18/08/2026
#কিডনিকথন ১
ডাক্তার, আমার তো কোনো সমস্যাই ছিল না!”
চেম্বারে বসে আছেন ৫২ বছরের একজন ভদ্রলোক।
হাতে রিপোর্টের ফাইল।চোখেমুখে চিন্তা।
-রিপোর্টটা
আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ডাক্তার, একটু দেখবেন? Creatinine নাকি অনেক বেশি এসেছে।”
আমি রিপোর্ট দেখলাম।তারপর জিজ্ঞেস করলাম,
— “আগে কখনো কিডনির পরীক্ষা করেছিলেন?”
— “না।”
— “কোনো সমস্যা হচ্ছিল?”
একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে বললেন,
না তো! আমি তো একদম ভালো আছি।”
— প্রস্রাব কম হচ্ছে?”
"না।”
-পা ফুলছে?”
-"না।”
— “বমি? খাবারে অরুচি? শ্বাসকষ্ট?”
“কিছুই না ডাক্তার।”
তারপর খুব স্বাভাবিক একটা প্রশ্ন—
“তাহলে কিডনি খারাপ হলো কীভাবে?”
এই প্রশ্নটাই আসলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ কিডনি রোগের সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো
অনেক সময় কিডনি নষ্ট হতে থাকে, কিন্তু মানুষ বুঝতেই পারে না।আপনি শুধু ধরে নেন—প্রস্রাব হচ্ছে,মানে কিডনি ঠিক আছে।এখানেই ভুলটা।
⸻
একটা ছোট্ট গল্প ভাবুন।
ধরুন আপনার কিডনির মোট কাজের ক্ষমতা ১০০%।
কোনো কারণে কিডনির কিছু অংশ ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করল।
১০% গেল।
আপনি কিছুই বুঝলেন না।
২০% গেল।
তবুও আপনি স্বাভাবিক।
৩০% গেল।
অফিস করছেন, বাজার করছেন, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন।
৪০% গেল।
তবুও হয়তো কোনো বিশেষ উপসর্গ নেই।
কারণ শরীরের বাকি সুস্থ অংশগুলো অতিরিক্ত কাজ করে ঘাটতিটা সামলে নিচ্ছে।
আপনি ভাবছেন—
“আমি তো একদম ঠিক আছি!”
কিন্তু ভেতরে ভেতরে কিডনি বলছে—
“আমি আর আগের মতো পারছি না।”
আর সেই কথাটা অনেক সময় আপনি শুনতে পান না।
⸻
তারপর একদিন হঠাৎ…
রুটিন health check-up।
সাথে ছিল—
Serum Creatinine
Urine test
Blood pressure
রিপোর্ট হাতে নিয়ে ডাক্তার বললেন,
আপনার কিডনির function কিছুটা কম।”
আপনি অবাক।
কিন্তু আমার তো কোনো কষ্ট নেই!”
এটাই Chronic Kidney Disease বা CKD-এর বড় সমস্যা।এটা অনেক সময় ধীরে ধীরে আসে।চুপচাপ আসে।ব্যথা না দিয়েই আসে।আর আমরা যখন বুঝতে পারি, তখন কখনো কখনো রোগ অনেকটা এগিয়ে গেছে।
⸻
কিন্তু প্রশ্ন হলো—কিডনি নষ্ট হয় কেন?
এই গল্পের সবচেয়ে বড় দুই চরিত্র—
ডায়াবেটিস আর উচ্চ রক্তচাপ।ধরুন, আপনার ১০ বছর ধরে ডায়াবেটিস।কিন্তু আপনি ভাবছেন,“Sugar একটু বেশি থাকলেই বা কী?”
অথবা—
Pressure ১৬০/৯৫ থাকলেও আমার তো মাথা ঘোরে না!” কিন্তু কিডনি আপনার মাথার মতো করে ব্যথা দিয়ে প্রতিবাদ করে না।বছরের পর বছর অনিয়ন্ত্রিত blood sugar ও blood pressure কিডনির সূক্ষ্ম
রক্তনালীগুলোর ওপর চাপ ফেলতে থাকে।ধীরে ধীরে ফিল্টারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।প্রথমে সামান্য albumin প্রস্রাবে বের হতে শুরু করতে পারে।আপনি সেটা দেখতে পাবেন না।প্রস্রাবের রংও হয়তো একই থাকবে।পরিমাণও স্বাভাবিক থাকবে।
কিন্তু একটি সাধারণ পরীক্ষা—
Urine ACR
সেই নীরব পরিবর্তনটা ধরে ফেলতে পারে।
⸻
তাই “প্রস্রাব ঠিক আছে” মানেই “কিডনি ঠিক আছে”—এটা নয়।
আরেকটা ভুল ধারণা—
Creatinine একটু বাড়লেই বুঝি ডায়ালাইসিস!”
না।
Creatinine একটা সংখ্যা।কিডনির অবস্থা বুঝতে আমরা eGFR, urine albumin/protein, রোগের কারণ, সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন—সবকিছু একসঙ্গে দেখি।
অনেক CKD রোগী সঠিক চিকিৎসা ও lifestyle modification-এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন stable থাকতে পারেন।অর্থাৎ—
CKD মানেই dialysis নয়।বরং CKD যত তাড়াতাড়ি ধরা পড়ে, কিডনিকে রক্ষা করার সুযোগ তত বেশি।
তাহলে কিডনি বাঁচানোর প্রথম পদক্ষেপ কী?
সবসময় বড় কোনো পরীক্ষা নয়।
অনেক সময় শুরুটা খুব সাধারণ—
🩺 Blood pressure মাপুন।
🩸 Serum creatinine ও eGFR দেখুন।
🧪 Urine ACR/urine protein পরীক্ষা করুন।
🩸 Diabetes থাকলে blood glucose/HbA1c নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
💊 নিজের ইচ্ছায় painkiller বা অন্য ওষুধ দীর্ঘদিন খাবেন না।
🧂 অতিরিক্ত লবণ কমান।
🚭 ধূমপান বন্ধ করুন।
⚖️ ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
যাদের CKD-এর ঝুঁকি আছে, তারা উপসর্গ আসার অপেক্ষা করবেন না।
আজ আপনার কোনো উপসর্গ নেই?
ভালো কথা। ❤️
কিন্তু যদি আপনার ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা, হৃদরোগ, recurrent kidney stone/urinary problem, দীর্ঘদিন painkiller ব্যবহারের ইতিহাস বা পরিবারে কিডনি রোগের ইতিহাস থাকে—
একবার কিডনির screening করিয়ে নিন।
কারণ—
🌿 কিডনি রোগকে চিকিৎসা করার চেয়ে, সময়মতো চিনে ফেলা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।আপনার কিডনি আপনার জন্য প্রতিদিন নীরবে কাজ করে।এবার আপনার পালা—তার একটু খোঁজ নেওয়ার।
ডা: আফরিন আক্তার
কিডনি বিশেষজ্ঞ
ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ কিডনি ডিজিজেজ এন্ড ইউরোলজি,শেরে বাংলা নগর, ঢ়াকা