24/09/2025
📍শীতকালে বাতব্যথা (গাউট) বেড়ে যায় কেন? এবং কী করণীয়
অনেকেরই শীতকালে বাতব্যথা বা গাউটের সমস্যা বেড়ে যায়। জয়েন্টগুলো ফুলে যায়, তীব্র ব্যথা হয়, এমনকি হাঁটাচলাতেও কষ্ট হতে পারে। এই সমস্যাটি কেন হয় এবং কীভাবে মোকাবেলা করবেন, আসুন জেনে নেওয়া যাক।
❓গাউট কী এবং কেন হয়?
গাউট এক ধরনের বাতরোগ,যা রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে হয়। ইউরিক অ্যাসিড ক্রিস্টালের মতো জমে জয়েন্টে প্রদাহ সৃষ্টি করে। পুরুষরা সাধারণত ৩০ বছর বয়সের পর এবং মহিলারা মেনোপজের পর এই রোগে বেশি আক্রান্ত হন। অতীতে ধনী বা রাজাদের মধ্যে এই রোগ বেশি দেখা যেত বলে একে 'রাজাদের রোগ' বা disease of Kings বলা হত। ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায় সাধারণত রাজা বা সম্ভ্রান্ত পরিবারে এর রোগ সংক্রমণের মাত্রা তুলনামূলক বেশি ছিল কারণ শুধুমাত্র ধনী শ্রেণীর লোকজনই পিউরিন সমৃদ্ধ খাবার যেমন মাংস এবং মদ গ্ৰহন করার মতো সামর্থ্যবান ছিলেন।
যে খাবারগুলো রক্তে ইউরিক এসিড বৃদ্ধি করে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল মাংস যেমন গরু খাসি বা ভেড়ার মাংস এবং এদের কলিজা মাথা বা organ meat, সয়াবিন বীজ , ডাবলি, আলু, ফুলকপি, বাঁধাকপি, চাইনিজ ক্যাবেজ, মটরশুটি, মুলা, বিট ও মাটির নিচে জন্মানো অন্যান্য সবজি এবং কোমল পানীয় যেমন: কোক ফান্টা।প্রোটিন এনার্জি বার, ক্যাচাপ বা প্রক্রিয়াজাতকৃত খাবার, সামুদ্রিক মাছ এবং ফাস্টফুড খেলেও রক্তে ইউরেটের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে পারে।
❓শীতকালে ব্যথা বেড়ে যায় কেন?
১.রক্তনালির সংকোচন: ঠান্ডায় শরীরের রক্তনালি সংকুচিত হয়, যা জয়েন্টে রক্তপ্রবাহ কমিয়ে দেয়। ফলে ইউরিক অ্যাসিড ক্রিস্টাল জমে।
২.পানিশূন্যতা: শীতকালে আমরা সাধারণত কম পানি পান করি। এতে রক্তে ইউরিক অ্যাসিড ঘনীভূত হয়ে ব্যথার সূত্রপাত করে।
৩.খাদ্যাভ্যাস: শীতকালে বিভিন্ন পার্টি, উৎসবে উচ্চ পিউরিনযুক্ত খাবার (যেমন: কাবাব, রেড মিট) বেশি খাওয়া হয়।
❌কোন খাবারগুলো এড়িয়ে চলবেন? (ইউরিক অ্যাসিড বাড়ায়)
· লাল মাংস: গরু, খাসি, ভেড়ার মাংস এবং এদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ (লিভার, কিডনি, মগজ)।
· কিছু সামুদ্রিক মাছ ও shellfish: যেমন- চিংড়ি , সার্ডিন(খয়রা), ডাল যেমন : ডাবলি, ছোলা, মসুর
· চিনিযুক্ত পানীয়: কোক, ফান্টা, প্যাকেটজাত ফলের রস (বিশেষ করে কর্ন সিরাপযুক্ত)।
· প্রক্রিয়াজাত খাবার: ফাস্ট ফুড, প্রোটিন বার, ক্যাচাপ ইত্যাদি।
[গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন: সবজি নিয়ে সচেতনতা]
ফুলকপি, বাঁধাকপি, মটরশুটি, মুলা, বিট ইত্যাদি সবজিতে মাঝারি মাত্রার পিউরিন থাকে, কিন্তু গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে শাকসবজি থেকে আসা পিউরিন গাউটের ঝুঁকি বাড়ায় না। তবে রোগের তীব্রতা অনুযায়ী এই সকল সবজি নিয়ন্ত্রণ করা উচিত।
⭕️কোন খাবারগুলো খাবেন? (ইউরিক অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে)
· দুধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্য: স্কিম মিল্ক, দই, পনির ইউরিক অ্যাসিড কমাতে খুবই কার্যকর।
· ডিম: প্রোটিনের অত্যন্ত ভালো উৎস।
· প্রচুর তাজা ফল ও শাকসবজি: বিশেষ করে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল (যেমন: পেয়ারা, আমলকী, কমলা)।
· গোটা শস্য: ওটস, ব্রাউন রাইস।
· বাদাম ও বীজ: চিনাবাদাম, আখরোট ইত্যাদি।
· পর্যাপ্ত পানি: দিনে ৩-৪ লিটার পানি পান করুন। এটি গাউট নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে সহজ ও গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
‼️গাউট নিয়ন্ত্রণের জন্য অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ:
১. চিকিৎসকের পরামর্শ নিন: গাউট একটি রোগ। শুধু ডায়েটে এটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সবসময় সম্ভব হয় না। চিকিৎসকের নির্দেশিত ওষুধ (যেমন: Allopurinol) নিয়মিত সেবন করুন। এটি ইউরিক অ্যাসিড স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখে।
২.ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন: ধীরে ধীরে ওজন কমানো ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। কিন্তু নিয়ন্ত্রনহীনভাবে crash diet করবেন না, তাতে ব্যথা বেড়ে যেতে পারে।
৩.নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করুন: এটি জয়েন্টের জড়তা দূর করে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে ।
৪. পর্যাপ্ত ঘুম ব্যথা কমাতে সাহায্য করে ।
⚠️সর্বোপরি মনে রাখবেন:
গাউট নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ওষুধ সেবন, প্রচুর পানি পান, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাস—এই চারটি নিয়ম মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো খাবার তালিকাই এই রোগ নিয়ন্ত্রনে এককভাবে যথেষ্ট নয়। চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যi বস্থা মেনে চললেই এই ব্যথামুক্ত জীবনযাপন সম্ভব।