05/05/2026
✅রুকয়াহ, আরবীতে رقية, শাব্দিক অর্থ: ঝাড়ফুঁক করা।
এটা যে কোন ঝাঁড়ফুক হতে পারে।কুরআন হাদীস দ্বারা অথবা বিভিন্ন তন্ত্রমন্ত্রের মাধ্যমেও হতে পারে।
رقية شرعية(রুকইয়াহ শরিইয়্যাহ): তবে রুকইয়াহ শরইয়্যাহ হলো শুধমাত্র কুরআন এবং হাদীসের নির্দেশিত পন্থায় ঝাঁড়ফুক বা চিকিৎসা গ্রহণ করা।
পরিভাষায়: রুকয়াহ শরইয়্যাহতে উল্লেখিত সংজ্ঞাকেই পরিভাষায় রুকয়াহ বলা হয়। তাই আমরা রুকয়াহ বলতে শুধুমাত্র রুকইয়াহ শরইয়্যাহকেই বুঝে থাকি।
✅কেন রুকইয়াহ করব: মানুষ হিসেবে আমরা শারীরিক বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকি।জ্বর, মাথা ব্যথা, পেট ব্যথাসহ আমাদের বিভিন্ন রোগ হয়।ডাক্তার দেখিয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করলেই আল্লাহর রহমতে আমরা সুস্থ হয়ে যাই।কিন্তু এমন কিছু রোগ আছে যেগুলো শুধু ডাক্তার দেখানোর মাধ্যমে সুস্থ হওয়া যায় না কারণ এসব রোগের উৎপত্তিস্থল শরীর নয় বরং এর চেয়েও গভীরে। অর্থাৎ এগুলো শারীরিক রোগ নয় বরং আত্মিক বা প্যারানরমাল সমস্যা। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এগুলো ধরা পড়ে না তাই অনেকেই এগুলো বিশ্বাস করতে চায় না।কিন্তু আমরা মুলিমদের নিকট সবকিছুর মাপকাঠি হচ্ছে কুরআন এবং রাসূলের সুন্নাহ।
দেখা যাক কুরআন এবং হাদীসে এই বিষয়ে কি বলা হয়েছে:
✅মানুষের উপর জিনের প্রভাব (জিন আছর):
ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী জিন মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে বা ভর করতে পারে। যদিও এটি একটি অদৃশ্য বিষয়, তবে কুরআন ও সুন্নাহ এর প্রমাণ দেয়।
দলীল:
🟢কুরআনে বর্ণিত হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন সুদখোররা সেই ব্যক্তির মতো দাঁড়াবে যাকে শয়তান (জিন) স্পর্শ করে পাগল করে দেয়।
الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسِّ
"যারা সুদ খায়, তারা (কিয়ামতের দিন) সে ব্যক্তির ন্যায় দাঁড়াবে, যাকে শয়তান তার স্পর্শ দ্বারা পাগল করে দেয়।" (সূরা আল-বাকারাহ: ২৭৫)
🟢শয়তানের রক্তচলাচলের শিরায় প্রবেশ:
রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, শয়তান বা জিন মানুষের শরীরের ভেতরে প্রবেশ করার এবং চলাচলের ক্ষমতা রাখে।
إِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِي مِنَ الإِنْسَانِ مَجْرَى الدَّمِ
"নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের রক্ত চলাচলের নালীতে (শিরায়) চলাচল করে।" (সহীহ বুখারী: ৩৩১৭, সহীহ মুসলিম: ২১৭৫)
🟢 অসুস্থ বালকের দেহ থেকে জিন বের করা:
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে এক মহিলা তার ছেলেকে নিয়ে এসেছিলেন যার ওপর জিনের আছর ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) সেই জিনকে বের হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
فَخَرَجَتْ إِلَيْهِ امْرَأَةٌ مَعَهَا صَبِيٌّ لَهَا، فَقَالَتْ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّ هَذَا ابْنِي بِهِ بَلَاءٌ... فَفَتَحَ فَاهُ فَمَجَّ فِيهِ، ثُمَّ قَالَ: «اخْرُجْ عَدُوَّ اللَّهِ، أَنَا رَسُولُ اللَّهِ»
"জনৈক নারী তার এক ছেলেকে নিয়ে রাসূল (সা.) এর কাছে আসলেন এবং বললেন: হে আল্লাহর রাসূল, আমার এই ছেলেটি মুসিবতে (জিনের আছরে) আক্রান্ত। তখন রাসূল (সা.) ছেলেটির মুখ খুলে সেখানে থুতু দিলেন এবং বললেন: 'বের হয়ে যা হে আল্লাহর শত্রু! আমি আল্লাহর রাসূল'। (মুসনাদে আহমাদ: ৪/১৭১, সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩৫৪৮)
🟢 নামাযের সময় শয়তানের আক্রমণ:
রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে নামায পড়ার সময় একবার জিন বা শয়তান দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং তাকে প্রতিহত করেছিলেন।
إِنَّ عِفْرِيتًا مِنَ الْجِنِّ جَعَلَ يَفْتَكُ عَلَيَّ الْبَارِحَةَ لِيَقْطَعَ عَلَيَّ الصَّلَاةَ، وَإِنَّ اللَّهَ أَمْكَنَنِي مِنْهُ فَذَعَتُّهُ
"গত রাতে জিনের মধ্য থেকে এক শক্তিশালী ইফরিত আমার ওপর চড়াও হয়েছিল যেন আমার নামায নষ্ট করতে পারে। কিন্তু আল্লাহ আমাকে তার ওপর শক্তি দিলেন এবং আমি তাকে জাপটে ধরলাম।" (সহীহ বুখারী: ৪৮৬)
✅বদনজর (العين - আল-আইন):
বদনজর একটি অতি বাস্তব সত্য। এটি মানুষের ক্ষতি করতে পারে, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে।
দলীল:
🟢রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
العَيْنُ حَقٌّ، ولو كانَ شيءٌ سابَقَ القَدَرَ سَبَقَتْهُ العَيْنُ
"বদনজর সত্য। যদি ভাগ্যকে কোনো কিছু অতিক্রম করতে পারত, তবে বদনজর তা করত।" (সহীহ মুসলিম: ২১৮৮)
🟢অন্য একটি হাদীসে এসেছে:
الْعَيْنُ تُدْخِلُ الرَّجُلَ الْقَبْرَ، وَتُدْخِلُ الْجَمَلَ الْقِدْرَ
"বদনজর মানুষকে কবরে এবং উটকে হাঁড়িতে (মৃত্যুর মুখে) প্রবেশ করায়।" (সহীহ জামে: ৪১৪৪)
🟢আরেকটি ভয়াবহ হাদীস হলো রাসূল সা: বলেছেন:
أَكْثَرُ مَنْ يَمُوتُ مِنْ أُمَّتِي بَعْدَ قَضَاءِ اللَّهِ وَقَدَرِهِ بِالْعَيْنِ
অনুবাদ: "আল্লাহর ফয়সালা ও তাকদীরের পর আমার উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যাবে বদনজরের কারণে।"
✅যাদু (السحر - আস-সিহর):
যাদু একটি কুফরী কাজ। এটি মানুষের শারীরিক ও মানসিক বিভিন্নরকম ক্ষতি করতে পারে এবং স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে।
দলীল:
🟢কুরআনে হারুত ও মারুত ফেরেশতার কাহিনীতে বলা হয়েছে:
فَيَتَعَلَّمُونَ مِنْهُمَا مَا يُفَرِّقُونَ بِهِ بَيْنَ الْمَرْءِ وَزَوْجِهِ
"অতঃপর তারা তাদের (ফেরেশতা) কাছ থেকে এমন জাদু শিখত, যা দিয়ে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো যায়।" (সূরা আল-বাকারাহ: ১০২)
🟢রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও যাদুর দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন, পরবর্তীতে সূরা ফালাক ও নাসের মাধ্যমে তিনি সুস্থ হন।
হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত:
سَحَرَ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم رَجُلٌ مِنْ بَنِي زُرَيْقٍ يُقَالُ لَهُ لَبِيدُ بْنُ الأَعْصَمِ، حَتَّى كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يُخَيَّلُ إِلَيْهِ أَنَّهُ كَانَ يَفْعَلُ الشَّيْءَ وَمَا فَعَلَهُ.
حَتَّى إِذَا كَانَ ذَاتَ يَوْمٍ أَوْ ذَاتَ لَيْلَةٍ وَهُوَ عِنْدِي، لَكِنَّهُ دَعَا وَدَعَا، ثُمَّ قَالَ: يَا عَائِشَةُ، أَشَعَرْتِ أَنَّ اللَّهَ أَفْتَانِي فِيمَا اسْتَفْتَيْتُهُ فِيهِ؟ جَاءَنِي رَجُلانِ، فَقَعَدَ أَحَدُهُمَا عِنْدَ رَأْسِي، وَالآخَرُ عِنْدَ رِجْلَيَّ... فَقَالَ: مَا وَجَعُ الرَّجُلِ؟ قَالَ: مَطْبُوبٌ. قَالَ: مَنْ طَبَّهُ؟ قَالَ: لَبِيدُ بْنُ الأَعْصَمِ. قَالَ: فِي أَيِّ شَيْءٍ؟ قَالَ: فِي مُشْطٍ وَمُشَاطَةٍ وَجُفِّ طَلْعَةِ ذَكَرٍ.
অর্থ:"বনী যুরাইক গোত্রের লাবীদ ইবনুল আসম নামক এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর যাদু করেছিল। যার প্রভাবে রাসূলুল্লাহ (সা.) কোনো একটি কাজ করেননি কিন্তু তাঁর কাছে মনে হতো যে তিনি তা করেছেন (অর্থাৎ তিনি যা করেননি তা করেছেন বলে তাঁর কাছে কল্পনা হতো)।
একদিন তিনি (সা.) আমার কাছে থাকাকালীন বারবার দুয়া করলেন। এরপর বললেন: আয়েশা, তুমি কি জানো? আমি যে বিষয়ে আল্লাহর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, তিনি আমাকে তা জানিয়ে দিয়েছেন। (স্বপ্নে) দুজন ফেরেশতা আমার কাছে আসলেন; একজন আমার মাথার কাছে এবং অন্যজন পায়ের কাছে বসলেন। এক ফেরেশতা অন্যজনকে জিজ্ঞেস করলেন: এই ব্যক্তির কষ্ট কী? অন্যজন উত্তর দিলেন: তাকে যাদু করা হয়েছে। প্রথমজন আবার জিজ্ঞেস করলেন: কে যাদু করেছে? উত্তর দিলেন: লাবীদ ইবনুল আসম। আবার প্রশ্ন করা হলো: কীসের মাধ্যমে? উত্তর আসলো: চিরুনি, চিরুনির সাথে লেগে থাকা চুল এবং পুরুষ খেজুর গাছের আবরণের মাধ্যমে।" (সহীহ বুখারী: ৫৭৬৫, সহীহ মুসলিম: ২১৮৯)
✅ওয়াসওয়াসা (الوسوسة - কুচিন্তা বা কুমন্ত্রণা)
ওয়াসওয়াসা হলো শয়তানের পক্ষ থেকে মনের মধ্যে আসা কুমন্ত্রণা। এটি ঈমান ও আমলের ক্ষেত্রে মানুষকে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ফেলে দেয়।
দলীল:
🟢আল্লাহ তাআলা সূরা নাসে ইরশাদ করেছেন:
مِن شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ . الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ
"কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে, যে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়।" (সূরা আন-নাস: ৪-৫)
🟢হাদীসে এসেছে, জনৈক সাহাবী রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে তার মনে আসা বাজে চিন্তা সম্পর্কে বললে তিনি বলেন:
ذَاكَ صَرِيحُ الْإِيمَانِ
"এটাই হলো সুস্পষ্ট ঈমানের লক্ষণ (যেহেতু তুমি এটাকে ঘৃণা করছো)।" (সহীহ মুসলিম: ১৩২)
➡️উপরোল্লেখিত আলোচনা দ্বারা আমরা বুজতে পারলাম বদনজর,জিনের আছর,যাদু বা সিহর এবং ওয়াসওয়াসা এগুলোর বাস্তব অস্তিত্ব রয়েছে এবং এগুলো আল্লাহর ইচ্ছায় মানুষকে বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এমনকি মৃত্যুও ঘটাতে পারে।
✅চিকিৎসা:
🟢রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
مَا أَنْزَلَ اللَّهُ دَاءً إِلَّا أَنْزَلَ لَهُ شِفَاءً
অনুবাদ: "আল্লাহ এমন কোনো রোগ অবতীর্ণ করেননি, যার নিরাময় (ওষুধ) তিনি অবতীর্ণ করেননি।" (সহীহ বুখারী: ৫৬৭৮)
🟢অন্য একটি বর্ণনায় বিষয়টি আরও বিস্তারিতভাবে এসেছে:
لِكُلِّ دَاءٍ دَوَاءٌ، فَإِذَا أُصِيبَ دَوَاءُ الدَّاءِ بَرَأَ بِإِذْنِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ
অনুবাদ: "প্রত্যেক রোগেরই ওষুধ রয়েছে। সুতরাং যখন রোগের সঠিক ওষুধটি প্রয়োগ করা হয়, তখন তা মহামহিম আল্লাহর নির্দেশে সুস্থ হয়ে যায়।" (সহীহ মুসলিম: ২২০৪)
✅আর জিনের আছর, বদনজর,যাদু বা সিহর এবং ওয়াসওয়াসা এ সকল প্যারানরমাল রোগের একমাত্র শরয়ী চিকিৎসা হলো রুকয়াহ করা।
🟢কুরআন থেকে দলীল
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ
"আমি কুরআনে এমন বিষয় নাযিল করি যা মুমিনদের জন্য রোগমুক্তি (শিফা) ও রহমত।" (সূরা বনী ইসরাঈল: ৮২)
🟢 হাদীস থেকে দলীল
রাসূলুল্লাহ (সা.) রুকইয়াহ করার অনুমতি ও নির্দেশ দিয়েছেন। জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন:
اسْتَرْقُوا لَهَا فَإِنَّ بِهَا النَّظْرَةَ
"তোমরা ওর (অসুস্থ ব্যক্তির) জন্য রুকইয়াহ-এর ব্যবস্থা করো, কারণ ও বদনজরে আক্রান্ত হয়েছে।" বুখারী ও মুসলিম)
🟢অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, জিবরাঈল (আ.) নবীজিকে (সা.) এই বলে রুকইয়াহ করতেন:
بِاسْمِ اللهِ أَرْقِيكَ، مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ
"আল্লাহর নামে আপনাকে রুকইয়াহ করছি, ঐ সব অনিষ্ট থেকে যা আপনাকে কষ্ট দেয়।" (সহীহ মুসলিম)
🟢হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
انْطَلَقَ نَفَرٌ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فِي سَفْرَةٍ سَافَرُوهَا، حَتَّى نَزَلُوا بِحَيٍّ مِنْ أَحْيَاءِ الْعَرَبِ، فَاسْتَضَافُوهُمْ فَأَبَوْا أَنْ يُضَيِّفُوهُمْ، فَلُدِغَ سَيِّدُ ذَلِكَ الْحَيِّ، فَسَعَوْا لَهُ بِكُلِّ شَيْءٍ لاَ يَنْفَعُهُ شَيْءٌ. فَقَالَ بَعْضُهُمْ: لَوْ أَتَيْتُمْ هَؤُلاَءِ الرَّهْطَ الَّذِينَ نَزَلُوا، لَعَلَّهُ أَنْ يَكُونَ عِنْدَ بَعْضِهِمْ شَيْءٌ. فَأَتَوْهُمْ فَقَالُوا: يَا أَيُّهَا الرَّهْطُ، إِنَّ سَيِّدَنَا لُدِغَ، وَسَعَيْنَا لَهُ بِكُلِّ شَيْءٍ لاَ يَنْفَعُهُ، فَهَلْ عِنْدَ أَحَدٍ مِنْكُمْ مِنْ شَيْءٍ؟ فَقَالَ بَعْضُهُمْ: نَعَمْ وَاللَّهِ إِنِّي لأَرْقِي، وَلَكِنْ وَاللَّهِ لَقَدِ اسْتَضَفْنَاكُمْ فَلَمْ تُضَيِّفُونَا، فَمَا أَنَا بِرَاقٍ لَكُمْ حَتَّى تَجْعَلُوا لَنَا جُعْلاً. فَصَالَحُوهُمْ عَلَى قَطِيعٍ مِنَ الْغَنَمِ.
فَانْطَلَقَ يَتْفِلُ عَلَيْهِ وَيَقْرَأُ (الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ) فَكَأَنَّمَا نُشِطَ مِنْ عِقَالٍ، فَانْطَلَقَ يَمْشِي وَمَا بِهِ قَلَبَةٌ.
অনুবাদ:"নবী করীম (সা.)-এর একদল সাহাবী এক সফরে রওনা হলেন। পথে তারা আরবের একটি গোত্রের নিকট অবতরণ করলেন এবং তাদের কাছে মেহমান হতে চাইলেন। কিন্তু ওই গোত্রের লোকেরা তাদের মেহমানদারি করতে অস্বীকার করল। ঘটনাক্রমে ওই গোত্রের সর্দারকে সাপে (বা বিচ্ছুতে) দংশন করল। তারা তাকে সারিয়ে তোলার জন্য সব ধরনের চেষ্টা করল, কিন্তু কিছুতেই কাজ হলো না।
তখন তাদের মধ্যে কেউ বলল, তোমরা যদি ওই কাফেলার কাছে যেতে যারা এখানে অবতরণ করেছে, তবে সম্ভবত তাদের কারো কাছে কোনো সমাধান থাকলেও থাকতে পারে। তারা সাহাবীদের কাছে এসে বলল, 'হে যাত্রীদল! আমাদের সর্দারকে সাপে কেটেছে, আমরা সব চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। আপনাদের কারো কাছে কি কোনো প্রতিকার আছে?'
তখন একজন সাহাবী বললেন, 'হ্যাঁ, আল্লাহর কসম! আমি ঝাড়ফুঁক করতে জানি। কিন্তু আমরা তোমাদের কাছে মেহমান হতে চেয়েছিলাম আর তোমরা আমাদের মেহমানদারি করোনি। তাই আল্লাহর কসম! আমি ততক্ষণ পর্যন্ত ঝাড়ফুঁক করব না, যতক্ষণ না তোমরা আমাদের জন্য কোনো বিনিময় নির্ধারণ করো।' তখন তারা এক পাল বকরীর বিনিময়ে সাহাবীদের সাথে চুক্তি করল।
এরপর ওই সাহাবী সেখানে গেলেন এবং সূরা আল-ফাতেহা পড়ে তার ওপর থুতু ছিটিয়ে ফুঁ দিতে লাগলেন। ফলে সে (সর্দার) এমনভাবে সুস্থ হয়ে গেল যেন তাকে বাঁধন থেকে মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। সে উঠে হাঁটাচলা করতে শুরু করল এবং তার দেহে আর কোনো যন্ত্রণাই রইল না।"
সাহাবীরা যখন বকরীগুলো নিয়ে আসলেন, তখন তাদের কেউ কেউ সেগুলো বণ্টন করতে চাইলেন। কিন্তু যিনি ঝাড়ফুঁক করেছিলেন তিনি বললেন, 'না, আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে যাওয়ার আগে এগুলো বণ্টন করব না।' তারা মদীনায় ফিরে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে পুরো ঘটনা জানালেন। তখন তিনি মৃদু হেসে বললেন:
وَمَا يُدْرِيكَ أَنَّهَا رُقْيَةٌ؟
"তুমি কীভাবে জানলে যে এটি (সূরা ফাতেহা) একটি রুকইয়াহ?"
এরপর তিনি প্রাপ্ত বকরীগুলো বণ্টন করার অনুমতি দিলেন এবং নিজের জন্য একটি অংশ রাখতে বললেন।(সহীহ বুখারী)
✅ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী, ঝাড়ফুঁক বা চিকিৎসার ক্ষেত্রে কেবলমাত্র সেই পদ্ধতিই বৈধ যা কুরআন, সুন্নাহ এবং আল্লাহর একত্ববাদের (তাওহীদ) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তন্ত্রমন্ত্র, জাদুটোনা বা শিরকী কবিরাজি পদ্ধতির মাধ্যমে চিকিৎসা গ্রহণ করা কেবল হারামই নয়, বরং এটি অনেক ক্ষেত্রে 'শিরকে আকবর' বা বড় শিরকের অন্তর্ভুক্ত, যা মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দিতে পারে।
নিচে এই বিষয়ে দলীলসহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
🟢তন্ত্রমন্ত্র ও অবৈধ ঝাড়ফুঁক শিরক:
রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে সাধারণ তন্ত্রমন্ত্র বা শিরকী মন্ত্রের মাধ্যমে ঝাড়ফুঁককে শিরক হিসেবে অভিহিত করেছেন।
দলীল:
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি:
إِنَّ الرُّقَى وَالتَّمَائِمَ وَالتِّوَلَةَ شِرْكٌ
"নিশ্চয়ই (শিরকী) ঝাড়ফুঁক, তাবীজ-কবজ এবং 'তিওয়ালা' (স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টির যাদু) শিরক।"
(সুনানে আবু দাউদ: ৩৮৮৩, ইবনে মাজাহ: ৩৫৩০, সহীহ আলবানী)
🟢গণক বা কবিরাজের কাছে যাওয়ার পরিণাম
যারা অদৃশ্যের খবর জানার দাবি করে (যেমন অনেক তান্ত্রিক বা কবিরাজ) বা জিনের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের কথা বলে, তাদের কাছে যাওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
দলীল:
রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
مَنْ أَتَى عَرَّافًا فَسَأَلَهُ عَنْ شَيْءٍ لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً
"যে ব্যক্তি কোনো গণক বা অতীন্দ্রিয়বাদীর (কবিরাজ/তান্ত্রিক) কাছে গেল এবং কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করল, তার ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না।"
(সহীহ মুসলিম: ২২৩০)
🟢যদি কেউ তাদের কথায় বিশ্বাস করে, তবে তার পরিণাম আরও ভয়াবহ:
مَنْ أَتَى كَاهِنًا أَوْ عَرَّافًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ
"যে ব্যক্তি কোনো গণক বা জ্যোতিষীর কাছে গেল এবং সে যা বলে তা বিশ্বাস করল, সে মুহাম্মাদ (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ দ্বীনের সাথে কুফরী করল।"
(মুসনাদে আহমাদ: ৯৫৩২, সহীহ আলবানী)
🟢যাদু দিয়ে যাদুর চিকিৎসা করা নিষিদ্ধ (নুশরাহ)
অনেকে মনে করেন যাদু কাটাতে জাদুকর বা তান্ত্রিকের কাছে যাওয়া জায়েজ। কিন্তু ইসলাম এটিকে শয়তানের কাজ হিসেবে গণ্য করেছে।
দলীল:
রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে 'নুশরাহ' (যাদুর মাধ্যমে যাদুর চিকিৎসা) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন:
هِيَ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ
"এটি শয়তানের কাজের অন্তর্ভুক্ত।"
(সুনানে আবু দাউদ: ৩৮৬৮)
✅বৈধ রুকইয়াহর শর্তাবলী:
🟢সাহাবীগণ রাসূল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে তারা জাহেলী যুগে কিছু ঝাড়ফুঁক করত, তা কি বৈধ? তখন রাসূল (সা.) একটি মূলনীতি বাতলে দেন।
দলীল:
اعْرِضُوا عَلَيَّ رُقَاكُمْ، لاَ بَأْسَ بِالرُّقَى مَا لَمْ يَكُنْ فِيهِ شِرْكٌ
"তোমরা তোমাদের ঝাড়ফুঁকের মন্ত্রগুলো আমার কাছে পেশ করো। ঝাড়ফুঁক করতে কোনো অসুবিধা নেই যতক্ষণ না তাতে শিরক থাকে।"
(সহীহ মুসলিম: ২২২০)
🟢কেন এই পদ্ধতিগুলো হারাম?
তন্ত্রমন্ত্র বা প্রচলিত ভুল কবিরাজিতে সাধারণত নিচের বিষয়গুলো থাকে যা শরীয়াহ বিরোধী:
গাইরুল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া: আল্লাহ ছাড়া জিন বা অন্য কোনো শক্তির দোহাই দিয়ে সাহায্য চাওয়া হয়, যা স্পষ্ট শিরক।
অস্পষ্ট ভাষা: এমন সব শব্দ বা মন্ত্র পড়া হয় যার অর্থ কেউ বোঝে না (এতে কুফরী কালাম থাকার সম্ভাবনা থাকে)।
শয়তানি আমল: অনেক তান্ত্রিক নাপাক বস্তু বা কুরআন অবমাননার মাধ্যমে শয়তানকে খুশি করে কাজ করতে চায়।
✅সঠিক সমাধান:
যদি কোনো ব্যক্তি জিন, যাদু, বদনজর বা প্যারানরমাল কোন সমস্যায় আক্রান্ত হন যা পার্থিব চিকিৎসায় আরোগ্য লাভ হয় না, তবে তাকে অবশ্যই শরীয়াহ সম্মত রুকইয়াহ করতে হবে। যা কেবল কুরআন তিলাওয়াত, সহীহ হাদীসের দুয়া এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রেখে করা হয়।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে শিরক ও কুফরী থেকে হিফাযত করুন। আমীন।
বদনজর (Evil Eye): যা মানুষকে কবরে পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে।
জাদু বা সিহর: মানুষের করা কুফরি কালামের প্রভাব নষ্ট করতে।
মানসিক প্রশান্তি: দুশ্চিন্তা, ভয় ও অনিদ্রা দূর করতে।
শারীরিক ব্যাধি: দীর্ঘমেয়াদী রোগ যা সাধারণ চিকিৎসায় সারছে না।
পোস্ট ২: হিজামা (কাপিং থেরাপি)
শিরোনাম: হিজামা: সুন্নাহ সম্মত এক বিস্ময়কর চিকিৎসা পদ্ধতি
সুস্থতা আল্লাহর এক বড় নেয়ামত। আর এই সুস্থতা বজায় রাখতে রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের শ্রেষ্ঠ যে চিকিৎসার কথা বলেছেন, তা হলো হিজামা।
১. হাদীসের আলোকে হিজামার গুরুত্ব
রাসূলুল্লাহ (সা.) হিজামাকে সর্বোত্তম চিকিৎসা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন:
إِنَّ أَمْثَلَ مَا تَدَاوَيْتُمْ بِهِ الْحِجَامَةُ
"তোমরা যেসব পদ্ধতিতে চিকিৎসা করো, তার মধ্যে হিজামা করাই হচ্ছে সর্বোত্তম।" (সহীহ বুখারী: ৫৬৯৬)
২. ফেরেশতাদের বিশেষ অসিয়ত
মিরাজ গমনের রাতে ফেরেশতারা নবীজিকে (সা.) উম্মতের জন্য হিজামার নির্দেশ দিতে অনুরোধ করেছিলেন:
مَا مَرَرْتُ بِمَلَأٍ مِنَ الْمَلَائِكَةِ لَيْلَةَ أُسْرِيَ بِي إِلَّا قَالُوا: يَا مُحَمَّدُ، مُرْ أُمَّتَكَ بِالْحِجَامَةِ
"মিরাজের রাতে আমি ফেরেশতাদের যে দলের পাশ দিয়েই গিয়েছি, তারা বলেছে— হে মুহাম্মদ! আপনি আপনার উম্মতকে হিজামা করার নির্দেশ দিন।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩৪৭৭)
৩. হিজামার অবিশ্বাস্য উপকারিতা
রক্ত পরিশোধন: শরীর থেকে বিষাক্ত ও দূষিত রক্ত (Toxins) বের করে দেয়।
ব্যথা উপশম: মাইগ্রেন, ঘাড়, কোমর ও হাঁটুর ব্যথায় দ্রুত কার্যকর।
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কার্যকারিতা: লিভার, কিডনি ও হৃদযন্ত্রের রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে।
সুন্নাহ পালন: রোগের নিয়ত ছাড়াও সুন্নাহ হিসেবে করলে সওয়াব ও শেফা উভয়ই হাসিল হয়।
৪. হিজামার বিশেষ সময়
হাদীসে আরবী মাসের ১৭, ১৯ এবং ২১ তারিখে হিজামা করাকে রোগের প্রতিষেধক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সতর্কবার্তা: রুকইয়াহ এবং হিজামা—উভয়ই অভিজ্ঞ এবং শরীয়াহ সচেতন ব্যক্তির মাধ্যমে করানো উচিত। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সুন্নাহ ভিত্তিক জীবন যাপনের তাওফীক দিন। আমীন।
#রুকইয়াহ #হিজামা #সুন্নাহ_চিকিৎসা