17/07/2026
আমাদের শরীর প্রতিটি মুহূর্তে অসংখ্য কাজ করে চলেছে। আমরা যখন খাবার খাই, কাজ করি, দৌড়াই, বা ঘুমিয়ে থাকি, তখনও শরীরের ভেতরে কিছু অদৃশ্য যোদ্ধা নিরলসভাবে কাজ করে যায়। তাদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুইজন হলো ইনসুলিন এবং গ্লুকাগন। তারা যেন দুই ভাই, যারা একে অপরের বিপরীত কাজ করলেও লক্ষ্য একটাই, আমাদের শরীরকে সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ রাখা।
যখন আমরা ভাত, রুটি, ফল বা অন্য কোনো কার্বোহাইড্রেটজাতীয় খাবার খাই, তখন সেগুলো ভেঙে গ্লুকোজে (চিনি) পরিণত হয় এবং রক্তে মিশে যায়। তখন রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যায়। এই সময় অগ্ন্যাশয়ের (Pancreas) বিটা কোষ থেকে ইনসুলিন নিঃসৃত হয়।
ইনসুলিন যেন ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে শরীরের কোষগুলোর দরজা খুলে দেয়। সে গ্লুকোজকে রক্ত থেকে কোষের ভেতরে পৌঁছে দেয়, যাতে কোষগুলো সেই গ্লুকোজ ব্যবহার করে শক্তি তৈরি করতে পারে। আর যদি অতিরিক্ত গ্লুকোজ থেকে যায়, তাহলে ইনসুলিন সেটিকে লিভারে গ্লাইকোজেন হিসেবে জমা করে রাখে ভবিষ্যতের প্রয়োজনে। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসে।
কিন্তু জীবনের সব সময় তো আমরা খাই না। অনেকক্ষণ না খেলে, রাতে ঘুমের সময়, কিংবা দীর্ঘক্ষণ পরিশ্রম করলে রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যেতে শুরু করে। তখন আরেক নীরব রক্ষক গ্লুকাগন তার দায়িত্ব পালন করতে এগিয়ে আসে।
গ্লুকাগন অগ্ন্যাশয়ের আলফা কোষ থেকে নিঃসৃত হয়। সে লিভারকে বলে, "এখন সময় এসেছে জমিয়ে রাখা শক্তি ফিরিয়ে দেওয়ার।" তখন লিভার গ্লাইকোজেন ভেঙে আবার গ্লুকোজ তৈরি করে রক্তে ছেড়ে দেয়। প্রয়োজনে নতুন করেও গ্লুকোজ তৈরি করে। ফলে শরীর আবার প্রয়োজনীয় শক্তি পায় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক থাকে।
ভাবুন, যদি ইনসুলিন না থাকত, তাহলে গ্লুকোজ রক্তেই জমে থাকত, কিন্তু শরীরের কোষগুলো শক্তি পেত না। আবার যদি গ্লুকাগন না থাকত, তাহলে না খেয়ে থাকলে শরীরের শক্তি দ্রুত ফুরিয়ে যেত এবং রক্তে শর্করা বিপজ্জনকভাবে কমে যেত। তাই এই দুই হরমোন একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক।
ইনসুলিন আমাদের শেখায় অতিরিক্ত শক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার ও সংরক্ষণ করতে, আর গ্লুকাগন শেখায় প্রয়োজনে সেই সঞ্চিত শক্তিকে ফিরিয়ে এনে জীবনকে সচল রাখতে। তারা কখনও আলোচনায় আসে না, কিন্তু প্রতিটি হৃদস্পন্দনের সঙ্গে, প্রতিটি নিশ্বাসের সঙ্গে, নীরবে আমাদের জীবনকে নিরাপদ রাখে।
এটাই প্রকৃতির এক অসাধারণ ভারসাম্য, যেখানে একজন কমায়, আরেকজন বাড়ায় , কিন্তু দুজনেরই একমাত্র উদ্দেশ্য, আমাদের সুস্থ রাখা এবং জীবনকে এগিয়ে নিয়ে চলা ।