04/07/2026
এবার ডাক্তার দিবসে আর লেখা হয়ে উঠল না। প্রতি বছরই ভাবি, ১লা জুলাই কিছু লিখব। কিন্তু এ বছর দিনটা কেটে গেল হাসপাতাল, চেম্বার, রোগীর ফোন, রিপোর্ট আর দায়িত্বের ভিড়ে।
তারপর মনে হল— আমাদের জীবনে ডাক্তার দিবস কি সত্যিই একটা দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ? আমাদের কাছে তো প্রতিটা দিনই মানুষের জন্য। তাই একটু দেরি হলেও, আজ লিখছি।
আজ লিখছি চারজন বন্ধুর গল্প।
আমরা চারজন মেয়ে। চারটি আলাদা পরিবার থেকে, চার রকম স্বপ্ন নিয়ে একদিন পৌঁছেছিলাম আর. জি. কর মেডিক্যাল কলেজে। তখন আমাদের পরিচয় ছিল শুধু— এমবিবিএস-এর ছাত্রী।
কত রাত জেগে পড়া, কত ক্যান্টিনের চা, কত পরীক্ষার চাপ, কত ওয়ার্ড ডিউটি, কত প্রথম রোগী, কত প্রথম মৃত্যু দেখে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা… আবার কত প্রাণখোলা হাসি, কত আড্ডা, কত স্বপ্ন!
সেদিন কেউ জানতাম না, একদিন আমরা চারজন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ব। কিন্তু আমাদের স্বপ্নটা ছিল একটাই— মানুষের পাশে থাকব।
আমাদের সময়ে একজন মেয়ে হয়ে ডাক্তার হওয়ার পথটা খুব সহজ ছিল না। শুধু পড়াশোনা নয়, সমাজের হাজার প্রশ্ন, পরিবারের প্রত্যাশা, নিজের স্বপ্ন আর নিজের পরিচয়— সবকিছুর সঙ্গে লড়াই করেই এগোতে হয়েছে। আজও সেই লড়াই শেষ হয়নি।
অনেক সময় একজন নারী চিকিৎসককে একই সঙ্গে একজন ডাক্তার, একজন মেয়ে, একজন স্ত্রী, একজন মা, একজন কন্যা— কত রকম ভূমিকা পালন করতে হয়! কিন্তু সাদা অ্যাপ্রনটা গায়ে চাপালেই সব পরিচয়ের আগে একটা পরিচয় বড় হয়ে ওঠে— আমি একজন চিকিৎসক।
ডা. শ্রাবণী চক্রবর্তী আজ একজন স্নেহময়ী শিশু বিশেষজ্ঞ। ছোট্ট রোগীদের কান্না থামিয়ে তাদের মুখে হাসি ফোটানোই যেন ওর সবচেয়ে বড় আনন্দ। বহু বছর লন্ডনে চিকিৎসা করেও ওর মধ্যে সেই মানুষকে ভালোবাসার সহজ, আন্তরিক মনটা একটুও বদলায়নি।
ডা. শ্যামশ্রী শীল মজুমদার আজ একজন দক্ষ চক্ষু বিশেষজ্ঞ। কত মানুষকে নতুন করে পৃথিবীর আলো দেখার সুযোগ করে দিচ্ছে ও। একজন মানুষের চোখে আবার আলো ফিরিয়ে দেওয়ার অনুভূতির সঙ্গে খুব কম কিছুরই তুলনা চলে।
ডা. সুনীতা সুরেখা আজ আমেরিকায় মেডিসিন নিয়ে কাজ করছে। দেশ বদলেছে, সময় বদলেছে, ভাষা বদলেছে। কিন্তু বন্ধুত্ব বদলায়নি। এখনও কথা হলেই মনে হয়, আমরা যেন সেই আর. জি. কর-এর ক্যান্টিনে বসে আগামী দিনের স্বপ্ন দেখছি।
আর আমি... ডা. পিয়ালি সেন চ্যাটার্জী।
আজও প্রতিদিন শিখছি। প্রতিদিন নতুন মানুষের গল্প শুনছি। অনেক সময় রোগী শুধু ওষুধ নিতে আসেন না— একটু সাহস, একটু ভরসা, একটু আশ্বাস খুঁজতে আসেন।
যখন কেউ বিদায় নেওয়ার সময় বলে—
"ম্যাডাম, আপনি থাকলে মনে জোর পাই…"
তখন মনে হয়, চিকিৎসক হওয়ার সব ক্লান্তি, সব পরিশ্রম যেন এক মুহূর্তেই সার্থক হয়ে যায়।
আজ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি ডা. বিধানচন্দ্র রায়কে। তাঁর জীবন আমাদের শিখিয়েছে— চিকিৎসা শুধু একটি পেশা নয়, এটি মানুষের প্রতি এক নিঃস্বার্থ অঙ্গীকার।
এই লেখাটা শুধু আমার তিন বন্ধুর জন্য নয়। পৃথিবীর প্রতিটি নারী চিকিৎসকের জন্য— যাঁরা নিজেদের ক্লান্তি, নিজের কষ্ট, নিজের না-পাওয়া, নিজের চোখের জল আড়াল করে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের জীবনে আশার আলো জ্বালিয়ে চলেছেন।
আর শ্রদ্ধা জানাই প্রতিটি চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, টেকনিশিয়ান এবং তাঁদের পরিবারের মানুষদের। কারণ একজন চিকিৎসকের পিছনেও থাকে অনেক নিঃশব্দ ত্যাগ, অনেক অপেক্ষা, অনেক ভালোবাসা।
শ্রাবণী, শ্যামশ্রী, সুনীতা...
জীবন আমাদের আলাদা আলাদা পথে নিয়ে গেছে। শ্রাবণী বহু বছর লন্ডনে চিকিৎসা করেছে, সুনীতা আজ আমেরিকায় মানুষের সেবা করে চলেছে, আর শ্যামশ্রী আর আমি কলকাতায় আমাদের রোগীদের নিয়ে ব্যস্ত।
দূরত্ব আজ আমাদের নিয়ে গেছে কলকাতা, লন্ডন আর আমেরিকায়। কিন্তু আমাদের বন্ধুত্বের ঠিকানা আজও একটাই— আর. জি. কর মেডিক্যাল কলেজ।
আজও যখন কথা হয়, মনে হয় যেন আবার সেই ক্যান্টিনে বসে আছি। হাতে এক কাপ চা, সামনে পরীক্ষা, আর চোখভরা স্বপ্ন— "একদিন আমরা ভালো ডাক্তার হব, মানুষের পাশে দাঁড়াব।"
সময় আমাদের আলাদা ঠিকানা দিয়েছে, কিন্তু আলাদা করতে পারেনি আমাদের বন্ধুত্বকে।
বন্ধুত্ব বদলায়নি। স্বপ্ন বদলায়নি। শুধু সাদা অ্যাপ্রনের ভাঁজে ভাঁজে জমেছে হাজার মানুষের বিশ্বাস, আশীর্বাদ আর ভালোবাসা।
শ্রাবণী, শ্যামশ্রী, সুনীতা... তোদের নিয়ে আমি সত্যিই গর্বিত। আমাদের বন্ধুত্বের বয়স যতই বাড়ুক, মানুষের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা আর একে অপরের প্রতি ভালোবাসা যেন কোনওদিন কমে না। ঈশ্বরের কাছে একটাই প্রার্থনা— আমরা যেন সুস্থ থাকি, ভালো থাকি, আর সারাজীবন মানুষের পাশে থাকার শক্তিটুকু ধরে রাখতে পারি।
ভালো থাকুক পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ। সুস্থ থাকুক প্রতিটি পরিবার।
কারণ একজন চিকিৎসকের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কোনও পুরস্কার নয়, কোনও ডিগ্রি নয়— একজন সুস্থ হয়ে ওঠা মানুষের হাসি।
অনেক ভালোবাসা রইল।
— ডা. পিয়ালি সেন চ্যাটার্জী