19/04/2026
এক রোগীর ১২/১৩ দিন যাবত জ্বর। মুখের এন্টিবায়োটিক দুই দফা সেবন করলেন, কমে না। জ্বরের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ব্লাড কালচার, ইউরিন কালচার, বুকের এক্স-রে সব টেস্ট নরমাল। ইনফেকসনের কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
বললাম যে এটা Typhoid fever, until proven otherwise. অনেক ক্ষেত্রেই টাইফয়েড রোগীদের টেস্ট করে কিছুই পাওয়া যায় না। কেননা মেডিকেল সাইন্সে অনেক ফ্যালাসি। রক্ত থেকে কালচার করলে উন্নত বিশ্বেই ১০০ জন রোগীর মধ্যে ৪০-৬০ জনের টাইফয়েডের জীবাণু(Salmonella typhi) ধরা পড়ে(৪০%-৬০%), বাকি দের শরীরে জীবাণু থাকা সত্ত্বেও ব্লাড কালচারে ধরা পড়ে না। কষ্টকর পরীক্ষা হাঁড়ের অস্থিমজ্জা থেকে যদি কালচার করা হয় তবে প্রায় ৮০% রোগীর ক্ষেত্রে জীবাণু ধরা পড়তে পারে। আর এন্ডোস্কোপি করে খাদ্যনালীর সিক্রেসন কালেক্ট করে সেখান থেকে যদি কালচার করা হয় তবে জীবাণু ধরা পড়ার সম্ভাবনা আরেকটু বাড়ে।
আর যদি ব্লাড কালচার + হাঁড়ের অস্থিমজ্জা কালচার + খাদ্যনালীর সিক্রেসন কালচার সব একসাথে করা হয় তাহলে ৯০% পর্যন্ত জীবাণু ধরা পড়ার সম্ভাবনা থাকবে। অর্থাৎ মশা মারতে কামান দাগিয়ে ফেলবেন, তারপরেও ১০% ব্যর্থতা থেকে যাবে। সুতরাং সব ধরনের কালচার করেও প্রায় ১০% রোগীর ক্ষেত্রে শরীরে টাইফেয়েডর জীবাণু থাকা সত্ত্বেও ধরা সম্ভব হবে না। তাও এটা হল উন্নত বিশ্বের বই পত্রের কথা (Ref: Harrison 22nd), আমাদের দেশের ক্ষেত্রে তো বলাই বাহুল্য!
প্রথমদিকে যতই বুঝিয়ে বলি, উনাদের ঘুরেফিরে এক কথা, রিপোর্টে তো কিছু ধরা পড়লো না। যাই হোক, শেষমেষ কথা শুনলেন। টাইফয়েডের চিকিৎসা নিয়ে এখন ভালো আছেন আলহামদুলিল্লাহ।
আরেক রোগী কে টাইফেয়ডের চিকিৎসা দিলাম। কিন্তু জ্বর তো কমে না। বললাম, টাইফয়েডের ইনজেকসন শুরু করার পরেও ৫ দিন সময় লাগতে পারে জ্বর ছাড়তে। এটা নিজের বানানো নয়, বই পত্রের কথা।
তারপরেও অধৈর্য্য হয়ে যাচ্ছেন রোগী। আল্লাহ রহম করেছেন শেষমেষ ৬ দিনের মাথায় জ্বর ছেড়েছে। এমনকি আরো অদ্ভূত ভয়ংকর বিষয় হল, ধরুন একজন টাইফয়েড এর রোগীর ব্লাড কালচার করার পর জীবাণু ধরা পড়লো এবং উনার শরীরে প্রবেশ করা জীবাণুর বিরুদ্ধে যে এন্টিবায়োটিক কার্যকরী, কালচার সেনসিটিভি রিপোর্ট অনুযায়ী আপনি সেই এন্টিবায়োটিক টাই দিলেন,, রোগীও সঠিক ডোজে ঠিকঠাক এন্টিবায়োটিক ইনজেকসন নিলেন, তারপরেও সেই রোগীর ক্ষেত্রে টাইফয়েড জনিত কমপ্লিকেসন হবার ঝুঁকি আছে, এমনকি জ্বর কিছুদিন ভালো থেকে আবার ফিরে আসার সম্ভাবনা আছে(Recrudescence), এমনকি সেই রোগী টাইফয়েডের একজন ক্যারিয়ার হয়ে আরো অনেক মানুষ কে টাইয়েডের জীবাণু ছড়িয়ে বেড়াতে পারেন,, যদিও উনি সম্পূর্ণ সঠিক চিকিৎসা সঠিক ডোজে দেয়া হয়েছে। (Ref: Davidson 24th)
এরকম সিচুয়েশনে অনেক সময় রোগীরা আস্থা হারিয়ে ফেলেন, অনেক সময় রোগ ধরার ব্যর্থতা বা, ব্যর্থ চিকিৎসার অভিযোগ তুলতে পারেন এরকম ফ্যালাসির কারণে।
আবার অনেক সময় কিছু মানুষ আছেন যাঁরা সবকিছু নিজেরা জাজ করে তারপর ডিসিশন নিতে চান। কিন্তু মেডিকেল সাইন্সে সবসময় ২+২=৪ হয় না, কিন্তু তাঁরা ২+২=৪ এর মত ক্লিয়ার কাট হিসেব চান বলে বোঝানো কঠিন হয়ে যায়। মনে রাখতে হবে, মানুষ হল পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় জীব, স্রষ্টার সবচেয়ে বিশ্বয়কর সৃষ্টি। একই রোগ ১০ জন মানুষে ১০ রকম ভাবে প্রেজেন্ট করে, একই ঔষধে ১০ রকম ভাবে রিএক্ট করে, তার উপর মেডিকেল সাইন্সে আছে অনেক ফ্যালাসি যেগুলো সবসময় বুঝিয়ে বলা কঠিন!
সেদিনও একজন রোগীকে টাইফয়েডের চিকিৎসা দিলাম। তার আগে ব্লাড কালচার করতে দিলাম এবং বলে + লিখে দিলাম যে, সেনসেটিভিটি ৪০-৬০% উন্নত বিশ্বে। বুঝিয়ে বললাম যে, পুকুরে মাছ আছে কিন্তু আপনি বর্শি ফেললে মাছ নাও আসতে পারে,, তার মানে কিন্তু এই নয় যে - "পুকুরে মাছ নেই"! সুতরাং ব্লাড কালচারে টাইফয়েডের জীবাণু নাও আসতে পারে। অন্যথায় কালচার নেগেটিভ আসলে এই রোগী ভেবে বসবেন যে তিনি ভুল চিকিৎসার শিকার হয়েছেন, টাইফয়েড না থাকা সত্ত্বেও টাইফয়েডের চিকিৎসা পেয়েছেন!
প্রেসক্রিপসনে এটাও লিখে রাখলাম যে, ইনজেকসন শুরু করার পরেও জ্বর কমতে ৫ দিন সময় লাগতে পারে। না কমলে তখন অন্য ব্যবস্থা নিতে হবে মুখে বলে দিলাম। তারপরেও শংকায় থাকতে হয়, জ্বরের কারণের শেষ নেই। আমরা প্রথমদিকে কমন কারণ গুলো চিন্তা করি, সেগুলো এক্সক্লুড করতে টেস্ট দেই, সেগুলো মাথায় রেখে চিকিৎসা করি। কিন্তু রিলেটিভলি রেয়ার ডিজিজ হলে ফলোআপ করে স্টেপ বাই স্টেপ আগাতে হয়। কিন্তু রোগীরা ধৈর্য্য রাখতে পারেন না। বার বার ডাক্তার পরিবর্তন করেন।
সময়ের সাথে অনেক টেস্ট করা হয়, অনেক ট্রিটমেন্ট ট্রাই করা হয়, অনেক রোগ এক্সক্লুড হয়ে যায়... টাইম ল্যাপস এর এই বেনেফিট টা শেষ চিকিৎসক পান। পরবর্তী সম্ভাব্য রেয়ার ডিজিজ চিন্তা করতে সুবিধা হয়। এজন্যই উপজেলা লেভেলের রোগীদের কাছে জেলা লেভেলের ডাক্তাররা বেশি ভালো মনে হয়, জেলা লেভেলের রোগীদের কাছে বিভাগীয় লেভেল, বিভাগীয় লেভেলের কাছে ন্যাশনাল লেভেল, এরপর পার্শ্ববর্তী দেশ, এরপর দূরবর্তী দেশ। এক রেয়ার ডিজিজের রোগী এরকম বাংলাদেশ, ভারত শেষ করে সিংগাপুর যাবার পর রোগ ধরা পড়ে। এক রোগী উপজেলা থেকে ২ মাসের জ্বর নিয়ে পিজি তে ভর্তি হয়। পিজি তে ভর্তি হওয়ার পরেই তার মুখে এমন Rash দেখা দেয়, যেটা দেখলে উপজেলার ডাক্তারও বলে দিতে পারবেন যে এটা কী রোগ! এজন্যই মেডিকেল সাইন্সে বলা হয়- Third Doctor is the Best Doctor.
কপি পোস্ট.