27/05/2026
তাকবিরে তাশরিক: সূচনা, হুকুম ও মাসায়েল
---------------------------------------------
আইয়ামে তাশরিকের নামকরণ:
“তাশরিক” আরবি শব্দ। এর অর্থ হলো আলোকিত হওয়া বা রৌদ্রে শুকানো। ইসলামের পূর্বযুগে মুশরিকরা সূর্যোদয়ের আগে মুযদালিফা থেকে রওয়ানা হতো না। তারা বলত—
“হে সাবির পাহাড়! তুমি আলোকিত হও, যাতে আমরা রওয়ানা হতে পারি।”
এ কারণেই ঐ দিনগুলোকে “ইয়াওমে তাশরিক” বলা হতো।
আরেক ব্যাখ্যায় বলা হয়, “তাশরিক” অর্থ গোশত রৌদ্রে শুকানো। কুরবানির গোশত এ দিনগুলোতে শুকানো হতো বলে এ দিনগুলোকে “আইয়ামে তাশরিক” বলা হয়।
তাকবিরে তাশরিকের নির্দেশনা:
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন—
وَاذْكُرُوا اللَّهَ فِي أَيَّامٍ مَعْدُودَاتٍ
“তোমরা নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহকে স্মরণ কর।”
— (সূরা আল-বাকারাহ: ২০৩)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, এখানে “নির্দিষ্ট দিন” বলতে আইয়ামে তাশরিককে বোঝানো হয়েছে। — তাফসিরে ইবনে কাসির
এছাড়াও বহু সাহাবি ও তাবেঈ থেকে প্রমাণিত আছে যে, তারা জিলহজের ৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত তাকবির পাঠ করতেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন—
হযরত উমর (রা.)
হযরত আলী (রা.)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)
ইমাম যুহরী (রহ.)
ইমাম মাকহুল (রহ.)
ইমাম সুফিয়ান সাওরী (রহ.) প্রমুখ।
তাকবিরে তাশরিকের সূচনা:
আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ফাতহুল কাদীর-এ বর্ণনা করেন—
যখন হযরত ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর নির্দেশে তাঁর প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ.)-কে কুরবানি করার পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করেন, তখন আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশে হযরত জিবরাইল (আ.) জান্নাত থেকে একটি দুম্বা নিয়ে আসেন।
তিনি আশঙ্কা করছিলেন, হয়তো তিনি পৌঁছানোর আগেই ইবরাহিম (আ.) কুরবানির কাজ সম্পন্ন করে ফেলবেন। তাই তিনি আকাশ থেকেই উচ্চস্বরে বলতে লাগলেন—
“اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ”
হযরত ইবরাহিম (আ.) এ আওয়াজ শুনে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, জিবরাইল (আ.) ইসমাঈল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা নিয়ে আসছেন। তখন তিনি বলে উঠলেন—
“لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ”
অতঃপর হযরত ইসমাঈল (আ.) বললেন—
“اللَّهُ أَكْبَرُ وَلِلَّهِ الْحَمْدُ”
এই বরকতময় কালামসমূহই পরবর্তীতে “তাকবিরে তাশরিক” নামে মুসলিম উম্মাহর জন্য কিয়ামত পর্যন্ত স্মরণীয় আমল হয়ে থাকে।
তাকবিরে তাশরিকের বাক্য:
اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ وَلِلَّهِ الْحَمْدُ.
উচ্চারণঃ
আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।
তাকবিরে তাশরিকের সময়কাল:
জিলহজ মাসের ৯ তারিখ ফজর নামাজ থেকে শুরু করে ১৩ তারিখ আসর নামাজ পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর তাকবিরে তাশরিক পড়তে হয়।
জামাতে আদায়কৃত ফরজ নামাজের পর একবার তাকবির বলা ওয়াজিব।
তিনবার বলা মুস্তাহাব।
পুরুষরা উচ্চস্বরে বলবে।
মহিলারা নিম্নস্বরে বলবে।
তাকবিরে তাশরিক সংক্রান্ত মাসআলা:
১. মুকিম (অমুসাফির) পুরুষ যদি জামাতের সাথে ফরজ নামাজ আদায় করে, তবে তার উপর তাকবিরে তাশরিক বলা ওয়াজিব।
২. যদি ইমাম তাকবির বলতে ভুলে যান, তবুও মুক্তাদিদের উপর তাকবির বলা ওয়াজিব থাকবে।
৩. একাকী নামাজ আদায়কারী
যে ব্যক্তি একাকী ফরজ নামাজ আদায় করে, তার জন্য তাকবিরে তাশরিক বলা ওয়াজিব নয়; বরং মুস্তাহাব।
৪. জুমু‘আর নামাজের পরও তাকবিরে তাশরিক বলা ওয়াজিব।
এছাড়া ঈদুল আযহার নামাজের পরও তাকবির বলা হবে।
৫. মাসবুকের হুকুম: যার এক বা একাধিক রাকাত ছুটে গেছে (মাসবুক), তার উপরও তাকবির ওয়াজিব।
সে নিজের বাকি নামাজ পূর্ণ করার পর তাকবির বলবে।
৬. নফল, সুন্নাত ও বিতর নামাজের পর তাকবিরে তাশরিক বলা ওয়াজিব নয়।
৭. কোনো মুকিম ব্যক্তি যদি মুসাফির ইমামের পিছনে নামাজ পড়ে, তবুও তার উপর তাকবিরে তাশরিক বলা ওয়াজিব থাকবে; যদিও মুসাফির ইমামের জন্য তা ওয়াজিব নয়।
৮. মুসাফিরের উপর তাকবিরে তাশরিক ওয়াজিব নয়; বরং মুস্তাহাব।
তবে যদি সে মুকিম ইমামের পিছনে নামাজ পড়ে, তাহলে তাকবির বলতে হবে।
৯. মহিলাদের হুকুম: মহিলাদের জন্য তাকবিরে তাশরিক ওয়াজিব নয়; বরং মুস্তাহাব।
কারণ নারীদের জন্য জামাত আবশ্যক বা অধিক পছন্দনীয় নয়। তাই নারীদের জামাতের পরও তাকবিরে তাশরিক ওয়াজিব হয় না।