27/08/2026
১. শ্বসন কী?
শ্বসন (Respiration) হলো জীবদেহের কোষে খাদ্যদ্রব্য, বিশেষত গ্লুকোজ, জারিত বা ভেঙে শক্তি ATP (Adenosine Triphosphate) উৎপন্ন করার জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়া।
সহজভাবে:
গ্লুকোজ + O₂ → CO₂ + H₂O + ATP শক্তি
এই ATP দেহের চলন, বৃদ্ধি, কোষ বিভাজন, সক্রিয় পরিবহন, প্রোটিন সংশ্লেষণ ইত্যাদি কাজে ব্যবহৃত হয়।
২. শ্বাস-প্রশ্বাস ও শ্বসনের পার্থক্য
বিষয়
শ্বাস-প্রশ্বাস (Breathing)
শ্বসন (Respiration)
প্রকৃতি
শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া
জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়া
প্রধান কাজ
O₂ গ্রহণ ও CO₂ ত্যাগ
খাদ্য থেকে ATP উৎপাদন
স্থান
শ্বাসতন্ত্র
প্রধানত কোষে
প্রধান অঙ্গ/স্থান
নাক, ট্র্যাকিয়া, ফুসফুস
সাইটোপ্লাজম ও মাইটোকন্ড্রিয়া
ফলাফল
গ্যাসের আদান-প্রদান
শক্তি উৎপাদন
মনে রাখুন:
শ্বাস-প্রশ্বাস হলো বায়ু চলাচল, আর শ্বসন হলো কোষে শক্তি উৎপাদন।
৩. মানব শ্বসনতন্ত্রের প্রধান অঙ্গ
মানব শ্বসনতন্ত্রের প্রধান অংশগুলো হলো—
নাসারন্ধ্র ও নাসাগহ্বর
ফ্যারিংস (গলবিল)
ল্যারিংস (স্বরযন্ত্র)
ট্র্যাকিয়া (শ্বাসনালি)
ব্রঙ্কাস
ব্রঙ্কিওল
অ্যালভিওলাস
ফুসফুস
প্লুরা
ডায়াফ্রাম
শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত আন্তঃপাঁজরীয় পেশি
বায়ু চলাচলের পথ
নাসারন্ধ্র → নাসাগহ্বর → ফ্যারিংস → ল্যারিংস → ট্র্যাকিয়া → ব্রঙ্কাস → ব্রঙ্কিওল → অ্যালভিওলাস
৪. অঙ্গগুলোর কাজ
নাসাগহ্বর
বাতাস গ্রহণ করে।
নাসারোমের সাহায্যে ধূলিকণা আটকায়।
বাতাসকে উষ্ণ ও আর্দ্র করে।
ফ্যারিংস
নাক ও মুখ থেকে আসা বাতাসকে ল্যারিংসের দিকে নিয়ে যায়।
ল্যারিংস
বায়ু চলাচলের পথ।
এতে স্বরতন্ত্রী থাকে।
Epiglottis খাবারকে শ্বাসনালিতে প্রবেশ করতে বাধা দেয়।
ট্র্যাকিয়া
একটি নলাকার শ্বাসনালি। এর C-আকৃতির তরুণাস্থি-রিং নালিটিকে খোলা রাখতে সাহায্য করে।
ব্রঙ্কাস
ট্র্যাকিয়া ডান ও বাম দুটি প্রধান ব্রঙ্কাসে বিভক্ত হয়।
ব্রঙ্কিওল
ব্রঙ্কাসের ক্ষুদ্র শাখাগুলোকে ব্রঙ্কিওল বলা হয়।
অ্যালভিওলাস
অ্যালভিওলাস হলো ক্ষুদ্র বায়ুথলি। এখানেই প্রধানত O₂ ও CO₂-এর গ্যাসীয় বিনিময় ঘটে।
ফুসফুস
বক্ষগহ্বরে অবস্থিত দুটি প্রধান শ্বাসযন্ত্র। ডান ফুসফুস সাধারণত তিনটি এবং বাম ফুসফুস দুটি লোবে বিভক্ত।
ডায়াফ্রাম
ফুসফুসের নিচে অবস্থিত গম্বুজাকৃতির পেশি। শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
৫. শ্বাসগ্রহণ ও শ্বাসত্যাগ
শ্বাসক্রিয়ার দুটি প্রধান পর্যায়—
শ্বাসগ্রহণ (Inspiration)
শ্বাসত্যাগ (Expiration)
ক. শ্বাসগ্রহণ
শ্বাস গ্রহণের সময়—
ডায়াফ্রাম সংকুচিত হয়।
ডায়াফ্রাম নিচের দিকে নামে ও অপেক্ষাকৃত সমতল হয়।
বাহ্যিক আন্তঃপাঁজরীয় পেশি সংকুচিত হয়।
পাঁজর উপরে ও বাইরে ওঠে।
বক্ষগহ্বরের আয়তন বৃদ্ধি পায়।
ফুসফুসের অভ্যন্তরীণ চাপ কমে যায়।
বাইরের বায়ু ফুসফুসে প্রবেশ করে।
সূত্র:
বক্ষগহ্বরের আয়তন ↑ → ফুসফুসের চাপ ↓ → বাতাস ভিতরে প্রবেশ
খ. শ্বাসত্যাগ
স্বাভাবিক শ্বাসত্যাগে—
ডায়াফ্রাম শিথিল হয়।
এটি আবার গম্বুজাকৃতি ধারণ করে এবং উপরে ওঠে।
পাঁজর নিচে ও ভেতরের দিকে আসে।
বক্ষগহ্বরের আয়তন কমে যায়।
ফুসফুসের অভ্যন্তরীণ চাপ বৃদ্ধি পায়।
বাতাস ফুসফুস থেকে বাইরে বের হয়।
সূত্র:
বক্ষগহ্বরের আয়তন ↓ → ফুসফুসের চাপ ↑ → বাতাস বাইরে যায়
৬. অ্যালভিওলাসে গ্যাসের আদান-প্রদান
অ্যালভিওলাসের চারদিকে অসংখ্য রক্তকেশিকা বা capillary থাকে।
অ্যালভিওলাসের বায়ুতে O₂-এর আংশিক চাপ রক্তের তুলনায় বেশি। ফলে—
O₂ → অ্যালভিওলাস → রক্ত
অন্যদিকে রক্তে CO₂-এর আংশিক চাপ বেশি হওয়ায়—
CO₂ → রক্ত → অ্যালভিওলাস → নিঃশ্বাসের সঙ্গে বাইরে
এই গ্যাসীয় বিনিময় প্রধানত diffusion বা ব্যাপন প্রক্রিয়ায় ঘটে।
গ্যাস বিনিময় কার্যকর হওয়ার কারণ
অ্যালভিওলাস—
সংখ্যায় অনেক।
প্রাচীর অত্যন্ত পাতলা।
আর্দ্র।
প্রচুর রক্তকেশিকা দ্বারা পরিবেষ্টিত।
বিশাল মোট পৃষ্ঠতল সৃষ্টি করে।
৭. রক্তে O₂ ও CO₂ পরিবহন
অক্সিজেন পরিবহন
রক্তের অধিকাংশ O₂ হিমোগ্লোবিনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অক্সিহিমোগ্লোবিন হিসেবে পরিবাহিত হয়।
Hemoglobin + O₂ ⇌ Oxyhemoglobin
ফুসফুসে O₂ বেশি থাকায় হিমোগ্লোবিন O₂ গ্রহণ করে।
টিস্যুতে O₂-এর ঘনত্ব কম থাকায় হিমোগ্লোবিন থেকে O₂ মুক্ত হয়ে কোষে যায়।
কার্বন ডাই-অক্সাইড পরিবহন
CO₂ প্রধানত তিনভাবে পরিবাহিত হয়—
বাইকার্বোনেট আয়ন (HCO₃⁻) হিসেবে — প্রধান অংশ
কার্বামিনোহিমোগ্লোবিন হিসেবে
প্লাজমায় দ্রবীভূত অবস্থায়
৮. শ্বসন নিয়ন্ত্রণ
শ্বাসক্রিয়া প্রধানত মস্তিষ্কের medulla oblongata ও pons-এর শ্বাসকেন্দ্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
CO₂-এর ভূমিকা
রক্তে CO₂ বৃদ্ধি পেলে—
CO₂ ↑ → H⁺ ↑ → pH ↓ → শ্বাসের হার ও গভীরতা ↑
ফলে বেশি CO₂ শরীর থেকে বের হয়ে যায়।
রক্তে CO₂ কমে গেলে শ্বাসের উদ্দীপনা কমে যায়।
গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক
Medulla oblongata
Pons
Chemoreceptor
রক্তের CO₂ ও H⁺-এর পরিবর্তন
পরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: স্বাভাবিক শ্বাসক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে CO₂-এর পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্দীপক।
৯. কোষীয় শ্বসনের ধাপ
কোষীয় সবাত শ্বসনকে প্রধানত তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়—
১. Glycolysis
২. Krebs cycle
৩. Electron Transport Chain ও Oxidative Phosphorylation
১০. গ্লাইকোলাইসিস (Glycolysis)
স্থান: সাইটোপ্লাজম
একটি ৬-কার্বন গ্লুকোজ অণু ভেঙে দুটি ৩-কার্বন pyruvate তৈরি হয়।
সারাংশ:
Glucose → 2 Pyruvate + ATP + NADH
গ্লাইকোলাইসিসে সরাসরি মোট ৪ ATP তৈরি হলেও ২ ATP প্রাথমিকভাবে ব্যয় হয়।
তাই নিট ATP = ২।
এখানে NADH-ও উৎপন্ন হয়।
১১. পাইরুভেটের পরবর্তী পরিবর্তন
অক্সিজেন উপস্থিত থাকলে pyruvate মাইটোকন্ড্রিয়ায় প্রবেশ করে।
Pyruvate → Acetyl-CoA
এই পর্যায়ে—
CO₂ উৎপন্ন হয়
NADH উৎপন্ন হয়
Acetyl-CoA তৈরি হয়
Acetyl-CoA এরপর Krebs cycle-এ প্রবেশ করে।
১২. Krebs Cycle
স্থান: মাইটোকন্ড্রিয়ার matrix
Acetyl-CoA Krebs cycle-এ প্রবেশ করে ধারাবাহিক রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে জারিত হয়।
প্রতি glucose অণুর জন্য Krebs cycle থেকে মোটামুটি—
2 ATP/GTP
6 NADH
2 FADH₂
4 CO₂
উৎপন্ন হয়।
১৩. Electron Transport Chain বা ETC
স্থান: মাইটোকন্ড্রিয়ার অভ্যন্তরীণ ঝিল্লি
NADH ও FADH₂ তাদের উচ্চ-শক্তির ইলেকট্রন ETC-তে সরবরাহ করে।
ইলেকট্রনের প্রবাহের ফলে প্রোটন গ্রেডিয়েন্ট তৈরি হয়। ATP synthase এই গ্রেডিয়েন্ট ব্যবহার করে ATP উৎপন্ন করে।
শেষে O₂ হলো final electron acceptor এবং পানি তৈরি হয়।
O₂ + e⁻ + H⁺ → H₂O
এ পর্যায়েই অধিকাংশ ATP উৎপন্ন হয়।
১৪. সবাত শ্বসনের সামগ্রিক সমীকরণ
C₆H₁₂O₆ + 6O₂ → 6CO₂ + 6H₂O + শক্তি
একটি glucose অণু থেকে ইউক্যারিওটিক কোষে প্রচলিত আধুনিক হিসাব অনুযায়ী সাধারণত প্রায় ৩০–৩২ ATP ধরা হয়। পুরোনো HSC/পাঠ্যবইয়ে অনেক সময় ৩৬–৩৮ ATP উল্লেখ করা হয়—প্রশ্নে যে পাঠ্যবই বা সিলেবাসের হিসাব অনুসরণ করতে বলা হয়েছে, সেটিই ব্যবহার করা উচিত।
১৫. অবাত শ্বসন (Anaerobic Respiration)
অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে glucose সম্পূর্ণভাবে জারিত না হয়ে আংশিকভাবে ভাঙে।
ইস্টে
Glucose → Ethanol + CO₂ + অল্প ATP
এটি alcoholic fermentation।
পেশিকোষে
অক্সিজেনের ঘাটতিতে pyruvate থেকে lactic acid তৈরি হতে পারে।
Glucose → Lactic acid + অল্প ATP
১৬. সবাত ও অবাত শ্বসনের তুলনা
বৈশিষ্ট্য
সবাত শ্বসন
অবাত শ্বসন
O₂
প্রয়োজন
প্রয়োজন নেই
গ্লুকোজ
সম্পূর্ণ জারণ
আংশিক জারণ
ATP
বেশি
কম
শেষ উৎপাদ
CO₂ + H₂O
ল্যাকটিক অ্যাসিড বা অ্যালকোহল + CO₂
প্রধান স্থান
সাইটোপ্লাজম + মাইটোকন্ড্রিয়া
প্রধানত সাইটোপ্লাজম
১৭. শ্বসনের গুরুত্ব
শ্বসন থেকে উৎপন্ন ATP—
পেশির কাজ চালায়।
সক্রিয় পরিবহনে শক্তি দেয়।
কোষ বিভাজনে সাহায্য করে।
প্রোটিন ও অন্যান্য জৈব অণু তৈরিতে শক্তি দেয়।
বৃদ্ধি ও বিকাশে সাহায্য করে।
দেহের বিভিন্ন বিপাকীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে।
১৮. গুরুত্বপূর্ণ শ্বাসযন্ত্রের রোগ
অ্যাজমা (Asthma)
শ্বাসনালির সংকোচন ও প্রদাহের ফলে শ্বাসকষ্ট হতে পারে।
ব্রঙ্কাইটিস (Bronchitis)
ব্রঙ্কাসের প্রদাহ।
নিউমোনিয়া (Pneumonia)
ফুসফুসের সংক্রমণ; অ্যালভিওলাসে তরল জমতে পারে।
যক্ষ্মা (Tuberculosis)
ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রামক রোগ, যা প্রধানত ফুসফুসকে আক্রান্ত করতে পারে।
১৯. HSC পরীক্ষার জন্য এক নজরে
বায়ুর পথ:
নাসারন্ধ্র → নাসাগহ্বর → ফ্যারিংস → ল্যারিংস → ট্র্যাকিয়া → ব্রঙ্কাস → ব্রঙ্কিওল → অ্যালভিওলাস
গ্যাস বিনিময়ের স্থান:
➡️ অ্যালভিওলাস
O₂ পরিবহনের প্রধান মাধ্যম:
➡️ হিমোগ্লোবিন
CO₂ পরিবহনের প্রধান রূপ:
➡️ বাইকার্বোনেট (HCO₃⁻)
শ্বাসক্রিয়ার প্রধান পেশি:
➡️ ডায়াফ্রাম
শ্বাস নিয়ন্ত্রণের প্রধান কেন্দ্র:
➡️ Medulla oblongata ও Pons
Glycolysis-এর স্থান:
➡️ সাইটোপ্লাজম
Krebs cycle-এর স্থান:
➡️ মাইটোকন্ড্রিয়ার matrix
ETC-এর স্থান:
➡️ মাইটোকন্ড্রিয়ার inner membrane
ETC-এর শেষ ইলেকট্রন গ্রহণকারী:
➡️ O₂
শ্বসনের প্রধান শক্তি-মুদ্রা:
➡️ ATP
মনে রাখার সহজ সূত্র
“নাক → নালি → ব্রঙ্কাস → ব্রঙ্কিওল → অ্যালভিওলাস → রক্ত → কোষ”
এটাই বাতাসের পথ থেকে শুরু করে কোষে অক্সিজেন পৌঁছানোর মূল ধারাটি।