল দুধে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিবডি (Immunoglobulin A) থাকে, যা শিশুকে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং অন্যান্য সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। এটি সরাসরি শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে।
এটি সহজপাচ্য তো বটেই, ভীষণ পুষ্টিকরও। এতে প্রচুর প্রোটিন এবং ভিটামিন থাকে। কিন্তু চর্বি কম থাকে। যা নবজাতকের অপরিণত পাকস্থলীর জন্য একদম পারফেক্ট।
শাল দুধ একটি প্রাকৃতিক ল্যাক্সেটিভ হিসেবে কাজ করে। এটি শিশুর পেটের প্রথম মল (Meconium) পরিষ্কার করতে সাহায্য করে, যার ফলে নবজাতকের জন্ডিস হওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে যায়।
মনে রাখতে হবে, শুরুতে শাল দুধের পরিমাণ খুব কম মনে হতে পারে। মাত্র কয়েক চামচ। কিন্তু নবজাতকের পাকস্থলী তখন একটি ছোট মার্বেলের সমান থাকে, তাই এই সামান্য পরিমাণই তার জন্য যথেষ্ট। একটা মার্বেলের মধ্য আর কতোটুকুইবা দুধ ধরে?
(Baby-Friendly Hospital Initiative of WHO & UNICEF)
৩. বাচ্চা তো দেখি কি সারাক্ষণ ঘুমায়। চিন্তার বিষয় না?
নবজাতকের পৃথিবীটা সত্যিই আমাদের থেকে অনেক আলাদা। মায়ের জরায়ুর অন্ধকার ও নিরাপদ পরিবেশ থেকে বের হয়ে বাইরের উজ্জ্বল আলো এবং শব্দের সাথে মানিয়ে নিতে তার বেশ সময় লাগে।
একজন সুস্থ নবজাতক গড়ে দিনে ১৬ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত ঘুমাতে পারে। তাদের ঘুমের কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি থাকে না। তারা দিনের চেয়ে রাতে বেশি জাগতে পারে। এটিকে (Day-night reversal) বলে। যা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।
কেন এত ঘুমায়?
ঘুমের মধ্যেই শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ সবচেয়ে দ্রুত ঘটে এবং শরীর বৃদ্ধির হরমোন নিঃসৃত হয়। তারা মূলত জেগে ওঠে ক্ষুধার তাড়নায়, পেট ভরে দুধ খাওয়ার পর আবার প্রশান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ে।
কখন সতর্ক হতে হবে?
- যদি দেখা যায়, বাচ্চা দুধ খাওয়ার জন্য একেবারেই জাগছে নাশরীর একদম নিস্তেজ বা ঢিলেঢালা হয়ে আছে
- কান্না খুব ক্ষীণ বা দুর্বল
- বাচ্চার গায়ের রং ফ্যাকাশে বা নীল হয়ে যাচ্ছে।
এমন হলে দ্রুতই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
(American Academy of Pediatrics- Sleep in Newborns.)
৪. নবজাতককে কতবার এবং কেন ঘন ঘন দুধ খাওয়াতে হবে?
নবজাতকের পাকস্থলী ছোটো হওয়ায় একবারে খুব সামান্যই খেতে পারে এবং বুকের দুধ খুব দ্রুত হজম হয়ে যায়।
প্রথম কয়েক সপ্তাহ শিশুকে প্রতি ২ থেকে ৩ ঘণ্টা পরপর দুধ খাওয়ানো উচিত। একে বলা হয় "Feeding on Demand" বা শিশু যখনই চাইবে তখনই খাওয়ানো।
কেন ঘন ঘন খাওয়ানো জরুরি?
-ওজন বৃদ্ধি: বাচ্চার সঠিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য নিরবচ্ছিন্ন পুষ্টি নিশ্চিত হয়।
-জন্ডিস প্রতিরোধ: ঘন ঘন দুধ খেলে বাচ্চার পায়খানা ও প্রস্রাব নিয়মিত হয়, যা শরীর থেকে বাড়তি বিলিরুবিন বের করে দিয়ে নবজাতকের জন্ডিস কমাতে সাহায্য করে।
- দুধের সরবরাহ বৃদ্ধি: বাচ্চা যতো বেশি দুধ টেনে খাবে, মায়ের শরীরে তত বেশি অক্সিটোসিন ও প্রোল্যাকটিন হরমোন তৈরি হবে, যা দুধের উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়।
প্রথম কয়েক সপ্তাহ যদি বাচ্চা ৩-৪ ঘণ্টার বেশি একটানা ঘুমায়, তবে তাকে হালকা সুড়সুড়ি দিয়ে বা শরীর মুছে জাগিয়ে তুলে দুধ খাওয়ানো দরকার।
(UNICEF - Infant and Young Child Feeding (IYCF) Guidelines.)
৫. জন্মের পর বাচ্চার ওজন না বেড়ে দেখি উল্টো কমে যাচ্ছে। এ কী হচ্ছে?
অনেক বাবা-মা ঘাবড়ে যান যখন দেখেন জন্মের দুই-তিন দিন পর বাচ্চার ওজন আগের চেয়ে কমে গেছে। কিন্তু এটি ফিজিওলজিক্যাল বা প্রাকৃতিক একটি প্রক্রিয়া।
ওজন কমার কারণ কী?
শিশু গর্ভে থাকা অবস্থায় তার শরীরে কিছু বাড়তি পানি বা ফ্লুইড থাকে। জন্মের পর প্রস্রাব ও প্রথম মল (Meconium) ত্যাগের মাধ্যমে সেই বাড়তি পানি বেরিয়ে যায়। এছাড়া প্রথম দিকে শাল দুধের পরিমাণ কম থাকায় ক্যালরি গ্রহণও কিছুটা কম হয়।
হিসাবটি কেমন আসলে?
বার্থ ওয়েটের ৫-১০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়াকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্বাভাবিক ধরা হয়।
সাধারণত ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে শিশু আবার তার জন্মের সময়ের ওজনে ফিরে আসে। এরপর থেকে প্রতিদিন গড়ে ২৫-৩০ গ্রাম করে ওজন বাড়তে থাকাটা স্বাভাবিক।
কখন চিন্তার বিষয়?
যদি ১০ দিন পার হওয়ার পরও ওজন না বাড়ে, অথবা ওজন কমার হার ১০ শতাংশের বেশি হয়, তবে বুঝতে হবে বাচ্চা পর্যাপ্ত দুধ পাচ্ছে না (Inadequate feeding)। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া উচিত।
(NICE Guidelines)
.collected ❤️❤️