12/07/2026
বিয়ের প্রথম বছরের কথা মনে পড়ে খুব। তখন আমরা দুজন ছিলাম যেন দুটো বাচ্চা, যারা সংসার নামের নতুন খেলাঘর সাজাচ্ছিলাম। প্রথম বৃষ্টির দিনে ছাদে উঠে ভিজেছিলাম দুজনে, সাবিহা হাসতে হাসতে বলেছিল, "তুমি একদম পাগল একটা মানুষ।" আমি তার ভেজা চুল থেকে টুপটুপ করে পানি পড়া দেখছিলাম, আর মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তটা যদি থমকে যেত।
রাতগুলো ছিল গল্পে ভরা। ও আমার বুকে মাথা রেখে শোনাত তার ছোটবেলার গল্প, আমি শোনাতাম আমার। হাসতে হাসতে কখন যে রাত গভীর হয়ে যেত, টেরই পেতাম না। তখন মনে হত, আমরা বুঝি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী দম্পতি।
কিন্তু সময়ের সাথে সাথে একটা নীরবতা যেন আমাদের মাঝে ঘর বাঁধতে শুরু করল। প্রতিটি ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের আগে বুকের ভেতর একটা চাপা ভয় কাজ করত, "আজও কি হতাশ করব?" আর যা ভয় পেতাম, ঠিক তাই হত। সময়টা এত দ্রুত ফুরিয়ে যেত যে নিজের কাছেই নিজেকে অচেনা লাগত।
সাবিহা কিছু বলত না। কোনো অভিযোগ না, কোনো প্রশ্ন না। শুধু চুপ করে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ত। আর সেই নীরবতাটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিত। কথায় থাকলে অন্তত জবাব দেওয়া যেত, কিন্তু নীরবতার সাথে কীভাবে লড়াই করব, জানা ছিল না আমার।
ধীরে ধীরে আমি নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করলাম। অফিস থেকে দেরি করে ফিরতাম, ফোনে ডুবে থাকতাম, যেন ঘনিষ্ঠতার মুহূর্তটাই এড়িয়ে যেতে পারি। বন্ধুদের আড্ডায় হাসিঠাট্টার মাঝেও এই কথাটা কাউকে বলতে পারিনি কখনো। কীভাবে বলব, লজ্জাই তো আমাকে গিলে খেত।
একদিন রাতে সাবিহা আমার হাত ধরে বলল, "তুমি জানো না, প্রতিবার তোমার নীরব হয়ে যাওয়াটা আমাকে কতটা ভেঙে দিত। আমি ভাবতাম, তুমি বুঝি আমাকে আর আগের মতো ভালোবাসো না।" সেই কথাটা শুনে বুকের ভেতর যেন কিছু একটা ভেঙে পড়ল। আমি বুঝলাম, আমার নীরবতা শুধু আমাকে না, ওকেও কষ্ট দিচ্ছিল প্রতিনিয়ত।
সেই রাতেই ঠিক করলাম, আর চুপ করে থাকব না। ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সাহস হচ্ছিল না, অনলাইনে যা পেতাম তার বেশিরভাগই বিভ্রান্তিকর। এমন সময় একদিন এক পুরনো বন্ধুর সাথে কথায় কথায় জানতে পারলাম একটা ইবুকের কথা, নাম "আমি যেভাবে মুক্তি পেলাম"। প্রথমে খুব একটা আশা রাখিনি, ভেবেছিলাম হয়তো আর দশটা মিথ্যা প্রতিশ্রুতির মতোই হবে। কিন্তু কী মনে করে যেন পড়া শুরু করলাম।
প্রতিটি পাতায় নিজের কথাগুলোই যেন লেখা ছিল। সহজ ভাষায়, ধাপে ধাপে বোঝানো, লজ্জা ছাড়াই। রাতের পর রাত অনুশীলন করলাম নিজের মতো করে, ধৈর্য নিয়ে, সময় নিয়ে। প্রথম দিকে খুব একটা পার্থক্য বুঝিনি, কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর নিজের ভেতরেই একটা পরিবর্তন টের পেলাম। সময়ের উপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাচ্ছিলাম আস্তে আস্তে, আর সেই সাথে ফিরে পাচ্ছিলাম নিজের আত্মবিশ্বাস।
একদিন রাতে সাবিহা হঠাৎ আমার গালে হাত রেখে বলল, "তুমি কি বদলে গেছ কিছুটা? তোমাকে অনেকদিন পর আগের মতো লাগছে।" আমি হেসে শুধু ওকে বুকে টেনে নিলাম। বলার দরকার হয়নি কিছু, ও নিজেই বুঝে নিয়েছিল।
আজ আমরা দুজন আবার সেই প্রথম বছরের মতো হাসি, গল্প করি, রাত জেগে কথা বলি। ছাদে বৃষ্টিতে ভেজার সেই অভ্যাসটাও ফিরে এসেছে। মাঝেমধ্যে সাবিহা আমার কানে ফিসফিস করে বলে, "তোমাকে যেন আবার নতুন করে চিনলাম।" আর আমি জানি, এই সুখটা কোনো যাদু নয়, এটা একটা সিদ্ধান্তের ফল, নিজেকে বদলানোর একটা যাত্রার ফল।
যে নীরবতা একদিন আমাদের মাঝে দেয়াল হয়ে উঠেছিল, আজ সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় গল্পের অংশ। আর আমি বিশ্বাস করি, প্রতিটি সম্পর্কেই এমন একটা মুক্তির পথ থাকে, শুধু খুঁজে নেওয়ার সাহসটুকু দরকার।
নার্গিস কেয়ার বাংলাদেশ
নিয়ন্ত্রণই আসল পারফর্মেন্স