27/08/2026
🚫 একটি শিশুর নিরাপত্তা—একটি পরিবারের দায়িত্ব, আমাদের সবার সচেতনতা
গতকাল অয়ন মেডিকেল সেন্টারের ম্যানেজার গৌতম দাদার মাত্র ৩ বছরের ছোট্ট মেয়েটি দুই তলার ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর মাথায় আঘাত পায়। মাগুরা থেকে ফরিদপুর নেওয়া হয়েছিল—কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
ঘটনাটি জানার পর থেকেই আমি স্তম্ভিত হয়ে আছি। একজন বাবা-মায়ের জন্য এমন শোক কতটা অসহনীয়, তা হয়তো কল্পনাও করা যায় না। ছোট্ট একটি প্রাণ, একটি মুহূর্তের দুর্ঘটনা—আর একটি পরিবার সারাজীবনের জন্য শূন্য হয়ে গেল।
এই ঘটনা কাউকে ভয় দেখানোর জন্য নয়। বরং আমাদের সবাইকে একবার থেমে ভাবানোর জন্য।
👶 শিশুরা বিপদ বোঝে না
একটি ছোট শিশু জানে না— কোথায় পড়ে গেলে আঘাত লাগবে, কোথায় বিদ্যুৎ আছে, কতটা উঁচু থেকে পড়লে মৃত্যু হতে পারে, পানির গভীরতা কতটা, অথবা কোন জিনিসটি স্পর্শ করা বিপজ্জনক।
ওরা স্বভাবতই কৌতূহলী, চঞ্চল এবং অনুসন্ধিৎসু। যে জিনিসটি আমাদের কাছে বিপজ্জনক, সেটিই হয়তো তাদের কাছে নতুন একটি খেলার জিনিস।
তাই শুধু শিশুকে বলা—“ওখানে যেও না”—সবসময় যথেষ্ট নয়।
আমাদের ঘরকেই এমনভাবে নিরাপদ করতে হবে, যাতে শিশুর ভুলের সুযোগ থাকলেও তার পরিণতি যেন ভয়াবহ না হয়।
🏠 বাড়ির ছাদ ও বারান্দায় বিশেষ সতর্কতা
ছোট শিশু আছে এমন বাড়িতে—
🔹 ছাদের চারপাশে যথেষ্ট উঁচু ও শক্ত রেলিং/প্যারাপেট থাকা উচিত।
🔹 রেলিং এমন হওয়া উচিত নয়, যার মাঝখান দিয়ে শিশু সহজে বের হতে পারে।
🔹 রেলিংয়ের পাশে চেয়ার, টেবিল, টুল, টব, বাক্স বা অন্য কোনো বস্তু রাখা উচিত নয়—যার ওপর উঠে শিশু সহজে কিনারায় পৌঁছে যেতে পারে।
🔹 ছাদে যাওয়ার দরজায় শিশু-নিরাপদ লক/গেট রাখা যেতে পারে।
🔹 ছাদে পানির ট্যাংক, নির্মাণসামগ্রী বা অন্য কোনো উঁচু বস্তু থাকলে সেগুলোর আশপাশেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
🔹 বারান্দার গ্রিল/রেলিংয়ের নকশা এমন হওয়া উচিত যাতে শিশু মাথা বা শরীর ঢুকিয়ে আটকে যেতে বা বাইরে পড়ে যেতে না পারে।
🔹 জানালার ক্ষেত্রেও শিশুদের নাগালের বাইরে সেফটি গ্রিল/চাইল্ড-সেফটি ব্যবস্থা রাখা জরুরি।
⚠️ শুধু ছাদ নয়—বাড়ির আরও কিছু বড় ঝুঁকি
শিশুর দুর্ঘটনা ঘটতে পারে—
• সিঁড়ি থেকে পড়ে
• জানালা বা বারান্দা থেকে পড়ে
• পানির ট্যাংক, বালতি, পুকুর বা খোলা পানিতে ডুবে
• বৈদ্যুতিক সকেট/তার থেকে
• গরম পানি বা আগুনে পুড়ে
• ওষুধ, কীটনাশক বা রাসায়নিক খেয়ে
• ছোট খেলনা/বস্তু গিলে শ্বাসনালীতে আটকে
• রান্নাঘরের ছুরি, কাঁচ বা ধারালো জিনিসে
• রাস্তায় বা গাড়ির নিচে/সামনে গিয়ে
• ঘরের ভারী আসবাবপত্র উল্টে গিয়ে।
❤️ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
শিশুকে সবসময় নজরে রাখা সম্ভব নয়।
মা-বাবা হয়তো কয়েক মিনিটের জন্য অন্য কাজে ব্যস্ত থাকবেন। দাদা-দাদি, ভাই-বোন বা অন্য কেউ হয়তো শিশুর পাশে থাকবেন। তাই শিশুর নিরাপত্তা শুধু “কে তাকে দেখছে”—তার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।
বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—
“আমাদের বাড়িটা কি শিশুর জন্য নিরাপদ?”
আজই নিজের বাড়ির ছাদ, বারান্দা, জানালা, সিঁড়ি, পানির ব্যবস্থা, রান্নাঘর, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং ওষুধ/রাসায়নিক রাখার জায়গাগুলো একবার শিশুর চোখ দিয়ে দেখুন।
যেখানে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কোনো ঝুঁকি দেখছেন না, সেখানে হয়তো একটি ৩ বছরের শিশু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পৌঁছে যেতে পারে।
গৌতম দাদার পরিবারের এই অপূরণীয় ক্ষতি কোনো কথায় পূরণ হওয়ার নয়। ছোট্ট শিশুটির জন্য গভীর শোক ও তার পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা।
আসুন, এই মর্মান্তিক ঘটনাটিকে শুধু একটি দুঃখজনক খবর হিসেবে না দেখে—নিজের সন্তানের নিরাপত্তার জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে নিই।
❓আজ আপনার বাড়িতে একটি ছোট্ট শিশু নিরাপদ তো?
সচেতনতা হয়তো একটি দুর্ঘটনা ঠেকাতে পারে। আর একটি দুর্ঘটনা ঠেকানো মানে—একটি জীবন বাঁচানো।
Dr. Sauwhardya Biswas
MBBS, BCS(Health)
Medical Officer
Shalikha UHC, Magura