29/07/2025
আপনি যখন রাতের ট্রেন ধরেন, তখন কী বোঝেন?
একটা যাত্রা? একটা গন্তব্য? আপনি জানেন আপনি কোথায় যাচ্ছেন, আপনি জানেন আপনার গন্তব্যস্থল!
কিন্তু যদি বলি,
আপনার পাশের কম্পার্টমেন্টে এক ঝাঁক মানুষ উঠেছে, প্রধানত একগুচ্ছ মেয়ে এবং মহিলা উঠেছে, যারা জানেই না তারা কোথায় যাচ্ছে!
যাদের গন্তব্য বদলে দেওয়া হয়েছে অজান্তেই,
আর যাদের জীবন আর কোনওদিন ফিরবে না সেই পথ থেকে।
বুঝতে পারছেন?
হ্যাঁ, ঠিক এমনটাই ঘটেছে, নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে।
যে স্টেশন দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী যাতায়াত করে, সেই পরিচিত স্টেশনের বুক চিরে সেদিন হেঁটে যাচ্ছিল ৫৬টি তরুণী,
হেঁটে যাচ্ছিল এমন এক গন্তব্যস্থলে যেটি তারা কোনদিন স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।
কোনো হৈচৈ ছিল না, কোনো কোলাহল না।
তারা চোখ নামিয়ে শুধু হাঁটছিল, ঠিক যেন কেউ নির্দেশ দিয়েছে,
‘শব্দ করিস না, কেউ টের পাবে। তাহলেই মুশকিল!’
বুঝতে পারলেন না? এইবার মন দিয়ে পড়ুন ভালো করে!
বাইশে জুলাই, ২০২৫, নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন!
নিয়মমাফিক ট্রেন ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ট্রেন।
একটি কোচের দিকে সন্দেহজনকভাবে চোখ চলে যায় রেল কর্মীদের। ভিতরে দেখা যায়, ৫৬ জন তরুণী বসে আছে ঘুপচি করে।
মুখে কথা নেই, চোখে আতঙ্ক, কারও হাতে নেই টিকিট।
একেকজনের বয়স ১৬ থেকে ৩১, কেউ বলছে তারা যাচ্ছে বেঙ্গালুরুতে চাকরি করতে।
কিন্তু প্রশ্ন একটাই,
তাহলে ট্রেনটা পাটনা অভিমুখী দাঁড়িয়ে কেন?
এই একটাই অসামঞ্জস্যতা যেন খুলে দেয় এক শিকার-ফাঁদ চক্রের কুৎসিত ছায়া।
একটি মেয়েরও হাতে ছিল না কোনও টিকিট।
ছিল না ফোন, চিঠি, চাকরির অফার লেটার, এমনকি কোনও ID-ও না।
কিছু ছিল? হ্যাঁ, শুধু একটা করে সিট নম্বর।
কোনো কাগজে না, হাতে কালি দিয়ে লেখা,
“S-9 / 31”
“S-10 / 52”
ঠিক যেন কেউ চালান করেছে তাদের।
জ্যান্ত শরীর নয়, জ্যান্ত মালপত্র।
তারা বলছিল, তারা বেঙ্গালুরু যাচ্ছে চাকরির জন্য।
কে দিচ্ছে চাকরি?
তাদের মতে, "আই ফোন কোম্পানিতে"!
জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়।
প্রথমে মেয়েগুলো চুপ। তারপর কেউ কথা বলে।
তারা বিশ্বাস করে, যারা তাদের এনেছে, তারা তাদের উপকার করছে।
তাদের বলা হয়েছিল, কোম্পানি থেকে ভালো বেতন, থাকার জায়গা, খাবার সব দেওয়া হবে।
বাস থেকে নামিয়ে ট্রেনে তুলে দেওয়া হয়েছিল একসাথে।
কারও হাতে কাগজ নেই, চিঠি নেই, চাকরির ঠিকানা নেই।
তাদের কারও হাতে লিখে দেওয়া ছিল নম্বর, যা পাচারচক্রে ট্র্যাকিং-এর চিহ্ন।
এতেই রেলের GRP ও RPF বুঝে যায়, এটা “হিউম্যান ট্র্যাফিকিং” এর এক ভীষণ বড় চক্রান্ত।
দুই সন্দেহভাজনকে ধরা হয় সেখানেই।
জানা যায়, তারা বিভিন্ন জেলায় ঘুরে ঘুরে দরিদ্র পরিবারগুলোকে চাকরির লোভ দেখিয়ে মেয়েদের নিয়ে এসেছিল। তারপর ট্রেনে চাপিয়ে, কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, কেউ জানত না।
অভিমুখ ছিল বিহারের পাটনা।
সম্ভবত শেষ গন্তব্য ছিল এমন এক জায়গা,
যেখান থেকে ফিরে আসা যায় না — না শরীরে, না সম্মানে।
ব্যাস, তৎপরতার সাথে পদক্ষেপ নেয় GRP এবং RPF।
ট্রেনটি জাস্ট ছাড়ার আগে সবাইকে উদ্ধার করে।
বাঁচিয়ে দেয় সমস্ত তরুণীর প্রাণ, তাদের জীবন এবং তাদের সম্মান।
এখানে প্রশ্ন হলো,
যদি এই ট্রেনটা ছাড়ত, তাহলে?
আর কোনও মেয়ে ফেরত আসত না।
তাদের ফোন কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
তাদের শেখানো হয়েছিল কী বলতে হবে।
তাদের চিহ্ন মুছে ফেলা হতো।
নাম পাল্টে যেত, পরিচয় উধাও হয়ে যেত।
একেকজন মেয়ে হয়ে যেত একেকটা “কোড নম্বর”!
বুঝতে পারলেন কতটা ভয়ানক কান্ড? সত্যিই ভয়ংকর।
এখন আপনার মনে হতেই পারে আপনার করণীয় কী?
খুব সহজ ব্যাপার!
আপনি যদি কোনও স্টেশনে কারো চোখে ভয় দেখেন,
কারো গলায় কথার অভাব, হাতে না থাকা টিকিট,
ভিতরে না থাকা আত্মবিশ্বাস, তাহলে আর তাকিয়ে থাকবেন না। সাহস করে দাঁড়ান।
কারণ মানব পাচার এখন আর সিনেমার স্ক্রিপ্ট নয়।
এটা প্রতিদিনের রুটিন, ঠিক আপনার-আমার চারপাশে।
আর তার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো,
এইসব মেয়েদের, ছেলেদের, শিশুদের আমরা চিনতেও পারি না, যখন ওরা ঠিক আমাদের সামনেই বসে থাকে,
একই ট্রেনে, একই প্ল্যাটফর্মে,
একই ভিড়ের মধ্যে নিঃশব্দে হারিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায়।
তবে এ গল্প এখানেই শেষ নয়।
কারণ পাচারকারীরা আজ থেমে থাকছে না।
তারা আবার আসবে, অন্য শহরে, অন্য চেহারায়।
ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন প্রতিশ্রুতি আর একই বিষে মোড়া স্বপ্ন নিয়ে।
আপনি কী করবেন তখন?
আপনার চোখেই তো সেই আলো, যা আঁধার চেনার সাহস রাখে। আপনার ফোনেই তো সেই ডায়াল, যা কাউকে মৃ*ত্যু*র মুখ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে। আপনার মুখেই তো সেই প্রশ্ন, যা কারও বন্দীভাগ্যকে মুক্তি দিতে পারে।
সুতরাং,
চুপ করে থাকবেন না।
চোখ ফিরিয়ে নেবেন না।
ভাববেন না এটা আপনার দায়িত্ব নয়।
কারণ,
একটা ট্রেন ছাড়লে বদলে যেতে পারে কারও ভবিষ্যৎ নয়, পুরো জীবনটাই।
আর একটা চোখ যদি খুলে যায় ঠিক সময়ে,
তা পারে একটি প্রজাপতির ডানার মতো হালকা আন্দোলনে
একটা হিমালয় সমান সর্বনাশ থামাতে।
তাই জেগে থাকুন।
ভয় নয়, সচেতনতা ছড়ান। মানুষের মাঝে আরও এই বিষয়টা ছড়িয়ে দিন, সেটাই হবে আপনার প্রথম ধাপ, সমাজের জন্য সেই ভীত সন্ত্রস্ত মানুষগুলোর জন্য!
নিরবতা নয়, প্রশ্ন তুলুন। আর যেখানেই থাকুন, নিজের চারপাশে একটু ভালো করে তাকান।
কারণ, কখনও কখনও,
"বাঁচানো" শুরু হয় শুধুমাত্র একজোড়া খোলা চোখ থেকে।