08/06/2026
ইনসাফ প্রতিষ্ঠা: দুনিয়ার শান্তি ও আখিরাতের মুক্তির অন্যতম চাবিকাঠি
ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা, যা ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দেয়। দুনিয়ার শান্তি, সামাজিক স্থিতি এবং আখিরাতের সফলতার জন্য ইনসাফের বিকল্প নেই। যখন সমাজে ন্যায়পরায়ণতা দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন জুলুম, বৈষম্য, হিংসা ও শত্রুতার বিস্তার ঘটে। মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন হয় এবং সমাজে অশান্তি নেমে আসে।
মহান আল্লাহ তাআলা মুমিনদের নির্দেশ দিয়েছেন যেন তারা সব অবস্থায় ন্যায়ের ওপর অটল থাকে। তিনি বলেন
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায়ের সাক্ষ্যদাতা হিসেবে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো। কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার থেকে বিরত না রাখে। তোমরা ইনসাফ করো; এটিই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী। আর আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই তোমরা যা করো, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবগত।” (সূরা আল-মায়িদাহ: ৮)
বর্তমান সময়ে অনেক মানুষ নিজেদের স্বার্থ, দলীয় পক্ষপাত কিংবা ব্যক্তিগত আবেগকে ন্যায়ের মানদণ্ড মনে করে। কেউ কেউ নিজেদের জুলুমকে বৈধ প্রমাণ করার জন্য নানা যুক্তি, অজুহাত ও মিথ্যা কাহিনির আশ্রয় নেয়। কিন্তু মহান আল্লাহ মানুষের প্রকাশ্য ও গোপন সবকিছু জানেন। মানুষের সামনে সত্য গোপন করা সম্ভব হলেও আল্লাহর কাছে কিছুই গোপন নয়।
একজন মুমিন কখনো নিজের স্বার্থ, আত্মীয়তা বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে অন্যায় ও জুলুমের পক্ষ নিতে পারে না। বরং নিজের বিরুদ্ধে গেলেও সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোই ঈমানের দাবি। আল্লাহ তাআলা বলেন
“হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়ের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দেবে, যদিও তা তোমাদের নিজেদের, পিতা-মাতা কিংবা নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে হয়। সে ধনী হোক বা দরিদ্র, আল্লাহ তাদের উভয়ের ব্যাপারে অধিক হকদার। অতএব, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তোমরা প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না।” (সূরা আন-নিসা: ১৩৫)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেখানে ধনী-গরিব, শক্তিশালী-দুর্বল, শাসক-শাসিত সবার জন্য সমান ন্যায়বিচার নিশ্চিত ছিল। তিনি শিখিয়েছেন যে কোনো মানুষের প্রাপ্য অধিকার আদায়ে তার দুর্বলতা যেন বাধা না হয়।
আবু সাঈদ আল-খুদরি (রা.) বর্ণনা করেন, এক বেদুইন ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে তার পাওনা দাবি করতে এসে কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছিল। সাহাবায়ে কেরাম তাকে ধমক দিতে চাইলে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন,
“তোমরা পাওনাদারের পক্ষ নিলে না কেন?”
পরে তিনি তার পাওনা পরিশোধ করে দেন। তখন সেই ব্যক্তি বলেন, “আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।”
এরপর রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন
“যে জাতির দুর্বল মানুষ জোর-জবরদস্তি ছাড়া তার ন্যায্য অধিকার আদায় করতে পারে না, সে জাতি কখনো পবিত্র ও সফল হতে পারে না।” (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৪২৬)
অন্য হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন
“ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিরা কিয়ামতের দিন আল্লাহর ডান পাশে নূরের মিম্বরে অবস্থান করবে। তারা হলো সেইসব মানুষ, যারা তাদের বিচার, পরিবার এবং দায়িত্বের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে।” (সহিহ মুসলিম: ১৮২৭)
অতএব, একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো সর্বাবস্থায় ন্যায়ের পক্ষে থাকা, জুলুমের বিরোধিতা করা এবং মানুষের হক আদায়ে সচেষ্ট হওয়া। কারণ ইনসাফ শুধু একটি সামাজিক গুণ নয়; এটি তাকওয়ার প্রকাশ, ঈমানের দাবি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের অন্যতম মাধ্যম।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণতা অবলম্বন করার তাওফিক দান করুন। জুলুম থেকে হেফাজত করুন এবং ইনসাফ প্রতিষ্ঠাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন।
আমিন।
Quranic health