05/10/2026
তখন আমি ইন্টার্ন ডাক্তার। সদ্য এমবিবিএস পাশ করেছি। ডিউটিতে আছি।
সিস্টার বললো, পাঁচ নম্বর কেবিনে একটা পেশেন্ট ভর্তি হয়েছে। পেট ব্যাথায় ছটফট করছে।
আমি পেশেন্ট রিসিভ করতে পাঁচ নম্বর কেবিনে গেলাম।
: মা.. আমি ডা. সাদিক। আপনার কি সমস্যা.. কোথায় ব্যাথা করছে.. সবকিছু আমাকে খুলে বলুন।।
মেয়েটি ব্যাথায় কাতরাচ্ছে। কান্না থামিয়ে কটমট করে আমার দিকে তাকালো। মেয়েটির চোখের দিকে তাকিয়ে আমি কিছুটা অপ্রস্তুত হলাম।
: আমাকে কি আপনার মায়ের বয়সী মনে হচ্ছে??
: সরি.. তা মনে হবে কেন??.. আমরা সব মহিলা পেশেন্টকেই মা বলে ডাকি।।
: আমাকে কি মহিলা মনে হচ্ছে??
: আপনাকে মহিলা ঠিক না.. তবে ইয়াং মহিলা মনে হচ্ছে।
: আপনি কি স্টুডেন্ট না ডাক্তার??
: আমি ডাক্তার।
: ও তাই বলুন.. আমি ভাবছিলাম স্টুডেন্ট।
মেয়েটি আবার পেট ধরে সামনের দিকে ঝুঁকে থাকলো। ব্যাথায় কাতরানো শুরু করলো। মেয়েটির সাথে তার মা ও কাঁদছে।
মেয়েটির মা বললেন, প্লিজ আমার মেয়ের জন্য আপনারা কিছু একটা করেন.. প্রয়োজনে আপনাদের বড় স্যারকে ডাকুন।
মেয়েটিকে দেখে একুশ বাইশ বছরের তরুণী মনে হচ্ছে। সম্ভবত ভার্সিটিতে পড়াশোনা করে। মেয়েটির উপর আমার একরকমের রাগই হচ্ছে। নন কোওপারেটিভ একটা পেশেন্ট। যাহোক ডাক্তারদের কখনও রুগীর উপর রাগ করতে হয় না।।
ধৈর্য্য নিয়ে আবার মেয়েটিকে বললাম,
মা.. আপনার কোথায় ব্যাথা করছে .. যদি আমাকে একটু খুলে বলতেন..
মেয়েটি আবার চোখ রাঙিয়ে আমার দিকে তাকালো।
: আপনি আমাকে আবার মা বলে ডাকছেন !!.. আপনাকে আমি কিছুই বলবো না.. আপনি যান..
মেয়েরটির মা আমাকে কিছুটা অনুনয়ের সুরে বললেন,
বাবা.. তুমি ওর কথায় কিছু মনে করো না.. তোমাদের বড় স্যারকে যদি আসতে বলতে..
আমি ওয়ার্ড থেকে সোজা এসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রারের রুমে গেলাম। ওখানে রুহুল ভাই বসে আছেন। নিজেকে অপমানিত মনে হচ্ছে।
: কি খবর সাদিক.. কেমন আছো??
: ভালো নেই রুহুল ভাই.. মেজাজ খারাপ.. পাঁচ নম্বর কেবিনে একটা পেশেন্ট আসছে.. পেশেন্ট খুবই নন কোওপারেটিভ ..
: কেন.. কি হয়েছে??
: তাকে মা বলে ডেকেছি বলে ভীষন মাইন্ড করেছেন... মা বলে ডাকবো নাতো কি বউ বলে ডাকবো??
রুহুল ভাই বেশ শব্দ করে হেসে উঠলো। ঘটনাটি শুনে তাকে বেশ উৎফুল্ল ও চাংগা মনে হচ্ছে। রুহুল ভাইয়ের মুখে লম্বা দাড়ি। পরহেজগার একজন মানুষ। শুশ্রূমন্ডিত রুহুল ভাইকে দেখতে কিছুটা বড় প্রফেসরদের মতই লাগে।
: মেয়েটির কি সমস্যা??
: আমাকে তো কিছুই বলছে না.. শুধু দেখলাম পেট ব্যাথায় ছটফট করছে।
: চলো যাই দেখে আসি তোমার নন কোওপারেটিভ পেশেন্ট..
আমি রুহুল ভাইয়ের পিছে পিছে পাঁচ নম্বর কেবিনে গেলাম। দেখলাম তখনও মেয়েটি ব্যাথায় ছটফট করছে। সামনের দিকে কুঁকড়ে আছে। তার দুচোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। মেয়েটিকে দেখে হঠাৎ করে খুব মায়া হতে শুরু করলো। যদিও মায়া হবার মত কোন কারন আমি খুঁজে পাচ্ছি না।
রুহুল ভাই বললো, মা.. আপনার কি সমস্যা হচ্ছে সবকিছু আমাকে খুলে বলেন।
এবার দেখলাম লক্ষী মেয়ের মত মেয়েটি রুহুল ভাইকে সবকিছু গড়গড় করে খুলে বলছে।
মেয়ের মাকে দেখে মনে হলো উনি কিছুটা সন্তুষ্ট। সম্ভবত রুহুল ভাইকে বড় কোন প্রফেসর ভাবছেন।
রুহুল ভাই মেয়েটিকে বললো,
আপনি শুয়ে পড়ুন.. আপনার পেটে হাত দিয়ে পরীক্ষা করা লাগবে.. ব্যাথার কারন খুঁজতে হবে।
এবার রুহুল ভাই ইচ্ছে করে আমাকে বললো, সাদিক.. এক্সিমিন দ্য এবডোমেন।।
আমি মেয়েটির কাছে এগিয়ে গেলাম।
মেয়েটিকে বললাম, মা.. আমি আপনার পেট পরীক্ষা করবো।
মেয়েটি আগের মত একইভাবে কটমট করে আমার দিকে তাকাচ্ছে।
মেয়েটি রুহুল ভাই কে বলল, প্লিজ আপনি পরীক্ষা করুন।
রুহুল ভাই এবার শক্তপোক্ত করে বলে উঠলো,
সরি.. উনি একজন ডাক্তার.. আপনারা যদি কোওপারেট না করেন আমরা এখান থেকে চলে যেতে বাধ্য হবো.. আর একটা কথা শুনে রাখুন.. গেদা বাচ্চা থেকে শুরু করে একশো বছরের বুড়ো বুড়ী সবাইকে আমরা বাবা মা বলেই সম্বোধন করি.. আমাদের কে এভাবেই শেখানো হয়।।
মেয়েটি পরীক্ষা করাতে রাজী হলো।
যতটুকু সম্ভব আমার জ্ঞান বুদ্ধি খরচ করে তার পেট পরীক্ষা সম্পন্ন করলাম।
পরীক্ষা শেষে ইচ্ছে করে মেয়েটিকে বললাম, মা.. আপনাকে ধন্যবাদ।।
যাহোক সব ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে মেয়েটির Acute Pancreatitis ধরা পড়লো। ইমিডিয়েটলি সব ধরনের চিকিৎসা শুরু করা হলো।
এরপর প্রতিদিন রাউন্ডের সময় প্রফেসর স্যার ও রুহুল ভাইয়ের সাথে মেয়েটিকে দেখতে যাই। মেয়েটি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে। ব্যাথা আগের চেয়ে কমতে শুরু করেছে। মেয়েটির দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠা দেখে আমার মধ্যে এক ধরনের ভালোলাগা কাজ করে। সম্ভবত এটাকে ডাক্তার পেশেন্ট রিলেশনশিপ বলে। অন্যকিছু নয়।।
রাউন্ডের সময় প্রতিদিন মেয়েটি বাঁকা চোখে আমার দিকে তাকায়। আমি পাত্তা দিই না। কিছুটা ভাব নিয়ে থাকি। মেয়েটি মিটমিট করে হাসে।
সাতদিন পর মেয়েটি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠে। রাউন্ডের সময় স্যার ডিসচার্জ দিতে বললেন। ইন্টার্ন রুমে এসে মেয়েটির ডিসচার্জ পেপার লিখলাম। ভাবলাম ডিসচার্জ কাগজটি আমি নিজ হাতে মেয়েটির কেবিনে দিয়ে আসবো এবং প্ল্যান করলাম তাকে একটু চমকে দিব।
বেলা বারোটার দিকে মেয়েটির কেবিনে ঢুকলাম। মেয়েটি আমাকে দেখে মিষ্টি একটা হাসি দিল। মেয়েটির মাকে সালাম দিলাম। একটা চেয়ারে মেয়েটির ছোট ভাই বসে আছে। দেখলাম সবাই বেশ খুশি।
মেয়েটির মা আমাকে উদ্দেশ্য করে বললো, তোমরা আমার মেয়েটির জন্য অনেককিছু করেছো.. তোমাদের এই ঋণ শোধ করতে পারবো না.. তোমাদের জন্য প্রান খুলে দোয়া করছি।
আমি ভদ্রমহিলাকে উনার কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য ধন্যবাদ দিলাম।
এবার চমকে দেবার জন্য মেয়েটির কাছাকাছি গেলাম.. ইচ্ছে করে বললাম,
মা.. এখন আপনি কেমন আছেন??.. নিশ্চয় অনেক ভালো..!!!
মুহুর্তের মধ্যে মেয়েটি আমাকে বললো,
আব্বা.. আলহামদুলিল্লাহ আমি ভালো আছি.. আপনি ভালো আছেন আব্বা??.. আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ আব্বা..!!!
মেয়েটি হাসছে.. রহস্যময় এক হাসি।।
মেয়েটির আব্বা ডাক শুনে আমি উল্টো চমকিত হয়ে কেবিন থেকে দ্রুত বের হয়ে আসলাম।।
# ইন্টার্ন ডাক্তার ফ্যাক্ট #
______
ডা. জহির সাদিক