02/06/2026
(রাত তখন আড়াইটে। চারদিক নিস্তব্ধ, কিন্তু মীরা দেবীর চোখে ঘুম নেই। কয়েক মাস ধরেই ডান হাতের বুড়ো আঙুল থেকে মাঝের আঙুল পর্যন্ত একটা অস্বস্তিকর ঝিনঝিন হচ্ছিল, কিন্তু আজ যেন সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
🎯পরদিন সকালে মীরা দেবী ক্লিনিকে ঢুকেই হতাশ গলায় বললেন—
"ডাক্তারবাবু, কাল তো পুরো রাত ঘুমোইনি। ডান হাতটা যা ঝিনঝিন করছে কী বলব! কিছু দিন ধরেই করছিল, কিন্তু আসব আসব করে আর আসাই হলো না..."
👨🏻⚕️আমি হাসিমুখে বললাম, "আসুন, বসুন মীরা দেবী। একদম চিন্তা করবেন না, আগে দেখি ব্যাপারটা কী।" আমি তাঁকে চেয়ারে বসিয়ে বললাম, "মীরা দেবী, আপনার হাত দুটোকে উল্টো করে নমস্কার করার মতো করে একে অপরের পিঠের সঙ্গে ঠেকিয়ে রাখুন তো।" (চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে আমরা বলি Phalen's Test)।
👵🏼মীরা দেবী হাত দুটো মেলালেন, কিন্তু এক মিনিট তো দূরের কথা, ৩০ সেকেন্ড যেতে না যেতেই হাত দুটো সরিয়ে নিলেন। চোখে-মুখে যন্ত্রণার ছাপ, বললেন— "আর পারছি না ডাক্তারবাবু! পুরো হাতটা যেন ভারি হয়ে আসছে, ঝিনঝিনটা সাঙ্ঘাতিক বেড়ে গেল!"
👨🏻⚕️আমি বললাম, "মীরা দেবী, রোগ একদম পরিষ্কার। একে আমরা বলি কার্পাল টানেল সিনড্রোম (Carpal Tunnel Syndrome)।"
👵🏼মীরা দেবী অবাক হয়ে বললেন, "অ্যাঁ! কী সিনড্রোম বললেন? নামটা তো বেশ খটমটো!"
👨🏻⚕️আমি সহজ করে বুঝিয়ে বললাম, "দেখুন মীরা দেবী, আমাদের কবজির ভেতরে আড়াআড়ি একটা লিগামেন্টের ব্যান্ড থাকে, ঠিক যেন একটা সুড়ঙ্গের ছাদ। আর সেই সুড়ঙ্গ বা টানেলের ভেতর দিয়ে হাড় আর টেন্ডনের মাঝখান দিয়ে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ু যায়, যার নাম মিডিয়ান নার্ভ (Median Nerve)।
✍🏻সহজভাবে ভাবুন, একটা সরু গলি দিয়ে অনেক লোক যাতায়াত করছে। যদি হঠাৎ গলির দেওয়ালগুলো ফুলে ওঠে বা ওপরের ছাদটা নিচু হয়ে যায়, তবে ভেতরের লোকগুলোর যাতায়াতে চাপ পড়বে না? এই নার্ভটার ওপর চাপ পড়লে ঠিক সেটাই হয়। আর তার ফলেই আপনার ওই আঙুলগুলোতে ব্যথা আর ঝিনঝিন হচ্ছে।"
👵🏼মীরা দেবী উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "ডাক্তারবাবু, এমন কেন হয়? আর কত জনেরই বা হয় এমন রোগ?"
আমি বললাম, "আপনার মনে আছে, আপনি যে সারা বছর ওই সেলাইয়ের কাজটা করেন? ওই যে কবজিটা বারবার একই ভঙ্গিতে ভাঁজ হয়, ওটার জন্যই সুড়ঙ্গটার ভেতর চাপ বেড়েছে। পরিসংখ্যান বলে, প্রতি ১০০ জনের মধ্যে অন্তত ৩ থেকে ৫ জন এই সমস্যায় ভোগেন। বিশেষ করে মধ্যবয়সী মহিলাদের মধ্যে এটা খুব সাধারণ।
🩺তবে শুধু কাজ নয়, আমি আপনার কিছু পরীক্ষা করে নেব— যেমন সুগার, থাইরয়েড বা ইউরিক অ্যাসিড। কারণ শরীরে সুগার বা থাইরয়েডের সমস্যা লুকিয়ে থাকলে টিস্যুতে জল জমে সুড়ঙ্গটাকে আরও সরু করে দেয়। ফলে নার্ভটা আরও বেশি করে চেপে যায়। আবার অনেক সময় কিন্তু ওই বাত থাকলেও হয় কিন্তু I"
👨🏻⚕️আমি তাঁকে পরামর্শ দিলাম একটা NCS (Nerve Conduction Study) করানোর জন্য। মীরা দেবী জিজ্ঞেস করলেন, "সেটা আবার কী?"
🖌️আমি বুঝিয়ে বললাম, "এটা হলো নার্ভের স্পিড টেস্ট। আপনার নার্ভের ভেতর দিয়ে কারেন্ট বা সংকেত কতটা দ্রুত যাচ্ছে, তা মেপে বোঝা যাবে নার্ভটা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাথে একটা USG করে আমরা দেখে নেব চাপের চোটে নার্ভের ব্যাস বা ডায়ামিটার কতটা বেড়েছে।"
👵🏼মীরা দেবী একটু চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "তাহলে এখন উপায়? ডাক্তারবাবু, অপারেশন লাগবে না তো?"
👨🏻⚕️আমি তাঁকে আশ্বস্ত করে বললাম, "সব সময় অপারেশন লাগে না। কিছু ক্রাইটেরিয়া আছে। যেমন:
যদি ওষুধের কাজ না হয়। যদি হাতের জোর বা পাওয়ার কমে যায়।যদি 'থিনার মাসল' (Thenar Muscle) বা বুড়ো আঙুলের গোড়ার পেশিগুলো শুকিয়ে যায়। বা ওই নার্ভ এর টেস্ট বা USG তে দেখা যায় কি নার্ভ এ খুব বেশি চাপ পড়ছে I
💊আপাতত আপনি এই ওষুধগুলো শুরু করুন আর যে ব্যায়ামগুলো (Nerve Gliding Exercise) দেখিয়ে দিলাম, সেগুলো নিয়ম করে করবেন। রিপোর্টগুলো আসুক, তারপর বাকিটা ঠিক করব।"
👵🏼মীরা দেবী ডাক্তার বাবু তাও ভয় করছে একটু এর চিকিৎসা নিয়ে বলবেন ? আমি বুঝিয়ে বললাম
১. শুরুতে ওষুধ, স্প্লিন্ট (হাতের বেল্ট) এবং রিহ্যাবিলিটেশন ব্যায়াম।
২.যদি এতেও না কমে, তবে TENS-এর মতো উন্নত ফিজিওথেরাপি দেওয়া হয়।
৩. এখন বড় কাটাছেঁড়া ছাড়াই আল্ট্রাসাউন্ড দেখে নার্ভের ওপরের চাপ কমানোর জন্য ইনজেকশন দেওয়া যায়( USG Guided Injection) । এতে নার্ভটা আবার প্রাণ ফিরে পায়।
৪. একদম শেষ পর্যায়ে যখন আর কোনো উপায় থাকে না, তখন ছোট একটা অস্ত্রোপচার করে সুড়ঙ্গের ছাদটা (Ligament) আলগা করে দেওয়া হয়।
🎯মীরা দেবী কিছুটা ভয়ে আর কিছুটা আক্ষেপে চেম্বার ছাড়ার সময় বললেন, "ডাক্তারবাবু, একটু লেটে এলাম বোধহয়। আরও আগে আসা উচিত ছিল। এত কিছু তো জানতামই না!"
👨🏻⚕️আমি বললাম, "আশা করি ওষুধেই ঠিক হয়ে যাবে। তবে মনে রাখবেন মীরা দেবী, ব্যথা হলো আমাদের শরীরের একটা 'সিগন্যাল'। শরীরের কোথাও কোনো অসুবিধে হলে সে ব্যথা দিয়ে আমাদের সাবধান করে। কোনো ব্যথা যদি ২-৩ মাসেও ঠিক না হয়, তবে সেটাকে অবহেলা না করে অবশ্যই ডাক্তার দেখাবেন। কারণটা খুঁজে বের করা যে খুব জরুরি!" )
Dr. Subhasish Pati ... ডাক্তারবাবু খুব সুন্দর করে উক্ত রোগের বর্ণনা করলেন । 🙏🏻🙏🏻
নিয়মিত শরীরচর্চা এবং প্রাণায়াম খুব প্রয়োজন । বিশেষতঃ বয়স ত্রিশ পার করলেই বিশেষ ভাবে শরীরের যত্নের প্রয়োজন ।
কিভাবে শুরু করবেন...
বিশদে জানতে যোগাযোগ করুন ।