22/06/2026
সমরেশের গল্প: যে প্রশ্নটি কানে বাজে
পঁচিশ বছর ধরে এই 'জনতা ক্লিনিক'টাই ওর জীবন।
সাইনবোর্ডটায় এককালে বড় অক্ষরে লেখা ছিল 'ডা: সমরেশ (ডিএমএফ)', নিচে যুক্ত করে 'স্যাকমো' লিখেছিল, কিন্তু এবার ডা: কেটে লিখেছিল শুধু 'ডিএমএফ'। এখন সাইনবোর্ডটা এমনিতেই বিবর্ণ, লেখা ভালো বোঝা যায় না।
কিন্তু গতকাল নিজের সদ্য এমবিবিএস চান্স পাওয়া ছেলেটা এমন কি বললো , ওর কথাটা এখনো কানে বাজছে—
"বাবা তুমি কি আসল ডাক্তার, নাকি অন্য কিছু?"
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই ক্লান্ত সমরেশ।
নিজের কাছে, সমাজের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে—কেউ জানে না ও আসলে কে।
সেই যে বাবার কথা—"ডাক্তারি পড়বি, গরিবের সেবা করবি"—সেই স্বপ্নটাই ওকে টেনে এনেছিল কুষ্টিয়া ম্যাটসে (MATS)।
৪ বছর ধরে ও শিখেছিল সাধারন রোগ ধরতে, ওষুধ লিখতে, জরুরি সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে।
তারপর সোজা চলে এসেছিল গ্রামে।
চিকিৎসক নাকি শুধুই সহকারী, সেটা ভাবার সময় তখন ছিল না। কারণ গ্রামে তখন ডাক্তার বলতে কেউ ছিল না; ছিল শুধু রোগ আর অবহেলা।
পঁচিশ বছর ধরে একই কাজ করে আসছে সমরেশ—সর্দি-জ্বর থেকে শুরু করে ডায়াবেটিসের ফলোআপ, গর্ভবতী মায়ের চেকআপ, দুর্ঘটনার প্রাথমিক চিকিৎসা।
জটিল রোগী পেলেই হাত তুলে শহরের এমবিবিএস ডাক্তারের কাছে পাঠায়।
ও কখনো ভুল রোগ ধরেনি, কখনো বাড়তি দাবি করেনি।
কিন্তু তবু কোথাও যেন একটি তীব্র অস্তিত্বহীনতা ওকে তাড়া করে বেড়ায়।
সরকারি ফাইলে ওর নাম আবারও 'মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট' তকমা পাচ্ছে, রোগীর মুখে 'ডাক্তার সাহেব', আর আইনি কাঠামোর কাছে ও কিছুই না।
সেদিন সন্ধ্যায় ছোট নদীর পাড়ে বসে সমরেশ ভাবছিল—এই পঁচিশ বছরে কি কিছু বদলেছে?
হ্যাঁ, বদলেছে।
ওর ক্লিনিক এখন মানুষের ভরসার জায়গা। মানুষ আসে, কারণ তারা জানে—এখানে ফাঁকি দেওয়া হবে না।
প্রেসক্রিপশনে অহেতুক দামি ওষুধ লেখা হবে না।
দরকার হলে সমরেশ সোজা বলে দেবে, "এটা আমার কাজ না, তোমায় বড় ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।"
মানুষ এই সততা বোঝে। বিশ্বাস করে।
এই বিশ্বাসটাই তো ওর আসল পরিচয়।
হঠাৎ সমরেশের মনে হলো, সমস্যাটা আসলে নিজের নামে নয়। সমস্যাটা নিজেকে আমরা কীভাবে দেখছি, সেটায়।
ও তো এমবিবিএস ডাক্তার নয়—সেটা স্বীকার করতেই হবে। কিন্তু ও নার্সও নয়, অ্যাসিস্ট্যান্টও নয়।
ও রোগ দেখে, সিদ্ধান্ত নেয়, দায়িত্ব নেয়—তাতে সীমাবদ্ধতা আছে বটে, কিন্তু তা ক্লিনিক্যাল।
অথচ সমাজ ওকে চেনে না, কারণ ওর পেশার নামটা "ডিপ্লোমা চিকিৎসক" হিসেবেও কেউ আজ পর্যন্ত ঠিক করে দেয়নি।
সমরেশের মনে পড়ল, সম্প্রতি ওর ছেলে যুক্তরাষ্ট্রের একটা মেডিকেল আর্টিকেল দেখিয়েছিল।
সেখানে এদেরই মতো পেশাকে বলে 'ফিজিশিয়ান অ্যাসোসিয়েট'—সংক্ষেপে PA।
চিকিৎসকের যোগ্য সঙ্গী। আইন আছে, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আছে, উচ্চশিক্ষার রাস্তা আছে।
আর সবচেয়ে বড় কথা, সেখানকার রোগীরা জানে PA মানে কী।
তাহলে এখানে কেন হবে না? হবেই।
শুধু দরকার নিজেদের জায়গাটা স্পষ্ট করা।
ডাক্তারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো নয়, বরং তার পাশে দাঁড়ানো।
নিজেকে বলা—আমি চিকিৎসকের সহযোগী, তবে আমারও একটি নিজস্ব ক্লিনিক্যাল সত্তা থাকবে।
ঠিক যেমন ব্যাটম্যান আর রবিন!
আমরা প্রাথমিক সেবার মূল স্তম্ভ। রোগী আমাদের কাজ দেখেই আমাদের চিনবে নতুন করে।
একটি বিষয় আমাদের স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে—কোনো পেশা শুধুমাত্র একটি নামের উপর টিকে থাকে না; টিকে থাকে তার জ্ঞান, দক্ষতা, দায়িত্ব এবং সমাজের প্রয়োজনীয়তার উপর।
DMF ধারার এই পেশাটি কোনো দুর্ঘটনাবশত সৃষ্টি হয়নি।
স্বাধীনতার পর গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার সংকট মোকাবিলার জন্য রাষ্ট্র পরিকল্পিতভাবেই একটি মধ্যবর্তী স্তরের ক্লিনিক্যাল জনবল গড়ে তুলেছিল।
সেই বাস্তবতা আজও পরিবর্তিত হয়নি। বরং জনসংখ্যা বৃদ্ধি, চিকিৎসকের অসম বণ্টন এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ক্রমবর্ধমান চাহিদা এই প্রয়োজনকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
আজ আমাদের সামনে দুটি সুনির্দিষ্ট পথ খোলা আছে:
· প্রথম পথ: অতীতের পরিচয়গত বিতর্কে আটকে থেকে অবহেলায় ধীরে ধীরে প্রান্তিক ও বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া।
· দ্বিতীয় পথ: বিশ্বস্বীকৃত Mid-Level Clinician মডেলের সঙ্গে নিজেদের পুনঃসংজ্ঞায়িত করা, উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে দক্ষতাকে আধুনিক করা এবং একটি সুস্পষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করা।
আমাদের অবশ্যই দ্বিতীয় পথটি বেছে নেওয়া উচিত।
আমরা কারও বিকল্প নই, কারও প্রতিদ্বন্দ্বীও নই।
আমরা স্বাস্থ্যসেবা দলের সেই চালিকাশক্তি, যার কাজ হলো প্রাথমিক পর্যায়ে রোগীকে মানসম্মত সেবা দেওয়া, রোগ শনাক্ত করা, প্রটোকল অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া এবং জটিল রোগীকে যথাসময়ে সঠিক চিকিৎসকের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
• কেন 'Physician Associate' (PA) পরিচয়?
"PA" নামটি কোনো নতুন বা কল্পিত পরিচয় নয়। এটি বর্তমানে বিশ্বের বহু উন্নত দেশে ব্যবহৃত একটি অত্যন্ত সফল ও স্বীকৃত ক্লিনিক্যাল পেশাগত পরিচয়।
আমাদের জন্য PA পরিচয়টি কেন এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় কৌশলগত প্রয়োজন, তার ৫টি মূল কারণ:
১. এটি আমাদের কাজের প্রকৃত ক্লিনিক্যাল স্বরূপ:
আমরা নার্স নই, কারণ আমাদের প্রশিক্ষণ মূলত ক্লিনিক্যাল মেডিসিনভিত্তিক। আবার আমরা শুধুমাত্র মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টও নই, কারণ বাস্তবে আমরা রোগী মূল্যায়ন, রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা প্রদান এবং রেফারেলের কাজ করি। PA পরিচয়টি এই ক্লিনিক্যাল বাস্তবতাকেই সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে সবচেয়ে নিখুঁতভাবে প্রকাশ করে।
২. এটি আন্তর্জাতিকভাবে বোধগম্য ও স্বীকৃত:
"DMF" বা "SACMO" নামগুলো বাংলাদেশের বাইরে প্রায় কেউ বোঝে না। কিন্তু "Physician Associate" বা "PA" শুনলেই বিশ্বের যেকোনো দেশের স্বাস্থ্যনীতি বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং আন্তর্জাতিক নিয়োগদাতারা এক মুহূর্তে বুঝে যান এই পেশার প্রকৃতি ও গভীরতা কী।
৩. এটি উচ্চশিক্ষা ও ক্যারিয়ারের বন্ধ দুয়ার খুলে দেয়:
বর্তমানে DMF-এর সবচেয়ে বড় সংকট হলো একাডেমিক অগ্রগতির সীমাবদ্ধতা। PA পরিচয়টি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে আমাদের জন্য উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক পথ তৈরি করা সহজ হবে:
· BSc in Physician Associate Studies / Clinical Practice
· MSc in Physician Associate Studies
৪. সংঘাত নয়, সহযোগিতার বার্তা দেয়:
"ডাক্তার" পরিচয়কে কেন্দ্র করে যে পেশাগত সংঘাত তৈরি হয়, PA পরিচয় তা চিরতরে কমিয়ে আনে। এটি সরাসরি নীতিনির্ধারক ও চিকিৎসকদের বার্তা দেয়: "আমি চিকিৎসকের বিকল্প হতে আসিনি; আমি স্বাস্থ্যসেবা দলের একজন ক্লিনিক্যাল সদস্য হতে এসেছি।"
ফলে চিকিৎসক সমাজ এবং মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংলাপের ক্ষেত্রটি অনেক সহজ ও মসৃণ হয়।
৫. এটি ভবিষ্যতের 'Team-Based Care' স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল চাবিকাঠি:
বিশ্বের আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা ক্রমেই টিম-বেসড কেয়ারের দিকে যাচ্ছে—যেখানে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, PA, নার্স এবং ফার্মাসিস্ট একসঙ্গে মিলে রোগীর সেবা নিশ্চিত করেন।
এই আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় PA একটি ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক পেশা; অন্যদিকে "ডিপ্লোমা ডাক্তার" বা "মেডিকেল সহকারী" পরিচয়ের আন্তর্জাতিক কোনো আইনি কাঠামো নেই।
• PA নামের ভবিষ্যৎ: একটি 'বিকাশযোগ্য পরিচয়'
"DMF" বা "SACMO" মূলত একটি কোর্সের নাম কিংবা একটি পদবি। কিন্তু "Physician Associate" একটি চিরস্থায়ী পেশার নাম।
কোর্স বদলাতে পারে, শিক্ষার মেয়াদ ৪ বছর থেকে ৫ বছর হতে পারে, উচ্চতর ডিগ্রি যুক্ত হতে পারে—কিন্তু পেশাগত পরিচয়টি কখনো হারিয়ে যায় না।
আজ ডিপ্লোমা, কাল BSc, পরশু MSc—সবকিছুকেই এই একই পেশাগত ছাতার নিচে আনা সম্ভব।
"PA কোনো নাম পরিবর্তনের সাধারণ প্রস্তাব নয়; এটি আমাদের পেশাগত রূপান্তরের (Professional Transformation) একটি দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ।"
• চিকিৎসকদের সাথে সম্পর্ক: অংশীদারিত্ব, প্রতিযোগিতা নয়
একজন দক্ষ Physician Associate যত বেশি কাজ করবেন, একজন স্পেশালিস্ট চিকিৎসক তত বেশি সময় জটিল রোগীর জন্য এবং গবেষণায় ব্যয় করতে পারবেন।
এতে চিকিৎসকের মর্যাদা বা প্র্যাকটিস কমে না; বরং পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি পায়।
সম্পর্কটি দ্বন্দ্বের নয়, সম্পর্কটি হবে 'শেরলক ও ওয়াটসনের' মতো—পারস্পরিক আস্থা ও টিমওয়ার্কের।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় একজন প্র্যাকটিশনারের সবচেয়ে বড় যোগ্যতা এটি নয় যে তিনি কত জটিল রোগের চিকিৎসা করতে পারেন, বরং তার সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হলো—তিনি কত দ্রুত 'রেড ফ্ল্যাগ' বা বিপজ্জনক লক্ষণগুলো চিনতে পারেন এবং রোগীকে নিরাপদ রাখতে পারেন।
মেডিকেল সায়েন্সে একটি বিখ্যাত কথা আছে:
"Knowing what you don't know is more important than knowing what you know."
(তুমি কী জানো না তা জানতে পারাটা, কী জানো তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।)
ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে এই সঠিক সময়ে রোগীকে রেফার করার দক্ষতা বা 'Art of Referral'-ই আমাদের সবচেয়ে বড় আইনি ও পেশাদারী সুরক্ষা দেয়।
আমরা রোগীকে আটকে রাখার জন্য নই, রোগীকে বাঁচানোর জন্য সঠিক সময়ে সঠিক স্পেশালিস্টের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বৈজ্ঞানিক সমাধান।
সরকারি চাকরি কয়েক হাজার মানুষের হতে পারে; কিন্তু একটি আধুনিক ও আইনি স্বীকৃত PA/Clinical Associate পেশা লাখো মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারে।
এটি বেসরকারি হাসপাতাল, করপোরেট হেলথ সেক্টর (যেমন—গার্মেন্টস ও শিল্পকারখানা), এনজিও এবং ডিজিটাল টেলিমেডিসিন হাবে হাজার হাজার প্রশিক্ষিত পেশাজীবীর জন্য মর্যাদাপূর্ণ বেসরকারি কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার খুলে দেবে।
অন্যের পরিচয় ধার করে নয়, নিজের পরিচয় নির্মাণ করেই আমাদের টিকে থাকতে হবে।
নার্সিং পেশার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান রেখেই আমাদের গর্ব করে বলতে হবে—
"আমাদের ট্রেনিং ভিন্ন, আমাদের দায়িত্ব ভিন্ন এবং তাদের সাথে আমাদের কোনো প্রফেশনাল দ্বন্দ্ব নেই।"
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার মূল সংকট চিকিৎসকের সঙ্গে PA-এর সংঘাত নয়; প্রকৃত সংকট হলো প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতা।
PA মডেল সেই শূন্যস্থান পূরণের সবচেয়ে বৈজ্ঞানিক সমাধান।