27/04/2026
ওয়ার্ড রাউন্ডের মাঝামাঝি সময়—চেনা ক্লিনিক্যাল ব্যস্ততার ভেতরেই হঠাৎ চোখে পড়লো এডমিশন বেডে বসে থাকা একটি ছোট্ট মেয়ে, এখনও গায়ে স্কুল ড্রেস, অথচ মুখ ভেজা অশ্রুতে, অস্থির হয়ে আছে।
আমাকেই পাঠানো হলো তার ব্লাড প্রেশার চেক করতে। এগিয়ে গিয়ে দেখি—স্কুল থেকে সোজা হসপিটালে নিয়ে আসা হয়েছে একে, বাচ্চাটা ক্রমাগত কাঁদছে, শরীর ছটফট করছে। ইতিহাস নিতে গিয়ে শুনলাম—প্রায় ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তার কোনো urine output নেই। হাত পা ঠান্ডা। ব্যাপারটা alarming,
আর একটু ঘেটে জানতে পারলাম বাচ্চাটার AGN Suspected, এই রোগীর শরীর anuria স্টেজে পৌঁছানোর আগে যে অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে প্রায় শেষ পর্যায়ে এসে নেমেছে, তা আমার বুঝতে বাকি রইলো না।
কিন্তু বাচ্চার স্বাস্থ্য ভালো, agn er রোগীর থাকে periorbital edema, অনেক সময় অজ্ঞতার কারণে শরীর ফোলাটাকে ও সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ হিসেবেও ধরে নেওয়া হয়....
আমি তখন ভাবছিলাম—যদি BP পাওয়া যায়, তাহলে হয়তো Lasix (Furosemide) দিয়ে ডায়ুরেসিস ইনিশিয়েট করা যাবে। কিন্তু cuff বেঁধে যতবারই মাপতে গেলাম, মনে হলো সংখ্যাগুলো যেন আমার চোখের সামনে ধোঁয়াশা হয়ে যাচ্ছে—কিছুই ঠিকমতো ধরতে পারছিলাম না।
ঠিক তখনই পেশেন্ট রিসিভ করা আপু এসে জানালেন—আগে BP ছিল non-recordable, তাই ইতোমধ্যে ১০০ ml Normal Saline bolus দেওয়া হয়েছে। আবার আপু এসে BP চেক করছিলো। এরমধ্যে শুনলাম পেশেন্ট পার্টির কিছু কথোপকথন।,
বিপি না পাওয়া কিংবা ইউরিন আউটপুট না হওয়া ঘটনা যে কতটা এলার্মিং সেটা আমরা ডাক্তাররা বুঝি, পেশেন্ট তো বুঝতেছেনা, তারা হসপিটালে এসে আপাতত ভর্তি হতে পেরেই বেশ খুশি, শুনলাম প্ল্যান করতেছে ওয়ার্ডের কোন সিটটা দখল করবে, মনে আশা, ভর্তি যেহেতু হতে পেরেছে সুস্থ হয়ে নিশ্চয়ই বাসায় ফিরবে, বাসায় ফিরে যে মেয়েটাকে আরো ভালো করে দেখে শুনে যত্নয়াত্তি করবে সেই প্ল্যানও শুনতে পাচ্ছিলাম।
কিন্তু সেই আশার ভরসাটা খুব দ্রুতই ভেঙে পড়লো।
আবার BP non-recordable।
আরও ১০০ ml Normal Saline bolus start হলো।
তারপর অবস্থা বিবেচনায় শুরু হলো Noradrenaline infusion—একটা মরিয়া প্রচেষ্টা, perfusion ফিরিয়ে আনার জন্য
খারাপ রোগী বলে CA আপু নিজেই সবকিছু তদারকি করছিলেন।
আমাকে বলা হলো জরুরি ভিত্তিতে ICU রেফারেল লিখতে। আমি লিখে ফিরে আসতেই দেখি—ক্লিনিক্যাল দৃশ্যপট বদলে গেছে।
একদিকে রোগীর লোক কাঁদছে, আরেক দিকে ডাক্তার শুরু করেছে CPR, আমাদের শেষ অস্ত্র, শেষ ভরসা।
আমরা পাঁচজন ডাক্তার পালা করে প্রায় ১৫ রাউন্ড cpr দিলাম with AMBU ventilation, আমি স্টেথোস্কোপ বুকে রেখে শুনছিলাম, Heart beat পাই কিনা, একটা আশার স্পন্দন খুঁজছিলাম। abdominal movement, chest rise—respiratory effort-এর সামান্য চিহ্ন। কিন্তু কিছুই যে ছিল না।
পিউপিল চেক করতেই দেখি—fully dilated, non-reactive।
১৫ রাউন্ড CPR শেষে, যখন আমরা ধীরে ধীরে থেমে যাচ্ছি, ডেথ সার্টিফিকেট লেখার প্রস্তুতি নিচ্ছি—
ঠিক তখনই ভেঙে পড়লো গগনবিদারি চিৎকারে
একজন মায়ের আর্তনাদ:
“ও ডাক্তার… আমার মেয়েরে রেখে যেও না…”
বাবা তার ছোট্ট মেয়ের পা ধরে কাঁদছেন
cardiogenic shock তার শেষ কাজটি করে ফেলেছে।আমার নিজেরই তখন মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিল, আর যে মা গর্ভধারণ থেকে শুরু করে সাত বছর ধরে প্রতিটা মুহূর্তে সন্তানকে আগলে রেখেছে, সে কীভাবে এই শূন্যতা মেনে নেবে?
সকালেও যে মেয়েটা স্কুল ড্রেস পরে হাসতে হাসতে বের হয়েছিল—
কিছু ঘণ্টার ব্যবধানে সে হয়ে গেল স্মৃতি।
জীবন কখনো কখনো এতটাই নিষ্ঠুর—
যে চিকিৎসাবিজ্ঞান, যুক্তি, দক্ষতা—সবকিছুই এক মুহূর্তে অসহায় হয়ে পড়ে।
আমরা কত প্ল্যান করি—
কিন্তু জীবন?
একটা নিঃশ্বাসেরও ভরসা নাই।
©