10/04/2026
World Homeopathy Day
আজ ১০ই এপ্রিল, মহাত্মা হ্যানিম্যানের জন্মদিন।
❝আমি খ্যাতির জন্য কিছুই করিনি; সত্যের প্রতি ভালোবাসা, কর্তব্যবোধ এবং দুঃখভোগী মানবতার কল্যাণেই আমি আমার কাজ করেছি।❞
— ডাঃ স্যামুয়েল হ্যানিম্যান (ডাঃ বোয়েনিংহাউজেনকে লেখা চিঠি, ২৪ সেপ্টেম্বর ১৮৪২)
হ্যানিম্যানের মৃত্যুর প্রায় ০৯ মাস আগে লেখা চিঠির একটি অংশ এটি।
কে এই হ্যানিম্যান? কে মৃত্যুর সময় উচ্চারণ করতে পারেন “আমি বৃথা জীবন ধারণ করিনি?”
১৭৮৫ সালে, ৩০ বছর বয়সে, ছয় বছরের চিকিৎসা-চর্চার পর এক অসাধারণ মেধাবী ও শিক্ষিত এলোপ্যাথিক চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নিলেন নিজের চিকিৎসা পেশা ত্যাগ করবেন এবং রসায়ন ও অনুবাদের কাজে নিজেকে নিবেদিত করবেন।
এই প্রসঙ্গে হ্যানিম্যান লিখেন—
❝অজানা রোগাবস্থার ক্ষেত্রে আমার সহমানবদেরকে এমন সব অজানা ওষুধ—শক্তিশালী উপাদান, যেগুলো যদি ঠিকভাবে উপযোগী না হয় তবে জীবনকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে বা নতুন নতুন রোগ ও দীর্ঘস্থায়ী অসুখ সৃষ্টি করতে পারে, যা মূল রোগের চেয়েও অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়ে—এসব দিয়ে চিকিৎসা করা নিয়ে আমি নিজের বিবেকের কাছে অত্যন্ত অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করি।
আমার কাছে এটি একটি অত্যন্ত ভীতিকর চিন্তা হয়ে দাঁড়ায় যে, এভাবে আমি হয়তো একজন হত্যাকারীতে পরিণত হতে পারি অথবা আমার সহমানবদের জীবনের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারি। তাই আমি সম্পূর্ণভাবে চিকিৎসা চর্চা ত্যাগ করি এবং কাউকে চিকিৎসা করা প্রায় বন্ধ করে দিই, কারণ কারও ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কায় আমি ভীত ছিলাম।❞
১৮০৮ সালে, তার বন্ধু হুফেল্যান্ডের উদ্দেশে লেখা একটি চিঠিতে, হ্যানিম্যান একজন চিকিৎসক হিসেবে নিজের অসহায়ত্বের কথা প্রকাশ করেন। এ চিঠিটি পরবর্তীতে
❝উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন একজন চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসাশাস্ত্রের পুনর্জাগরণের প্রয়োজন❞ শিরোনামে ছড়িয়ে পড়ে।
তিনি লেখেন—
“কিন্তু আমি কোথা থেকে নিশ্চিত ও নির্ভরযোগ্য সাহায্য পাব? আমাদের চিকিৎসাবিদ্যার ক্ষেত্রে ওষুধের শক্তি সম্পর্কে জ্ঞান মূলত অস্পষ্ট পর্যবেক্ষণ, অনেক সময় কেবল কল্পনাভিত্তিক অনুমান; আর রোগ সম্পর্কিত অসংখ্য স্বেচ্ছাচারী মতবাদে আমাদের প্যাথলজিক্যাল গ্রন্থসমূহ ভরা—এ এক এমন গোলকধাঁধা, যেখানে কেবল সেই ব্যক্তি শান্তি বজায় রাখতে পারে, যে ওষুধের নিরাময়ক্ষমতা সম্পর্কিত শত বইয়ে পুনরাবৃত্ত বক্তব্যকে প্রশ্ন না করে সত্য বলে গ্রহণ করে, এবং রোগের সংজ্ঞাগুলোকে পরীক্ষাহীনভাবে গ্রহণ করে।
সে নিজের ‘অন্ধভাবে লক্ষ্যভেদ করা’ চিকিৎসা-পদ্ধতির কারণে রোগী মারা গেলে সেটিকে নিজের চিকিৎসার ফল হিসেবে না দেখে বরং রোগের অচিকিৎসাযোগ্যতা, রোগীর অবাধ্যতা বা অন্যান্য তুচ্ছ কারণে দায়ী করে—এভাবে নিজের বিবেককে সন্তুষ্ট রাখে, যদিও এসব যুক্তি বহু ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিকর এবং সর্বজ্ঞ ঈশ্বরের সামনে গ্রহণযোগ্য নয়।
এবং এভাবেই সে এমন সব ওষুধ দিয়ে রোগ চিকিৎসা করতে থাকে, যেগুলোর জীবন ও মৃত্যুর ওপর প্রভাব আছে, অথচ যেগুলোর প্রকৃত শক্তি সম্পর্কে কিছুই জানা নেই।
আমি কোথায় খুঁজব নিশ্চিত সাহায্য?
দুঃখিত পিতা হিসেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছি, অসহনীয় অসুস্থ সন্তানদের আর্তনাদ শুনে। চারদিকে অন্ধকার রাত এবং মরুভূমির মতো শূন্যতা; আমার পিতৃ-হৃদয়ের জন্য নেই কোনো সান্ত্বনার আশা।”
হ্যানিম্যান এরপর প্রশ্ন করেন—
“এমন কি কোনো পদ্ধতি আছে—কোনো সহজ, নিশ্চিত ও নির্ভরযোগ্য উপায়—যার মাধ্যমে চিকিৎসকেরা রোগকে তার প্রকৃত সঠিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পারেন এবং একই সঙ্গে ওষুধগুলোকেও এমনভাবে পরীক্ষা বা অনুসন্ধান করতে পারেন, যাতে বোঝা যায় সেগুলো আসলে কোন ক্ষেত্রে, কীভাবে, সত্যিই ও নিশ্চিতভাবে উপকারী?”
তিনি এভাবেই একটি নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা-পদ্ধতির সন্ধান চালিয়ে যেতে থাকেন।
তিনি চিকিৎসাশাস্ত্রের সেই কাঙ্ক্ষিত “নিশ্চিত, নির্ভরযোগ্য সহায়তা”-র সন্ধানে প্রায় ২৫০০ বছরের চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্ধকারের মধ্য দিয়ে একটি ক্ষীণ আলোর রেখা খুঁজে চলেছিলেন।
এই কাজ সম্পাদনে তাকে ব্যাপকভাবে সহায়তা করেছিল তার সময়কার উৎকৃষ্ট গ্রন্থাগারগুলোতে প্রবেশাধিকার এবং তার অসাধারণ ভাষাবিদ্যা দক্ষতা। তিনি ছিলেন এক অসাধারণ প্রতিভাবান ফিলোলজিস্ট, যিনি ল্যাটিন, গ্রিক, আরবি, হিব্রু, সিরীয় ও চালদীয়সহ প্রাচীন বহু ভাষায় মূল চিকিৎসা-গ্রন্থসমূহ পড়তে সক্ষম ছিলেন।
লিপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাশাস্ত্রে অধ্যাপনার চেয়ার পাওয়ার জন্য তার যে গবেষণাপত্র (থিসিস) তিনি উপস্থাপন করেছিলেন, সেখানে তিনি আটটি ভাষায় বিভিন্ন লেখকের উদ্ধৃতি হুবহু ব্যবহার করেছিলেন—যেন তিনি প্রাচীন চিকিৎসা-লেখকদের সবাইকে গভীরভাবে জানতেন। সেই ৮৬ পৃষ্ঠার ল্যাটিন থিসিসে অন্তত ৩২২টি রেফারেন্স ছিল, যেগুলোর অধিকাংশই প্রাচীন লেখকদের।
ইতিহাসবিদ থমাস ব্র্যাডফোর্ড হ্যানিম্যানের ভাষাগত দক্ষতা সম্পর্কে লিখেছেন— “তিনি কোনো ভাষা বুঝতে চাইলে, যেটির সঙ্গে তিনি পরিচিত নন, তখনই সেই ভাষার পদ্ধতিগত অধ্যয়ন শুরু করতেন। এভাবেই তিনি অজান্তেই নিজের মহান ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন।”
এছাড়া ক্যারল ডানহাম মন্তব্য করেন যে, চিকিৎসাশাস্ত্রের ইতিহাস সম্পর্কে হ্যানিম্যানের জ্ঞান ছিল অসামান্য—যা আজ পর্যন্ত বিরল। তিনি লিখেছেন, “হ্যানিম্যান ছিলেন গভীর পাণ্ডিত্য ও বিস্তৃত চিকিৎসা-সংস্কৃতির অধিকারী একজন চিকিৎসক। তার লেখাগুলো এই শিক্ষারই প্রতিফলন। বিভিন্ন ভাষায় তার বিস্তৃত পাঠ তাকে এমন সব উদ্ধৃতি ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছিল, যা ‘অর্গানন’-এ তার যুক্তিকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করে এবং ‘ম্যাটেরিয়া মেডিকা’-তে তার প্যাথোজেনেসিসকে সমৃদ্ধ করে।”
এই বিস্তৃত ঐতিহাসিক জ্ঞানকে বোঝাতে ১৮১৩ সালে হ্যানিম্যান লিখেছিলেন— “এই হাজার হাজার বছরে, এবং যতদূর চিকিৎসাশাস্ত্রের ইতিহাস জানা যায়…”
এভাবে আমরা দেখতে পাই এক অসাধারণ মেধাবী, চিন্তাশীল ও মানবকল্যাণে নিবেদিত চিকিৎসককে, যিনি চিকিৎসার বিপদ ও সীমাবদ্ধতার কারণে প্রথাগত চিকিৎসা ত্যাগ করার পর একটি ক্ষীণ আলোর সন্ধানে বের হন। অবশেষে তিনি সেই আলোর আভাস পান ১৭৯০ সালে, যখন তিনি কালেনের Materia Medica অনুবাদ করছিলেন।
এর পরের ইতিহাস ই হোমিওপ্যাথি : রুগ্ন মানতবার কল্যাণে এক মহা বিপ্লব, যা আজও মানুষের জন্য সমানভাবে উপকারী। এরপরই পৃথিবীর মেডিকেল ও মেডিসিনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ কালজয়ী গ্রন্থ অর্গানন অব মেডিসিনের জন্ম
আজ ১০ ই এপ্রিল, এই মহান চিকিৎসকের জন্মদিনে, এই মহাত্মার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি— মহান আল্লাহ আমাদেরকেও আদর্শ চিকিৎসক হিসেবে কবুল করুন।
(সংগৃহীত)