17/08/2026
একটা মাত্র গুণ থাকলে আল্লাহ ব্যক্তিগতভাবে আপনার সাথে সুসংবাদ পাঠান
বিপদে পড়লে মানুষ কী করে, একটু ভাবুন। প্রতিবেশী এসে সমবেদনা জানায়, বন্ধুরা ফোন করে সান্ত্বনা দেয়, আত্মীয়রা উপদেশ দেয় — ধৈর্য ধরো, সব ঠিক হয়ে যাবে। এই সহানুভূতিগুলো মূল্যবান, কিন্তু এগুলো তো মানুষের পক্ষ থেকে আসে। মানুষ ভুল করতে পারে, ভুলে যেতে পারে, দূরে সরে যেতে পারে।
কিন্তু কুরআনে এমন একটা দলের কথা বলা হয়েছে, যাদের কাছে বিপদের মুহূর্তে সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ পৌঁছায় — মানুষের মধ্যস্থতা ছাড়া, সরাসরি স্রষ্টার কাছ থেকে। এই দলটা কারা, আর কীভাবে এই সুসংবাদ তাদের কাছে পৌঁছায়, আয়াতগুলো একটু গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখুন —
وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ ۞ الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ ۞ أُولَٰئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ ۖ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ
উচ্চারণ: ওয়া লানাবলুয়ান্নাকুম বিশাইয়িম মিনাল খাওফি ওয়াল জু'ই ওয়া নাকসিম মিনাল আমওয়ালি ওয়াল আনফুসি ওয়াস সামারাত, ওয়া বাশশিরিস সাবিরিন। আল্লাজিনা ইজা আসাবাতহুম মুসিবাতুন কালু ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। উলাইকা আলাইহিম সালাওয়াতুম মির রাব্বিহিম ওয়া রাহমাহ, ওয়া উলাইকা হুমুল মুহতাদুন।
অর্থ: আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং সম্পদ, প্রাণ ও ফলফসলের ক্ষতির মাধ্যমে। আর সুসংবাদ দাও ধৈর্যশীলদের — যাদের ওপর কোনো বিপদ আসলে তারা বলে, নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই কাছে ফিরে যাব। তাদের ওপরই তাদের রবের পক্ষ থেকে অনুগ্রহ ও রহমত বর্ষিত হয়, আর তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত। (সূরা বাকারা, আয়াত ১৫৫-১৫৭)
তিনটা আয়াত, তিনটা ধাপ। একটা একটা করে দেখুন।
প্রথম আয়াতে আল্লাহ একটা কঠিন সত্য ঘোষণা করছেন — পরীক্ষা আসবেই। ভয়, ক্ষুধা, সম্পদহানি, প্রিয়জনের মৃত্যু, ফসলের ক্ষতি — এই পাঁচটা ধরনের বিপদের কথা বলা হয়েছে, যেগুলো একজন মানুষের জীবনের প্রায় সব ধরনের কষ্টকে ঢেকে ফেলে। খেয়াল করুন, আল্লাহ বলেননি "যদি পরীক্ষা আসে," বলেছেন "অবশ্যই পরীক্ষা করব।" অর্থাৎ এই দুনিয়ায় বিপদ আসাটা ব্যতিক্রম নয়, নিয়ম। কিন্তু ঠিক এই কঠিন ঘোষণার পরপরই আসে এক আশ্চর্য নির্দেশ — "সুসংবাদ দাও সাবিরিনদের," ধৈর্যশীলদের। কষ্টের ঘোষণার সাথে সাথেই সুসংবাদের প্রতিশ্রুতি — এই সংযুক্তিটাই বলে দেয়, বিপদ আর সুসংবাদ একসাথেই আসে, একটা আরেকটার বিপরীত নয়।
দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ সেই "সাবিরিন" বা ধৈর্যশীলদের চিহ্নিত করে দিলেন — কারা তারা। এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ধৈর্যশীল হওয়ার সংজ্ঞা কী? চোখের পানি না ফেলা? কষ্ট প্রকাশ না করা? না। আল্লাহ বললেন — যাদের ওপর বিপদ এলে তারা বলে "ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন," নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই জন্য, আর নিশ্চয়ই তাঁরই কাছে ফিরে যাব। এই একটা বাক্যের ভেতরে দুইটা স্বীকারোক্তি লুকানো। প্রথম — আমি নিজেও, আমার সম্পদও, আমার প্রিয়জনও — সবকিছুই মূলত আল্লাহর, আমার মালিকানা কখনো সম্পূর্ণ ছিল না। দ্বিতীয় — একদিন সবকিছু তাঁরই কাছে ফিরে যাবে, এটা শুধু সময়ের ব্যাপার। যে অন্তর এই দুইটা সত্য মেনে নিয়ে বিপদের মুখোমুখি হয়, তার কান্না থাকলেও ভাঙন থাকে না।
তৃতীয় আয়াতে আসে সেই বহুল আকাঙ্ক্ষিত সুসংবাদটা নিজেই। "আলাইহিম সালাওয়াতুম মির রাব্বিহিম ওয়া রাহমাহ" — তাদের ওপর তাদের রবের পক্ষ থেকে সালাওয়াত (বিশেষ অনুগ্রহ ও প্রশংসা) এবং রহমত বর্ষিত হয়। আলিমগণ ব্যাখ্যা করেছেন, এখানে "সালাওয়াত" মানে আল্লাহ ফেরেশতাদের মজলিসে তাঁর বান্দার প্রশংসা করেন। ভাবুন এই দৃশ্যটা — একজন মানুষ একা ঘরে বসে বিপদের মুহূর্তে "ইন্না লিল্লাহি" বলছেন, আর ঠিক তখনই ঊর্ধ্বজগতে ফেরেশতাদের সামনে তাঁর নাম উচ্চারিত হচ্ছে প্রশংসার সাথে। এটাই সেই ব্যক্তিগত সুসংবাদ, যা কোনো মানুষ পৌঁছে দিতে পারে না — শুধু আল্লাহই পৌঁছান।
আর আয়াতের শেষ শব্দটাও গভীর — "উলাইকা হুমুল মুহতাদুন," তারাই প্রকৃত হিদায়াতপ্রাপ্ত। ভাবুন, হিদায়াতের সংজ্ঞা এখানে শুধু সঠিক আকিদা বা সঠিক আমল নয় — হিদায়াত মানে বিপদের মুহূর্তে সঠিক প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষমতা। যে মানুষ নামাজ-রোজায় নিয়মিত, কিন্তু বিপদে ভেঙে পড়ে আল্লাহকে দোষারোপ করেন, আর যে মানুষ বিপদেও "ইন্না লিল্লাহি" বলে স্থির থাকেন — দ্বিতীয়জনকেই আল্লাহ বলছেন প্রকৃত হিদায়াতপ্রাপ্ত।
এখন নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকান। শেষ কবে আপনার জীবনে একটা বিপদ এসেছিল? সেই মুহূর্তে আপনার প্রথম প্রতিক্রিয়াটা কী ছিল? হতাশা, রাগ, "কেন আমার সাথেই এমন হলো" — এই প্রশ্ন, নাকি সেই দুইটা স্বীকারোক্তি — আমি আল্লাহরই, আর তাঁরই কাছে ফিরে যাব? এই একটা মুহূর্তের প্রতিক্রিয়াই বলে দেয়, আপনি সেই বিশেষ সুসংবাদপ্রাপ্ত দলে আছেন কি না।
আজকের জীবনে এই শিক্ষা কাজে লাগানোর একটা সহজ অনুশীলন দিই। "ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন" বাক্যটা আজ থেকে শুধু কারো মৃত্যুর সংবাদে বলার জন্য তুলে রাখবেন না। মোবাইল হাত থেকে পড়ে স্ক্রিন ভেঙে গেলে, বাজারে কিছু হারিয়ে গেলে, ছোট কোনো ক্ষতির মুখোমুখি হলে — সেখানেও এই বাক্যটা অভ্যাস করুন। ছোট ছোট বিপদে এই বাক্যের অনুশীলন করলে বড় বিপদের সময় এটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে মুখে আসবে, আর অন্তরে সেই দুইটা স্বীকারোক্তির গভীরতাও ধীরে ধীরে জমতে থাকবে।
সবরের এই প্রকৃত সংজ্ঞা, বিপদের মুহূর্তে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গভীর করার এই কৌশল, আর কীভাবে প্রতিটা কঠিন মুহূর্তকেই আল্লাহর নৈকট্যের একটা সুযোগে রূপান্তরিত করা যায় — এই গভীর বিষয়গুলো নিয়েই শায়খ উসামা আল-শুরাফা তাঁর কালজয়ী বইয়ে অসাধারণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। বইটা পড়ার পর বিপদের প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গিটাই বদলে যাবে, ইনশাআল্লাহ।
বইটির নাম: আখিরাতের ম্যানুয়াল — প্রত্যেক মুসলিমের সুখময় আখিরাতের পথনির্দেশিকা