23/09/2025
ধারাবাহিক উপন্যাস
“রক্ত আর রোদ্দুর”
-----------------
অষ্টম (শেষ) পর্ব
-----------------
রিমঝিম হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেল। দীর্ঘ প্রায় এক বছর পর সে আবার খোলা আকাশের নিচে দাঁড়াল। বুক ভরে শ্বাস
নিল, যেন এতদিন তার ফুসফুস কোনো খাঁচার ভেতর বন্দি ছিল। হাসপাতাল প্রাঙ্গণের সবুজ ঘাসে পা রাখতেই এক অদ্ভুত
শিহরণ খেলে গেল তার সারা শরীরে। আজাদের চোখ তখন চিকচিক করছিল, মুখে এক চিলতে হাসি।
“আজাদ, আমি কি সত্যিই সুস্থ হয়ে গেছি?” রিমঝিম বলল।
আজাদ ওর দিকে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ, রিমঝিম। তুমি ফিরে এসেছো। নতুন করে।”
ওরা দুজন হাঁটতে শুরু করল। শহরটা যেন নতুন রূপে ধরা দিচ্ছিল রিমঝিমের চোখে। প্রতিটি কোলাহল, প্রতিটি পরিচিত
মুখ, এমনকি রাস্তার ধুলোও তার কাছে নতুন লাগছিল। আজাদ তার হাত ধরে ছিল, ঠিক যেমন কঠিন দিনগুলোতে সে
পাশে ছিল।
“জানো আজাদ, মাঝে মাঝে মনে হতো, আমি বোধহয় আর হাঁটতে পারব না, আলো দেখতে পাব না।”
আজাদ আলতো করে রিমঝিমের হাত চাপল, “আমি জানতাম তুমি পারবে। তোমার ভেতরের শক্তিটা অনেক বড়।”
রিমঝিম ফিরে এলো তার পুরনো বাসায়। মা আর বাবা যেন নতুন জীবন পেলেন। তাদের চোখেমুখে আনন্দ আর স্বস্তি।
রিমঝিমের ঘরটা নতুন করে সাজানো হয়েছে, জানালার পর্দায় ঝলমলে আলো। রিমঝিম হাসছিল, কিন্তু তার মনে ছিল এক
অদ্ভুত শূন্যতা, এক নতুন জীবনের সন্ধানে সে যেন এখনো পথ হাতড়াচ্ছিল।
“এখন কি হবে, আজাদ?” রিমঝিম এক সন্ধ্যায় চায়ের কাপ হাতে বলল। “আমি তো পড়াশোনা থেকে অনেক দূরে চলে
গেছি। আবার কি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারব?”
আজাদ বলল, “স্বাভাবিক জীবন বলে কিছু হয় না, রিমঝিম। তুমি এখন আগের চেয়েও শক্তিশালী। তোমার অভিজ্ঞতা
তোমাকে আরও পূর্ণ করেছে। তুমি যা খুশি করতে পারো।”
একদিন বিকেলে রিমঝিম ক্যাম্পাসের পাশ দিয়ে হাঁটছিল। পুরনো দিনের স্মৃতিগুলো ভিড় করে আসছিল। লাইব্রেরির সামনে
লিখন আর তার হাসির শব্দ, ক্যান্টিনে কফি খাওয়ার মুহূর্তগুলো। হঠাৎ চোখ পড়ল পরিচিত এক চেহারার দিকে। লিখন।
সে একা দাঁড়িয়ে ছিল, চুল এলোমেলো, চোখে বিষণ্ণতা। রিমঝিমকে দেখে সে চমকে উঠল।
“রিমঝিম?” লিখন ফিসফিস করে বলল। তার চোখে অবিশ্বাস, বিস্ময় আর অপরাধবোধের এক অদ্ভুত মিশ্রণ।
রিমঝিম দাঁড়িয়ে পড়ল, স্থির দৃষ্টিতে তাকাল লিখনের দিকে। তার মনে কোনো রাগ বা অভিযোগ ছিল না, শুধু এক
অদ্ভূত প্রশান্তি।
“হ্যাঁ, আমি ফিরে এসেছি, লিখন।” রিমঝিম শান্ত গলায় বলল।
লিখন কিছু বলতে পারল না। তার মাথা নিচু হয়ে গেল। সে হয়তো ভেবেছিল, রিমঝিম আর নেই, অথবা বেঁচে থাকলেও
তাকে আর কখনো দেখা হবে না।
“আমি... আমি দুঃখিত, রিমঝিম।” লিখন অবশেষে বলল। “আমি তোমার পাশে থাকতে পারিনি।”
রিমঝিম মৃদু হাসল। “থাকোনি, কিন্তু আমার প্রয়োজন ছিল না। যারা ছিল, তারা সত্যিকারের ছিল।”
লিখন এবার রিমঝিমের দিকে তাকাল। তার চোখে তখনো অপরাধবোধের ছায়া। “আমি শুনেছি... তোমার অনেক কষ্ট
হয়েছে। আমি জানি, আমাকে ক্ষমা করা কঠিন।”
রিমঝিম তার কথায় বাধা দিয়ে বলল, “ক্ষমা? আমি তো ভুলেই গেছি, লিখন। আমার জীবনে এখন নতুন রোদ্দুর।
পুরনো দিনের ছায়া আর আমাকে স্পর্শ করে না।”
লিখন দেখল রিমঝিমের পাশে আজাদ দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে ছিল স্থির বিশ্বাস আর ভালোবাসা। লিখন বুঝল,
রিমঝিমের জীবন থেকে সে শুধু সরেই যায়নি, বরং এক নতুন অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছে, যেখানে তার আর কোনো স্থান নেই।
“ভালো থেকো, লিখন।” রিমঝিম বলল।
লিখন কোনো উত্তর দিতে পারল না। সে শুধু দেখল, রিমঝিম আজাদের হাত ধরে নতুন রোদ্দুরের দিকে হেঁটে যাচ্ছে।
লিখনের চোখে তখন স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠলো, রিমঝিম শুধু বেঁচে ফেরেনি, সে আরও দৃঢ়, আরও আলোকিত হয়ে
ফিরেছে। আর তার এই নতুন জীবনে আজাদের মতো একজন সত্যিকারের মানুষ পাশে আছে।
রিমঝিম আর আজাদ হেঁটে যাচ্ছিল। তাদের গন্তব্য কোথায়, তা তারা জানে না। কিন্তু পথটা আলোকিত, কারণ তাদের সঙ্গে ছিল ভালোবাসা, বিশ্বাস আর নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন। রিমঝিম অনুভব করল, জীবন তাকে অনেক কিছু কেড়ে
নিয়েছে বটে, কিন্তু তার বিনিময়ে দিয়েছে আরও মূল্যবান কিছু—আজাদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, নিজের ভেতরের অসীম
শক্তি আর প্রতিটি নতুন সকালকে উপভোগ করার এক নতুন মন্ত্র। (সমাপ্ত)