26/07/2026
সেকালের কথা একালের ছেলেপেলেরা আর শুনতে চায় না। এদের কাছে সেকালের কথাগুলো হাস্যকর মনে হয়।
আগে গ্রামগঞ্জের মানুষজন ঝড়-বাদলের দিনে দোয়া ইউনুস পাঠ করত, আর এখন ঝড়ের দিনে অধিকাংশ মানুষ বিছানায় শুয়ে শুয়ে আরামসে ইউটিউবে ভিডিও দেখে।
আগের দিনে গ্রামগুলোতে বিকেলবেলা চলত বৌচি, গোল্লাছুট, এক্কাদোক্কা, কানামাছি, ডাংগুলি, জাম্বুরার কচি ফল দিয়ে ক্রিকেট খেলা, পুতুল খেলা, ভাত-তরকারি খেলা প্রভৃতি।
এখন সভ্যতার উন্নয়নে প্রায় সবার হাতেই স্মার্টফোন। গুগল প্লে স্টোরের বদৌলতে মুহূর্তেই ডাউনলোড করা যায় হাজারো অ্যাপ। আজকাল কিশোর ও যুবক-যুবতীরা একা একাই গেম খেলে। তাদের আর কোনো খেলার সাথির প্রয়োজন পড়ে না। একসময় Clash of Clans, Candy Crush, Ludo King-সহ বিভিন্ন গেম জনপ্রিয় ছিল। এখন সেই জায়গা দখল করেছে PUBG, Free Fire-সহ আরও অসংখ্য অনলাইন গেম। দুঃখজনক হলেও সত্য, অল্প বয়সেই কেউ কেউ অনলাইন ক্যাসিনো ও জুয়ার মতো ভয়ংকর নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। এতে শুধু সময়ই নষ্ট হচ্ছে না, নষ্ট হচ্ছে মেধা, নৈতিকতা, পারিবারিক বন্ধন এবং অনেকের সুন্দর ভবিষ্যৎও।
আগে আমরা বিকেলবেলায় পাড়ার সবাই সদলবলে মাঠে বিভিন্ন খেলা খেলতাম, গ্রামের অনাবাদী বিস্তৃত জমির ওপর। তখন অনেকগুলো দল থাকত। কোনো দল খেলত গোল্লাছুট, কোনো দল ক্রিকেট, কোনো দল ফুটবল, আবার কোনো দল ডাংগুলি। মেয়েরা কোমরে ওড়না পেঁচিয়ে খেলত এক্কাদোক্কা কিংবা রশিলম্ফ।
তখন সকলের মাঝে সম্মানবোধ ছিল এবং ছিল সামাজিকতার নিবিড় বন্ধন। ঠিক সন্ধ্যা নামার আগেই বাড়ি থেকে মা-বাবা পড়ার জন্য ডাক দিতেন, আর আমরাও অনিচ্ছাসত্ত্বেও ঘরে ফিরে আসতাম।
গ্রামে আমরা যারা দামাল ছেলে ছিলাম, বিশেষ করে আমাদের একটি দল ছিল, যারা ছিলাম খুব ত্যাঁদড় ও বিটকেল টাইপের। আমরা বিকেলবেলায় পরিকল্পনা করতাম মিশনে যাওয়ার। মিশনগুলো ছিল নানা রকমের।
গ্রামে এখনকার তুলনায় আগে শেয়ালের অনেক প্রাদুর্ভাব ছিল। তন্মধ্যে খেঁকশিয়ালের তাণ্ডব ছিল অসহ্য রকমের। তারা সুযোগ পেলেই গৃহপালিত ছাগলের ছানা কিংবা শখের হাঁস-মুরগির ছানাদের ঘাড় মটকে নিয়ে যেত তাদের গর্তে।
বাড়ির পাশেই বিশাল বাগানে ছিল শেয়ালের সাম্রাজ্য। সেই সাম্রাজ্যে তাদের অসংখ্য গর্ত ছিল এবং একটি গর্তের সঙ্গে আরেকটি গর্তের সুগম যোগাযোগ ছিল।
যেদিন আমরা শেয়াল নিপাত মিশনে যাওয়ার পূর্বপরিকল্পনা করতাম, সেদিন বিকেলেই আমরা ঠিক করতাম কে কী সরঞ্জাম আনবে। কাউকে কোদাল, কাউকে কুলা, কাউকে শুকনো মরিচ, কাউকে জাল, কাউকে ম্যাচ বা দিয়াশলাই, কাউকে লাঠি, কাউকে রশি এবং কাউকে টর্চলাইট আনতে বলা হতো।
সন্ধ্যাবেলা বই পড়ার ফাঁকে আমরা সবাই চুপটি করে বাড়ি থেকে বের হয়ে পূর্বনির্ধারিত স্থানে যার যার সরঞ্জাম নিয়ে হাজির হতাম। সবাই উৎসাহ নিয়ে শেয়াল ধরার সফলতার বিষয়ে আলোচনা করতাম।
মিশন স্পট, অর্থাৎ শেয়ালের সাম্রাজ্যের কাছে গিয়ে সবাই চুপ হয়ে যেতাম। কখনো কখনো পথিমধ্যে দু-একটি খেঁকশিয়ালের সঙ্গে দেখা হতো। তারাও ছিল বেশ পাজি। আমাদের দেখে তারা দৌড় মারত, আবার থেমে পিছন ফিরে তাকাত। আমরাও তাদের ধরার জন্য মরিয়া হয়ে ছুটতাম।
দৌড়াতে দৌড়াতে নদীর পাড়ে গিয়ে শেয়াল চোখের নিমিষে হাওয়া হয়ে যেত। তারপর আবার ফিরে এসে তাদের প্রায় সব গর্তের মুখ বন্ধ করে দিতাম, শুধু দুটি গর্ত খোলা রাখতাম।
একটি গর্তের মুখে শুকনো ডালপালা ও পাতা দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে তাতে শুকনো মরিচ দিতাম। তারপর আগুন নিভিয়ে কুলা দিয়ে লঙ্কাগুঁড়া মিশ্রিত ধোঁয়া গর্তের ভেতরে প্রবেশ করানো হতো। অন্য গর্তের মুখে জাল পেতে কয়েকজন লাঠি হাতে অপেক্ষা করতাম। একটাই লক্ষ্য—ধোঁয়া ও মরিচের তীব্র গন্ধ সহ্য করতে না পেরে যখন শেয়াল বের হবে, তখন সে জালে আটকা পড়বে, আর আমরা ঝাঁপিয়ে পড়ব।
কিন্তু বাস্তবে যা হতো, গর্ত থেকে ধোঁয়া ঠিকই বের হতো, শেয়াল আর বের হতো না। ম্যাচ শেষ হয়ে যেত, জ্বালানি ফুরিয়ে যেত, রাত গভীর থেকে গভীরতর হতো, কিন্তু শেয়ালের কোনো হদিস মিলত না।
শেষ পর্যন্ত সবাই ভগ্নহৃদয়ে সিদ্ধান্ত নিতাম—"আজ মনে হয় আগেই টের পেয়েছে শিয়ালেরা। আরেকদিন আবার আসব।"
অনেক বছর পেরিয়ে গেছে। সেই দিনগুলো আর নেই। সেই বন্ধুরাও আর গ্রামে থাকে না। অনেক দিন হলো অনেকের সঙ্গে দেখা হয় না।
নেই তখনকার জোনাকিরা, যারা সন্ধ্যাবেলায় ঝিকিমিকি আলো দিত। ঝিঁঝিঁ পোকা, হুতুম পেঁচা আর বাদুড়ের দেখা মেলে না শহরের আকাশে।
তবু আজও হৃদয়ে দোলা দেয় সেই মুহূর্তগুলো। চোখে ভেসে ওঠে সেই স্মৃতিগুচ্ছ। আজও কানে বাজে শেয়ালের খেক খেক ডাক আর বাল্যবন্ধুদের সেই চিৎকার—
"আরও জোরে কুলা হাঁকা!"
---
Md. Sarwar Hossen (Sahide Sarwar)
Founder: মুমিন মুসলমান ইউনানী দাওয়াখানা
Poetry Writer | Jinn & Paranormal Researcher
At: মুমিন মুসলমান
লেখা: ২৮ জানুয়ারি, ২০১৯ (হালনাগাদ সংস্করণ)
ছবি প্রতীকী। ছবিতে আমার দ্বিতীয় ছেলে, জুনায়েদ বিন সারোয়ার।