07/08/2026
আজ শুক্রবার (৭ আগস্ট ২০২৬) সকাল আনুমানিক ৭টার দিকে সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার কাশিকাপন এলাকায় দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে এক শিশুসহ ৯ জন নিহত এবং অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন।
ওসমানীনগরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৯ জনের পরিচয় জানা গেছে। - ঘটনাস্থলেই মৃত্যুঃ
১. হাজী সাইফুল ইসলাম(৫০), পিতা- মৃত সাফিউদ্দিন, সাং- লক্ষ্মীপুর, থানা- কুলিয়ারচর,
২. রুবেল সুত্রধর (৩৭), পিতা- রঞ্জিত সূত্রধর, সাং- ষাইধার (আটরামপুর), থানা- নিকলি
৩. শিল্পি পেহেলী ভৈরবী (১৭), পিতা- বাবুল মিয়া, সাং- চন্ডিবের, থানা- ভৈরব, সর্ব জেলা- কিশোরগঞ্জ।
৪. মো: সাইফুল ইসলাম ইমন (৩২), পিতা- সিরাজুল ইসলাম, সাং- শেরপুর, থানা- বি-বাড়িয়া সদর
৫. আবুল হোসেন (৪৪), পিতা- মৃত বারেক মিয়া, সাং- বগডহর, থানা- নবীনগর, উভয় জেলা- বি-বাড়িয়া।
৬. আরমান (১৯), পিতা- রফিকুল ইসলাম, সাং- উমনপুর, থানা- জৈন্তাপুর, জেলা- সিলেট।
৭. সানিয়াদ জাহাঙ্গীর সৌরভ (৩৯), পিতা- আ: সালাম, সাং- পীরকাশিমপুর, থানা- বাঙ্গরা বাজার (পুরাতন মুরাদনগর), জেলা- কুমিল্লা।সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত্যুঃ
১. ফাইজা ইসলাম তানহা (০৩), পিতা- মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, মাতা- নুরুন্নাহার, সাং- মোছারগাঁও, থানা- দক্ষিন সুরমা, জেলা- সিলেট (এসএমপি)।
২. সপ্তম রায় প্রিতম (২২), পিতাঃ উত্তম রায়, সাং- মহাজনপট্টি নিউ মার্কেট, বর্তমান সাং- মৌবন-১০, সোবহানীঘাট, থানা- কোতয়ালী, জেলা- সিলেট (এসএমপি)।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ঢাকাগামী ‘ইউনিক পরিবহন’ এবং সিলেটগামী ‘বেঙ্গল স্লিপার কোচ’ এর মধ্যে এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে।
কিসের এতো তাড়া? ওসমানীনগরের মহাসড়কে ৯ প্রাণের আহাজারি
সকাল ৭টা ১০ মিনিট। চারপাশটা কেবল সজাগ হতে শুরু করেছে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ওসমানীনগরের কাশিকাপন এলাকাটি তখন অনেকটাই ফাঁকা। ঠিক সেই মুহূর্তে এক নিমিষেই বাতাসে মিশে গেল বিকট এক শব্দ, আর তারপরই শুধুই আর্তনাদ।
সিলেটগামী বেঙ্গল পরিবহনের একটি স্লিপার বাস একটি পিকআপ ভ্যানকে ওভারটেক করতে গিয়ে রং লেনে চলে আসে এবং সামনে থাকা ঢাকাগামী ইউনিক পরিবহনের বাসটিকে সরাসরি মুখোমুখি ধাক্কা দেয়। সংঘর্ষের তীব্রতা এতোটাই বেশি ছিল যে, ইউনিক পরিবহনের বাসটি ছিটকে সড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ৭ জন যাত্রী, পরে হাসপাতালে মারা যান আরও ২ জন। নিহতদের মধ্যে ৩ বছরের এক অবুজ শিশু ফাইজা এবং জনপ্রিয় বাউলশিল্পী পেহেলী ভৈরবীও রয়েছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—কিসের এতো তাড়া ছিল? এই গতির প্রতিযোগিতা কার জন্য?
ফাঁকা সড়ক আর গতির অন্ধ মোহ
হাইওয়ে পুলিশের প্রাথমিক তথ্যমতে, সকালের ফাঁকা সড়ক পেয়ে দুই বাসের চালকই গাড়ি চালাচ্ছিলেন অতিরিক্ত গতিতে। তার ওপর ছিল চালকদের চোখে রাতের ক্লান্তি আর ঘুম। বেঙ্গল পরিবহনের চালক যখন নিয়ম ভেঙে, নিজের লেন ছেড়ে আরেকটি গাড়িকে ওভারটেক করতে গেলেন, তখন তিনি হয়তো ভুলেই গিয়েছিলেন যে তার পেছনে বসে আছেন বহু মানুষ, যাদের জীবনের নিরাপত্তা সম্পূর্ণ তার হাতে। এই "কয়েক সেকেন্ড আগে পৌঁছানোর" কিংবা "আগে যাওয়ার" অসুস্থ মানসিকতাই আজ ৯টি পরিবারকে চিরতরে ধ্বংস করে দিয়েছে।
যাত্রীদের কোনো তাড়া ছিল না, তাড়া ছিল ঘাতকদের
দুর্ঘটনায় নিহত বাউলশিল্পী পেহেলী ভৈরবী সিলেটে অনুষ্ঠান শেষ করে বাড়ি ফিরছিলেন। ৩ বছরের শিশু জাইফা তার মা-বাবার সাথে হয়তো কোনো আনন্দের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিল। বাসের সাধারণ যাত্রীদের কারও কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না।
তারা টিকিট কেটেছিলেন গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য, মৃত্যুর মিছিলে শামিল হতে নয়। কিন্তু আমাদের দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলা এবং চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে যাত্রীদের জীবন আজ মহাসড়কে সবচেয়ে সস্তা পণ্যে পরিণত হয়েছে।
ঘুমন্ত চোখ আর লাইসেন্সবিহীন মানসিকতা
তদন্তে উঠে এসেছে, চালকরা ঘুমঘুম চোখে গাড়ি চালাচ্ছিলেন।
দূরপাল্লার চালকদের একটানা গাড়ি চালানো, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং ট্রাফিক আইনকে তোয়াক্কা না করার সংস্কৃতি আমাদের মহাসড়কগুলোকে একেকটি ডেথ ট্র্যাপ বা মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত করেছে। দুর্ঘটনার পরপরই দুই বাসের চালকই পালিয়ে গেছেন। এই পালিয়ে যাওয়া প্রমাণ করে, তারা নিজেদের অপরাধ সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন, কিন্তু গাড়ি চালানোর সময় সেই বিবেচনাবোধ কাজ করেনি।
এই মৃত্যুর শেষ কোথায়?
ওসমানীনগরের এই কাণ্ডটি কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা নয়, এটি স্পষ্টতই একটি 'হত্যাকাণ্ড'। প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই আমরা দেখি গতির প্রতিযোগিতা কেড়ে নিচ্ছে সাধারণ মানুষের প্রাণ। যতক্ষণ না পর্যন্ত বেপরোয়া ড্রাইভিং, রং লেনে ওভারটেকিং এবং ফিটনেসবিহীন ও ক্লান্ত চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, ততক্ষণ এই "তাড়া" থামবে না।
সড়ক কোনো রেসিং ট্র্যাক নয়। সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি—এই সাধারণ সত্যটি আমাদের চালক এবং পরিবহন মালিকরা কবে বুঝবেন? আজ যে ৯টি প্রাণ চলে গেল, তাদের পরিবারের এই আজীবনের শূন্যতা কি কোনো ক্ষতিপূরণ বা চালকের শাস্তি দিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব? কিসের এতো তাড়া মানুষের, যা জীবনের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায়?