01/04/2026
একজন রোগীকে যখন বলা হয় যে আপনার লক্ষণসমূহ যাদুগ্রস্ত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন তার মনে জাগে,
“আমাকে কে যাদু করেছে?”
এই প্রশ্নটি অস্বাভাবিক নয়। বরং বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ মানুষ যাদুর শিকার হওয়ার সম্ভাবনাকে প্রথমে অস্বীকার করে, কারণ তারা মনে করে তাদের সাথে কারো এমন শত্রুতা থাকার কথা নয়। কিন্তু বিষয়টি বুঝতে হলে প্রথমেই আমাদের জানতে হবে যাদু আসলে কী।
যাদু হলো এমন কিছু নির্দিষ্ট নিয়মতান্ত্রিক কুফরি কার্যক্রম, যার মাধ্যমে শয়তান ও জিনের সাহায্য নিয়ে কোনো ব্যক্তির উপর প্রভাব বিস্তার করা হয়। এর উদ্দেশ্য হতে পারে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করা, মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করা, শারীরিক অসুস্থতা তৈরি করা, অথবা জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করা। এই প্রক্রিয়ায় শয়তান আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করে বা তার উপর প্রভাব বিস্তার করে এবং ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
একজন মানুষ মূলত দুইভাবে যাদুগ্রস্ত হতে পারে
০১- মানুষের পক্ষ থেকে।
০২- শয়তানের পক্ষ থেকে।
মানুষের পক্ষ থেকে যাদু'
মানুষের দ্বারা সংঘটিত যাদু সাধারণত কিছু নির্দিষ্ট কারণের উপর ভিত্তি করে হয়ে থাকে, যেগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথেই গভীরভাবে সম্পর্কিত।
প্রথমত, হিংসা এবং লোভ এটি যাদুর অন্যতম প্রধান কারণ। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, এই হিংসা অনেক সময় দূরের মানুষের মধ্যে নয়, বরং নিজের কাছের মানুষদের মধ্যেই বেশি দেখা যায়। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু বা প্রতিবেশীদের কেউ কেউ অন্যের উন্নতি, সুখ বা সফলতা সহ্য করতে পারে না। ফলে তারা হিংসার বশবর্তী হয়ে কবিরাজ বা তান্ত্রিকদের শরণাপন্ন হয় এবং যাদুর আশ্রয় নেয়।
দ্বিতীয়ত, শত্রুতা মানুষ সাধারণত মনে করে তার শত্রু দূরে কোথাও অবস্থান করছে, কিন্তু বাস্তবতা অনেক ভিন্ন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শত্রু খুব কাছেই থাকে, আশপাশের মানুষ, পরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিবেশী। কোনো কারণে মনোমালিন্য, দ্বন্দ্ব বা প্রতিযোগিতা থেকে শত্রুতা তৈরি হয়, এবং সেই শত্রুতা থেকেই যাদুর মতো জঘন্য পথে কেউ কেউ অগ্রসর হয়।
তৃতীয়ত, প্রতিশোধ প্রতিশোধের মনোভাব মানুষকে অন্ধ করে দেয়। অনেক সময় কেউ সরাসরি প্রতিশোধ নিতে পারে না, হয় শক্তির অভাবে বা পরিস্থিতির কারণে। তখন সে গোপনে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তান্ত্রিক বা যাদুকরের কাছে যায়। এই ধরনের যাদু সাধারণত বেশি ক্ষতিকর হয়, কারণ এতে গভীর ক্ষোভ ও বিদ্বেষ কাজ করে।
চতুর্থত, বংশপরম্পরা এটিকে ‘সিহরুল মাউরুস’ বলা হয়। যদি কোনো পরিবারের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ যাদুর সাথে জড়িত থাকে বা যাদুর শিকার হয়ে থাকে, এবং সেই যাদু যথাযথভাবে ধ্বংস না করা হয়, তাহলে তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন কিছু রোগ জেনেটিকভাবে বংশানুক্রমে ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি যাদুর ক্ষেত্রেও অনুরূপ প্রভাব দেখা যেতে পারে।
পঞ্চমত, উদ্দেশ্য ভালো কিন্তু পদ্ধতি ভুল এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি দিক। অনেক সময় পরিবারের সদস্যরা ভালো উদ্দেশ্যে, যেমন সন্তানকে বাধ্য করা, পড়াশোনায় মনোযোগী করা, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক ভালো রাখা, এইসব কারণে যাদুর আশ্রয় নেয়। কিন্তু তারা বুঝতে পারে না যে এই পথ সম্পূর্ণ হারাম এবং এর ফল ভয়াবহ। এই ধরনের যাদু সাময়িকভাবে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আনলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়। অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তি মানসিক ভারসাম্য হারায়, শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে, এমনকি সম্পর্ক আরও খারাপ হয়ে যায়।
০২- শয়তানের পক্ষ থেকে যাদু
শয়তানের পক্ষ থেকেও মানুষ যাদুর মতো ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে, যা মূলত দুইভাবে ঘটে।
প্রথমত, তান্ত্রিকের মাধ্যমে জ্বিন প্রেরণ যখন কোনো যাদুকর তার যাদুকে কার্যকর রাখতে জ্বিন নিয়োগ করে, তখন সেই জ্বিন আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করে বা তার উপর স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করে। এই অবস্থায় ব্যক্তি পজেসড হয়ে যায় এবং সেই জ্বিন নিজেই তার উপর যাদুর কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে। ফলে সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয়ত, বদনজর এবং হিংসার মাধ্যমে প্রবেশ কোনো ব্যক্তি যদি অত্যধিক পরিমাণে বদনজর বা হিংসার শিকার হয়, তাহলে শয়তান সেই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তার জীবনে প্রবেশের সুযোগ পায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَمِن شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ
অর্থ: হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই, যখন সে হিংসা করে।
সূরা আল-ফালাক, আয়াত ৫।
এই অবস্থায় শয়তান বদনজর বা হিংসার প্রভাবে আক্রান্ত ব্যক্তির উপর আধিপত্য বিস্তার করে এবং তার জীবনে বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি করতে থাকে। সে আক্রান্ত ব্যক্তিকে দুর্বল করে রাখে এবং নিজের প্রভাব বজায় রাখতে বারবার ক্ষতি করার চেষ্টা করে। বিশেষ করে যারা দ্বীনি ইলম অর্জনের পথে থাকে, তাদের মধ্যে এই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হওয়ার ঘটনা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো,
যাদু, জিন বা শয়তান কখনোই আল্লাহর ইচ্ছা ও অনুমতি ছাড়া কোনো মানুষের ক্ষতি করতে পারে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَمَا هُم بِضَارِّينَ بِهِ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ
অর্থ: তারা আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কাউকে কোনো ক্ষতি করতে পারে না।
সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১০২।
অতএব,একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আল্লাহর উপর পূর্ণ বিশ্বাস ও তাওয়াক্কুল। নিয়মিত ইবাদত, কুরআন তিলাওয়াত এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ অনুসরণ করাই সেই শক্তির মূল ভিত্তি।
এই বিশ্বাস ও আনুগত্যই মানুষকে যাদু, জিন, শয়তান এবং সকল প্রকার অনিষ্ট থেকে রক্ষা করে। আল্লাহর সাহায্য ও হেফাজতের মধ্যে একজন মুমিন নিরাপদ ও স্থির থাকে, এবং জীবনের সকল পরীক্ষায় স্থিতপ্রজ্ঞ হয়।
আল্লাহ আমাদের সকলকে যে কোনো ধরনের ক্ষতি, বিপদ ও অনিষ্ট থেকে রক্ষা করুন এবং আমাদের মন ও শরীরকে শক্তিশালী করুন এবং যাদু, জিন, শয়তানের এবং সকল প্রকার অনিষ্ট থেকে হেফাজত করুন। আমিন
লেখাটি ভালো লাগলে দাওয়াহর নিয়তে শেয়ার করতে পারেন। জাযাকুমুল্লাহ্
🎤 Raqi Amir Hamza
Senior Consultant & Managing Director
Raqi : Nabawi Life
☎️01706-685576
☎️01798-645570