01/08/2026
এই লেখাটা স্কিপ করার আগে ৩০ সেকেন্ড সময় দেন ভাই।
কালকে সকালে হয়তো এই লেখাটাই আপনার আব্বুর পা টা বাঁচিয়ে দেবে।
আমার চেম্বারে বসে আমি একটা জিনিস প্রায়ই দেখি।
মানুষ পায়ে ব্যথা নিয়ে আসে, আর প্রথমেই বলে - "ভাই, বাতের ব্যথা মনে হয়। বয়স তো হইছে।"
কিন্তু সব পায়ে ব্যথা বাত না।
গল্প ১: রহমান চাচা, ৫৮ বছর
ময়মনসিংহের রহমান চাচা। রিটায়ার্ড স্কুল শিক্ষক। সারাজীবন সৎ মানুষ ছিলেন।
শেষ ৬ মাস ধরে একটা অদ্ভুত জিনিস খেয়াল করছেন। বাজার করতে গেলে ১০ মিনিট হাঁটলেই ডান পায়ের মাংসপেশি শক্ত হয়ে আসে। কামড় দিয়ে ধরে। মনে হয় কেউ ভেতর থেকে টেনে ধরছে।
দাঁড়িয়ে একটু জিরিয়ে নিলে আবার ঠিক হয়ে যায়। আবার হাঁটলে আবার ব্যথা।
তিনি ভাবলেন, "বাত।" পাড়ার ফার্মেসি থেকে ব্যথার মলম, গরম সেঁক, ক্যালসিয়াম নেন।
কিন্তু ব্যথা কমে না, বরং দিন দিন হাঁটার রাস্তাটা ছোট হয়ে আসছে। আগে ১ কিলো হাঁটতে পারতেন, এখন ১০০ মিটার হাঁটলেই বসে পড়তে হয়।
চাচীর একটা কথা আমাকে কাঁদিয়ে দিয়েছিল। চাচী বললো, "বাবা, মানুষটা এখন মসজিদেও যেতে চায় না। লজ্জায়। হাঁটতে হাঁটতে রাস্তায় বসে পড়ে মানুষ কী ভাববে..."
গল্প ২: সজল, ৪২ বছর
সজল ভাই, গাজীপুরে গার্মেন্টসে চাকরি করেন। বয়স মাত্র ৪২, কিন্তু দিনে ১৫-২০টা সিগারেট খান ২০ বছর ধরে।
সাথে ডায়াবেটিস আছে, ওষুধ খান মাঝে মাঝে, মন চাইলে।
তার সমস্যা অন্য জায়গায়। পায়ের আঙুলের একটা ছোট ঘা। একটা ফোস্কা থেকে। ২ মাস ধরে শুকাচ্ছে না। কালো হয়ে আসছে চারপাশ।
গ্রামের ডাক্তার বলছে, "ইনফেকশন।" অ্যান্টিবায়োটিক খাচ্ছে।
কিন্তু আমি তার পা টা ধরে দেখি, পা ঠান্ডা। অন্য পায়ের চেয়ে বেশি ঠান্ডা। পায়ের পাতার উপর যে নার্ভের লাফানি থাকে (Pulse), সেটা পাচ্ছি না।
দুইটা মানুষ, দুইটা বয়স, দুইটা জীবন... কিন্তু ভিলেন একজনই...
তার নাম Peripheral Artery Disease - PAD
আপনারা হার্টের ব্লক চেনেন, ব্রেইনের স্ট্রোক চেনেন। PAD হলো ঠিক একই জিনিস, কিন্তু পায়ে।
একদম সহজ করে বুঝাই।
আমাদের হার্ট থেকে পায়ে রক্ত যাওয়ার জন্য পাইপ আছে, নাম Artery বা রক্তনালী। যখন আমরা ধূমপান করি, ডায়াবেটিস, প্রেশার, কোলেস্টেরলকে পাত্তা দেই না, তখন এই পাইপের ভেতরে ময়লা জমে, চর্বি জমে। পাইপটা আস্তে আস্তে চিকন হয়ে যায়।
তখন কী হয়? আপনি যখন বসে থাকেন, অল্প রক্তে কাজ চলে যায়। কিন্তু যখন হাঁটেন, পায়ের মাংসপেশির বেশি রক্ত লাগে। চিকন পাইপ দিয়ে সেই বেশি রক্তটা আর যেতে পারে না। তখন মাংসপেশি চিৎকার করে ওঠে - "আমার রক্ত লাগবে!" আর সেই চিৎকারটাই হলো ব্যথা।
ডাক্তারি ভাষায় এটাকে বলে Claudication। আর এই রোগটাই হলো PAD।
এটা কিন্তু শুধু পায়ের রোগ না ভাই। যার পায়ের পাইপে ব্লক, তার হার্ট আর ব্রেইনের পাইপেও ব্লক থাকার চান্স অনেক বেশি। এটা হার্ট অ্যাটাক আর স্ট্রোকের আগাম সতর্কবার্তা।
তাহলে এই ভিলেন কেন আসে? সবচেয়ে বড় ৪টা কারণ -
১. সিগারেট / বিড়ি / জর্দা: এক নাম্বার ভিলেন। আপনি একটা টান দিচ্ছেন, আর ভেতরে আপনার রক্তনালীটা একটু একটু করে শক্ত আর চিকন হচ্ছে। আমার দেখা ১০ জন PAD রোগীর ৮ জনই ধূমপায়ী।
২. অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস (HbA1c বেশি): রক্তে চিনি বেশি মানে রক্তটা আঠা আঠা। এই আঠা রক্তনালীর ভেতরের দেয়ালটাকে নষ্ট করে দেয়। সজল ভাইয়ের মতো "ওষুধ মাঝে মাঝে খাই" - এই মানুষগুলোর পায়ের ঘা কখনো শুকায় না।
৩. হাই প্রেশার আর LDL কোলেস্টেরল বেশি: প্রেশার বেশি মানে পাইপের ভেতরে পানির ফোর্স বেশি, দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর LDL হলো খারাপ চর্বি, যেটা সরাসরি পাইপের ভেতরে ময়লা হিসেবে জমে। খাসির চর্বি, ভাজাপোড়া, ফাস্টফুড - এগুলো রোজ খেলে এই ময়লা জমতেই থাকবে।
৪. বয়স ৫০ এর বেশি আর বসে থাকা জীবন: বয়সের সাথে সাথে পাইপে মরিচা ধরবেই। তার উপর যদি সারাদিন বসে থাকেন, হাঁটাচলা না করেন, তাহলে রক্ত চলাচল আরো কমে যায়।
যে লক্ষণগুলোকে আমরা "বাত" বলে ভুল করি, খবরদার অবহেলা করবেন না -
১. হাঁটলে পায়ের ডিমে বা থাইতে কামড়ানো ব্যথা, দাঁড়ালে ২-৫ মিনিটে কমে যায়। এটা PAD এর একদম সিগনেচার লক্ষণ।
২. এক পা আরেক পায়ের চেয়ে বেশি ঠান্ডা লাগা।
৩. পায়ের লোম পড়ে যাওয়া, পায়ের নখ মোটা হয়ে ভেঙে যাওয়া।
৪. পায়ের কোনো ঘা, ফোস্কা ২-৩ সপ্তাহেও না শুকানো।
৫. রাতে শুয়ে থাকলে পায়ের পাতায় জ্বালাপোড়া করা, আর পা ঝুলিয়ে দিলে আরাম লাগা।
এই ৫টার একটাও থাকলে এটাকে বাত বলে বসে থাকবেন না।
ভয় পাইয়েন না ভাই... সুখবর হচ্ছে...
PAD মানেই পা কেটে ফেলতে হবে না। শুরুতেই ধরতে পারলে ওষুধ, নিয়মকানুন আর হাঁটার মাধ্যমেই এটাকে আটকে দেওয়া যায়। CDC আর WHO বলছে, সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে ৮০% ক্ষেত্রেই বড় অপারেশন এড়ানো সম্ভব।
আজ থেকে ৩টা কাজ করেন, একদম বাস্তবসম্মত -
১. ৫ মিনিটের হাঁটার পরীক্ষা: কাল সকালেই বাবা বা মাকে নিয়ে একটু হাঁটতে বের হন। খেয়াল করেন, নির্দিষ্ট দূরত্ব হাঁটার পর কি পায়ে ব্যথা হয় যা দাঁড়ালে কমে? হলে লজ্জা না পেয়ে একজন ডাক্তারকে বলেন। ডাক্তার একটা সহজ পরীক্ষা দেবে - ABI Test। হাত আর পায়ের প্রেশার মেপে বলে দেবে ব্লক আছে কিনা। কোনো ব্যথা নেই, ১০ মিনিটের পরীক্ষা।
২. পায়ের যত্ন আর ধূমপানকে না: আজ থেকে বিড়ি-সিগারেটটাকে "না" বলুন। এটা আপনার পায়ের রক্তনালীর জন্য বিষ। আর রোজ রাতে ২ মিনিট সময় নিয়ে পায়ের পাতা, আঙুলের ফাঁকা দেখুন। কোনো কাটা, ঘা, কালো দাগ আছে কিনা। ডায়াবেটিস থাকলে খালি পায়ে হাঁটবেন না।
৩. রিপোর্টগুলোকে কন্ট্রোলে আনুন: আপনার HbA1c (৩ মাসের ডায়াবেটিসের গড়), Blood Pressure, LDL Cholesterol - এই ৩টা সংখ্যাকে টার্গেটে আনুন। ডাক্তারের পরামর্শে নিয়মিত ওষুধ খান, হাঁটুন, আর ভাজাপোড়া কমান। এই ৩টা কন্ট্রোলে থাকলে পায়ের পাইপ পরিষ্কার থাকবে, হার্টও ভালো থাকবে।
আমি অনেক বাবাকে দেখেছি যারা শেষ সময়ে এসে বলে, "আগে জানলে..."
আমি চাই না আপনি সেই দলে থাকেন।
এই পোস্টটা সেভ করে রাখেন। আপনার পরিবারের গ্রুপে শেয়ার করে দেন। হয়তো আপনার একটা শেয়ারে আপনার কোনো আত্মীয় বুঝতে পারবে তার বাতের ব্যথাটা আসলে বাত না।
বুকে হাত দিয়ে বলেন তো...
আপনার বাবা বা মা কি হাঁটতে গেলে পায়ে ব্যথার জন্য মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে জিরিয়ে নেয়? আর আপনারা ভাবছেন এটা বয়সের জন্য স্বাভাবিক?
লাইক কমেন্ট ও শেয়ার করুন।
#পায়ে_ব্যথা #হাঁটলে_পায়ে_ব্যথা #হেলথহারবালবিডি #লাইফস্টাইল #হেলদিলাইফ