11/08/2026
🕯️ শেষ ট্রেনের শেষ যাত্রী
রাত তখন ১২টা ৪৭ মিনিট।
স্টেশনটা প্রায় ফাঁকা।
শেষ ট্রেনটা চলে যাওয়ার কথা ছিল রাত ১২টা ৩০ মিনিটে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, পুরোনো স্টেশন মাস্টারের ঘড়িতে তখনও একটা ট্রেনের সময় দেখাচ্ছিল—
১২টা ৫৫ মিনিট।
রাহাত প্ল্যাটফর্মে একা দাঁড়িয়ে ছিল।
হঠাৎ দূর থেকে ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।
কিন্তু রেললাইনের ওপর কোনো আলো দেখা যাচ্ছিল না।
কিছুক্ষণ পর অন্ধকার ভেদ করে একটা পুরোনো কালো ট্রেন ধীরে ধীরে স্টেশনে ঢুকল।
ট্রেনের কোনো নম্বর নেই।
কোনো গন্তব্য লেখা নেই।
আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার—
ট্রেনের সব জানালা কালো কাপড়ে ঢাকা।
রাহাত ভেবেছিল, হয়তো ভুল ট্রেন।
কিন্তু দরজা খুলতেই ভেতর থেকে একজন বৃদ্ধ লোক হাত বাড়িয়ে বলল,
— "উঠে পড়ুন। আপনার জন্যই অপেক্ষা করছি।"
রাহাত অবাক হয়ে বলল,
— "আমার জন্য?"
বৃদ্ধ লোকটা মৃদু হাসল।
— "আপনি তো প্রতিদিনই এই ট্রেনে ওঠেন।"
রাহাতের বুকটা ধক করে উঠল।
— "আমি? আমি তো আপনাকে কখনো দেখিনি!"
বৃদ্ধ লোকটা আর কিছু বলল না।
শুধু বলল,
— "আজ শেষবারের মতো উঠুন।"
কথাটা শুনে রাহাতের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
তবুও অদ্ভুত এক টানে সে ট্রেনে উঠে পড়ল।
ভেতরে ঢুকেই সে দেখল—
সব সিট খালি।
শুধু একেবারে শেষ সিটে একজন ছোট্ট মেয়ে বসে আছে।
মেয়েটার বয়স সাত-আট বছর হবে।
সে জানালার দিকে তাকিয়ে ছিল।
রাহাত কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— "তুমি একা?"
মেয়েটা ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল।
তার চোখ দুটো সম্পূর্ণ কালো।
রাহাত পিছিয়ে গেল।
মেয়েটা ফিসফিস করে বলল,
— "চাচা... আপনি কি জানেন আমরা কোথায় যাচ্ছি?"
রাহাত কোনো উত্তর দিল না।
মেয়েটা আবার বলল,
— "যেখানে সবাই যায়..."
ঠিক তখনই ট্রেন চলতে শুরু করল।
রাহাত জানালার পর্দা সরাতে গেল।
বৃদ্ধ লোকটা হঠাৎ চিৎকার করে উঠল,
— "জানালা খুলবেন না!"
রাহাত থেমে গেল।
— "কেন?"
বৃদ্ধ লোকটা নিচু গলায় বলল,
— "বাইরে যারা দাঁড়িয়ে থাকে... তারা কিন্তু মানুষ নয়।"
রাহাতের বুক কেঁপে উঠল।
কৌতূহল সামলাতে না পেরে সে একটু পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাল।
রেললাইনের পাশে শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
সবাই ট্রেনের দিকে তাকিয়ে।
কেউ নড়ছে না।
কেউ কথা বলছে না।
কিন্তু তাদের সবার মুখে—
রাহাতের মুখ।
রাহাত ভয়ে পর্দা ছেড়ে দিল।
সে দৌড়ে ট্রেনের দরজার দিকে গেল।
দরজা খুলতে গিয়ে দেখল—
দরজার ওপাশে কোনো প্ল্যাটফর্ম নেই।
শুধু গভীর কালো অন্ধকার।
হঠাৎ পেছন থেকে মেয়েটার কণ্ঠ ভেসে এল,
— "চাচা..."
রাহাত ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
মেয়েটা এবার দাঁড়িয়ে আছে।
তার হাতে একটা পুরোনো ছবি।
সে ছবিটা রাহাতের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
— "এটা আপনার।"
রাহাত ছবিটা হাতে নিয়ে জমে গেল।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে—
একটা ট্রেন দুর্ঘটনা।
চারপাশে আগুন।
আর সেই ট্রেনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে রাহাত নিজেই।
ছবির নিচে লেখা—
"১২ আগস্ট ২০১৬"
রাহাত কাঁপা গলায় বলল,
— "এটা... অসম্ভব।"
বৃদ্ধ লোকটা ধীরে ধীরে তার কাছে এসে দাঁড়াল।
— "অসম্ভব নয়।"
— "আপনি দশ বছর আগে এই ট্রেনে মারা গিয়েছিলেন।"
রাহাতের হাত থেকে ছবিটা পড়ে গেল।
— "তাহলে... আমি এখন কে?"
বৃদ্ধ লোকটা উত্তর দেওয়ার আগেই ট্রেনটা হঠাৎ থেমে গেল।
সব আলো নিভে গেল।
অন্ধকারের মধ্যে শত শত মানুষের ফিসফিসানি শোনা গেল—
"আর একজন এসেছে..."
"আর একজন এসেছে..."
"এবার ট্রেন পূর্ণ হবে..."
তারপর হঠাৎ আলো জ্বলে উঠল।
রাহাত চারদিকে তাকিয়ে দেখল—
সব সিটে মানুষ বসে আছে।
কিন্তু প্রত্যেকের মুখ—
রাহাতের মুখ।
শেষ সিটে বসে থাকা ছোট্ট মেয়েটা হাসল।
তারপর বলল,
— "চাচা, এতদিন পরে বাড়ি ফিরলেন..."
রাহাত আতঙ্কে পিছিয়ে যেতে লাগল।
ঠিক তখনই ট্রেনের মাইকে ঘোষণা হলো—
"পরবর্তী স্টেশন—মৃত্যুপুর।"
আর সেই মুহূর্তে রাহাত বুঝতে পারল...
ট্রেনটা কোথাও যাচ্ছে না।
ট্রেনটা তাকে নিয়ে ফিরে যাচ্ছে সেই রাতের কাছে, যেদিন সে মারা গিয়েছিল।
কিন্তু এবার—
ট্রেনের যাত্রী একজন নয়।
পুরো ট্রেনটাই তার অপেক্ষায় ছিল।
🚆 শেষ।
✍️ গল্প: রোমান ইসলাম