23/08/2026
POCD কি? কেন এর সম্পর্কে জানতে হবে?
গল্প ১: মিথিলা, বয়স ২২, অনার্স থার্ড ইয়ার।
দেখতে মিষ্টি একটা মেয়ে। আগে রোগা ছিল, এখন হুট করে ওজন বেড়ে ৭২ কেজি। মুখে ব্রণ, ঠোঁটের ওপর হালকা লোম। আমাকে বলছে, "ভাইয়া, আমার পিরিয়ড ৩ মাস পর পর হয়। ২-৩ দিন থেকে বন্ধ। আম্মু বলে বিয়ের পর ঠিক হয়ে যাবে।"
মেয়েটা সারাদিন রুমে থাকে, রাত ২টা পর্যন্ত ফোন চালায়, সকালে উঠে না খেয়েই ক্লাসে দৌড়। মন খারাপ, সারাক্ষণ কান্না পায়, কাউকে বুঝাতে পারে না।
গল্প ২: নুসরাত আপু, বয়স ২৮, স্কুল শিক্ষিকা। বিয়ে হয়েছে ২ বছর।
বাচ্চা নেওয়ার চেষ্টা করছেন, হচ্ছে না। ডাক্তার বলছে ওজন কমাতে। আপু বলছে, "ভাই, আমি তো বেশি খাই না। হাঁটিও তো। তাহলে কেন আমার বাচ্চা হচ্ছে না? আমার কি মা হওয়া হবে না?"
আপুর পিরিয়ডের আগে মাথা প্রচন্ড ব্যথা করে, মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকে। আল্ট্রাসনোতে ডাক্তার বলেছে ডিম্বাশয়ে ছোট ছোট অনেকগুলো সিস্ট।
দুইটা মানুষ, দুইটা বয়স, দুইটা আলাদা জীবন...
কিন্তু দায়ী একজনই... তার নাম PCOD।
অনেকে এটাকে PCOS-ও বলে। দুইটাই প্রায় একই জিনিস।
চলেন এবার একদম সহজ ভাষায় বুঝি, এই জিনিসটা আসলে কী?
মেয়েদের তলপেটে দুইটা ডিমের থলি থাকে, নাম Ovary। প্রতি মাসে সেখান থেকে একটা ডিম বড় হয়ে বের হয়। এটাই পিরিয়ডের নিয়ম।
PCOD হলে কী হয় জানেন? ডিমটা ঠিকমতো বড় হতে পারে না। ভেতরে ছোট ছোট অনেকগুলো অর্ধেক বড় হওয়া ডিম জমে থাকে, বেলুনের মতো। এগুলোকেই আমরা সিস্ট বলি।
আর শরীরে Insulin নামের একটা হরমোন আছে, যেটা চিনি কন্ট্রোল করে। PCOD-তে শরীর এই Insulin-কে ঠিকমতো চিনতে পারে না। তখন শরীর ভাবে, "আরো Insulin লাগবে"। বেশি Insulin গিয়ে মেয়েদের শরীরে ছেলেদের হরমোন (Testosterone) বাড়িয়ে দেয়। আর তখনই সব উল্টাপাল্টা শুরু হয়।
তাহলে কেন হয় এই রোগ? সবচেয়ে বড় ৪টা কারণ হল :
১. ওজন আর বসে থাকা জীবন: মিথিলার মতো সারাদিন বসে থাকা, কোনো হাঁটাচলা নাই, বাইরের তেলে ভাজা খাবার, মিষ্টি, কোল্ড ড্রিংকস। পেটের চর্বি Insulin-কে নষ্ট করে দেয়।
২. ঘুম আর স্ট্রেস: রাত ১-২টা পর্যন্ত জেগে থাকা। ঘুম কম হলে হরমোন সব এলোমেলো হয়ে যায়। সাথে পড়াশোনা, সংসার, বাচ্চা না হওয়ার টেনশন। স্ট্রেস হলো PCOD-র পেট্রোল।
৩. বংশগত: আপনার মা, খালা, বড় বোনের থাকলে আপনার হওয়ার চান্স অনেক বেশি। এটা জিনের খেলা।
৪. ভুল ডায়েট: সকালে না খাওয়া, দুপুরে বিরিয়ানি, রাতে না খেয়ে ঘুমানো। অথবা সারাদিন শুধু ভাত আর ভাত। শরীরে ফাইবার, প্রোটিন নাই বললেই চলে।
যে লক্ষণগুলোকে আমরা "এমনি" বলে উড়িয়ে দেই, সেগুলোই PCOD-র সিগন্যাল:
√ পিরিয়ড ৩৫ দিনের বেশি পর পর হওয়া, বা ২ মাস-৩ মাস বন্ধ থাকা।
√ পিরিয়ড ২ দিন হয়েই বন্ধ, বা অনেক বেশি দিন ধরে চলা।
√ মুখে, বুকে, পিঠে জেদি ব্রণ যেটা কিছুতেই যায় না।
√ ঠোঁটের ওপর, থুতনিতে, বুকে লোম গজানো।
√ ঘাড়, গলার ভাঁজ কালো হয়ে যাওয়া।
√ মাথার সামনের দিকের চুল পাতলা হয়ে যাওয়া
√ কোনো কারণ ছাড়াই ওজন বাড়া, বিশেষ করে তলপেটে।
√ সারাক্ষণ মন খারাপ, রাগ, কান্না পাওয়া, ঘুম না হওয়া।
PCOD কোনো ক্যান্সার না, এটা মরণ রোগও না। এটা একটা লাইফস্টাইল জনিত হরমোনের সমস্যা। WHO, CDC সবাই একটা কথাই বলে - সঠিক নিয়ম মানলে এটাকে ৮০% কন্ট্রোলে আনা যায়। অনেক আপুর বাচ্চাও হয়েছে, ওজনও কমেছে, পিরিয়ডও রেগুলার হয়েছে।
আপনি আজ থেকে ৩টা কাজ করেন :
১. হাঁটাকে ওষুধ বানান: জিমে যাওয়া লাগবে না। রোজ ৪০ মিনিট জোরে জোরে হাঁটুন। সপ্তাহে ৫ দিন। এই ৪০ মিনিট Insulin-কে ঠিক করার সবচেয়ে বড় ওষুধ। Metformin-ও যা করে, হাঁটা তার চেয়েও বেশি করে।
২. প্লেটটাকে ভাগ করেন: ভাত অর্ধেক কমিয়ে দেন। প্লেটের অর্ধেক শাক-সবজি, এক ভাগ ডিম/মাছ/মুরগি/ডাল, আর এক ভাগ ভাত/রুটি। কোল্ড ড্রিংকস, অতিরিক্ত মিষ্টি, প্যাকেটের জুস, ফাস্টফুড একদম বন্ধ। রাত ১১টার মধ্যে ঘুম।
৩. ডাক্তারকে বন্ধু বানান: নিজে নিজে YouTube দেখে হরমোনের ওষুধ খাবেন না। একজন ভালো গাইনী ডাক্তারের কাছে যান।
একটা USG আর কিছু হরমোন টেস্ট (যেমন LH, FSH, Testosterone, TSH, Prolactin) করলেই অনেকটা ক্লিয়ার হয়ে যাবেন। উনি আপনাকে সঠিক একটি গাইডলাইন দেবেন।
বিশ্বাস করেন ভাই, আমি বহু মেয়েকে দেখেছি শুধু ৫-৭ কেজি ওজন কমিয়ে আর ঘুম ঠিক করেই জীবনটা পাল্টে ফেলেছে।
এই লেখাটা আপনি শেয়ার করলে আপনার বোন, আপনার মেয়ে, আপনার স্ত্রী, আপনার ছাত্রী - কারো না কারো কাজে লাগবেই।
একটা শেয়ারে যদি একটা মেয়েও সচেতন হয়, এর চেয়ে বড় সওয়াব আর কী হতে পারে?
আমাদের ওয়েবসাইট ভিজিট করুন :
www.patientpointbd24.com