01/01/2026
হাতটা তুলুন, ম্যাডাম। দয়াকরে আরেকটু উপরে তুলুন!
-ডঃ আহমেদ আব্দুল গাওয়াদ
রয়েল লিভারপুল ইউনিভার্সিটি হাসপাতাল
কথাটা শুনতে খুবই সহজ আর সাধারণ। কিন্তু এটাই ছিলো সেই গোপন সংকেত যা বহু বছর ধরে চলা এক ভয়াবহ যন্ত্রণা থেকে এক ভুক্তভোগী রোগীকে মুক্তি দেয়।
অনেক দিন ধরে নানা যন্ত্রণায় ভোগে এক রোগী আমার চেম্বারে ঢুকেছিলেন আক্ষরিক অর্থেই একটি পূর্ণ শ্বাস টানার জন্য লড়াই করতে করতে। যেন ঘরের বাতাসটাই তার শত্রু হয়ে গেছে। বুকের ভেতরে ঢোকার কোনো পথই পাচ্ছে না।
চেয়ারে বসে ভয়ে ভরা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে এমন একটি কথা বললেন, যা আমাকে রীতিমতো কাঁপিয়ে দেয়। তিনি বললেন- ডাক্তার সাহেব, আমার মনে হয় আমার গলার ভেতরে একটা লোহার দরজা শিকল দিয়ে বন্ধ করা আছে। বাতাস চারদিকে ভরা। কিন্তু ওই শিকলটা পেরিয়ে কোনো বাতাস ভেতরে ঢুকতে পারছে না।
এই নারী বছরের পর বছর ভুল রোগনির্ণয়ের পেষণযন্ত্রে পিষ্ট হয়েছেন।
বুকের ডাক্তারদের কাছে গেছেন । তারা বলেছেন -দীর্ঘমেয়াদি অ্যাজমা। ইনহেলার দিয়েছেন। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।
কান-নাক-গলার ডাক্তারদের কাছে গেছেন। তারা বলেছেন সাইনাসের সমস্যা। কর্টিসোন, নাকের স্প্রে, অ্যান্টিবায়োটিক সবই ব্যবহার করেছেন। কোনো লাভ হয় নি।
এক পর্যায়ে তিনি রাতকেই ভয় পেতে শুরু করেন। চোখ বন্ধ করতে ভয়। যদি শ্বাস হারিয়ে ফেলেন।
তিনি বসে বসেই ঘুমাতেন উঁচু বালিশে হেলান দিয়ে, চোখ দরজার দিকে চেয়ে যেন কোনো অলৌকিক ঘটনা এসে তাঁর এই দীর্ঘ যন্ত্রণার অবসান ঘটায়।
তিনি যখন আমার সামনে বসলেন- আমি স্টেথোস্কোপ দিয়ে শ্বাস শুনে একটি অদ্ভুত জিনিস লক্ষ করলাম।
এটা অ্যাজমার পরিচিত “শোঁ শোঁ” শব্দ নয়।
এটা ছিল গলা থেকে আসা তীক্ষ্ণ ঘর্ষণের শব্দ। বাতাস যেন সূচের ছিদ্র দিয়ে যেতে লড়াই করছে।
এই শব্দকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলা হয় Stridor।
এখানেই আমার সন্দেহ গেল একেবারে অন্য দিকে একটি লুকানো জায়গায়, যেটা কেউ হয়তো আগে ভাবেনি।
আমি তাকে এমন একটি প্রশ্ন করলাম, যেটা ছিলো তার জন্য ভীষণ একটা ধাক্কা।
“ম্যাডাম, যখন আপনি হাত তুলে চুল আঁচড়ান বা উঁচু তাক থেকে কিছু তুলতে যান-তখন কি এই দমবন্ধ ভাবটা বাড়ে?
তিনি বিস্ময়ে আমার দিকে তাকালেন যেন হঠাৎ কোনো অজানা সত্য আবিষ্কার করেছেন।
নিচু, কাঁপা কণ্ঠে বললেন: আপনি জানলেন কী করে? ওই সময়টাতেই আমার মনে হয় সত্যি সত্যি প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছে। মুখ গরম হয়ে যায় আর শ্বাস পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আসে।
তখন আমি তাকে চূড়ান্ত পরীক্ষাটি করতে বললাম—Pemberton’s Sign।
বললাম: দুটো হাত মাথার ওপর তুলুন।
এক মিনিটেরও কম সময়ে দৃশ্যটা যেন মেডিকেল বইয়ের পাতায় তোলা উদাহরণ।
তার ফ্যাকাসে মুখ হঠাৎ রক্তিম লাল হয়ে গেল। গলার শিরাগুলো ফুলে উঠল। আর শ্বাসের গর্জন আরও জোরে শোনা যেতে লাগল।
তাহলে ঠিক কী হলো ওই মুহূর্তে?
হাত তুললে বুকের প্রবেশপথের ভেতরের জায়গা স্বাভাবিকভাবেই সংকুচিত হয়। আর যদি বুকের হাড়ের পেছনে নেমে যাওয়া কোনো থাইরয়েড গ্রন্থি থাকে (Retrosternal goiter) তাহলে ওই সংকীর্ণ জায়গায় আরও চাপে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে শ্বাসনালী ও আশপাশের শিরায় চাপ দেয়। যার ফলে- শ্বাসরোধ ও মুখে রক্তজমার উপসর্গ দেখা দেয়।
সহজ ভাষায়: Pemberton’s sign হলো সেই খবরদাতা- যা বুকের হাড়ের পেছনে লুকিয়ে থাকা যে কোনো গোপন গাঁট বা টিউমারকে ধরে ফেলে!
মনে মনে আমি বললাম: ধরা পড়েছে। ধূর্ত থাইরয়েড।
রোগনির্ণয় হলো। এটা এমন একটা থাইরয়েড গ্রন্থি যা বাইরে থেকে একেবারেই দেখা যায় না। এটা ছিল পরিযায়ী যা বুকের হাড়ের পেছনে লুকিয়ে থাকে। এই গ্রন্থিটি শ্বাসনালীর চারপাশে এমনভাবে পেঁচিয়ে ছিল যেন ধীরে ধীরে তাকে চেপে ধরছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা?
ভদ্র মহিলা নিয়মিত থাইরয়েডের পরীক্ষা করাতেন। সব রিপোর্টই ছিল একদম স্বাভাবিক। আর এটাই বছরের পর বছর সব ডাক্তারকে বিভ্রান্ত করেছে, কারণ তারা ভুলে গিয়েছিলেন- থাইরয়েডের কাজ স্বাভাবিক হলেও তার আকার আর অবস্থান হতে পারে খুবই ভয়ংকর।
আমরা সিটি স্ক্যান করালাম।
ছবিটা যেন সেই ভয়ের গল্পটাই বলে দিল। যা এই নারী বছরের পর বছর বয়ে বেড়িয়েছেন।
গ্রন্থিটি এতটাই নিচে নেমে গিয়ে শ্বাসের পথ বন্ধ করছিল যে- অবাক লাগলো- তিনি এতদিন শ্বাস- প্রশ্বাস গ্রহন করতেনই বা কীভাবে!!!!
সত্য জানার পর মহিলা স্বস্তিতে কেঁদে ফেললেন।
কাঁদলেন কারণ অবশেষে তিনি তাঁর দীর্ঘ অসহ্য মরণ যন্ত্রণার কারণটা খুঁজে পেয়েছেন।
জানলেন এতোদিন ধরে ইনহেলার, ব্রংকোডাইলেটর আর অ্যান্টিবায়োটিকে নষ্ট হওয়া বছরগুলো আসলে ছিল শুধুই এক বিভ্রম।
সঠিক রোগনির্ণয়ের পর উনাকে অনুরোধ করা হলো বুকে ঢুকে থাকা থাইরয়েডের অতিরিক্ত অংশ অপসারণের জন্য অস্ত্রোপচার করতে হবে।
তিনি অস্ত্রোপচার করালেন এবং অতিরিক্ত অংশটি সরানো হলো।
আর অপারেশন শেষ হতেই আলহামদুলিল্লাহ শ্বাস একদম স্বাভাবিক হয়ে আসলো।
আর এখানেই রয়েছে আমাদের ডাক্তারদের জন্য এক গভীর শিক্ষাঃ
চিকিৎসা শুধু সংখ্যা আর রিপোর্ট নয়।
চিকিৎসা হলো পর্যবেক্ষণের শিল্প।
আর কখনো কখনো -হাত তোলা-র মতো একটি সাধারণ ইঙ্গিতই বহু বছর ধরে শ্বাসকষ্ট আর দমবন্ধের ভেতর হারিয়ে যাওয়া একটি জীবনকে বাঁচিয়ে দিতে পারে।
একজন ডাক্তার হিসাবে অন্যান্য ডাক্তারদের প্রতি আমার অনুরোধ চিকিৎসা দেয়ার আগে শুধু রিপোর্ট না বরং একজন রোগীকে যেন আগে গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। আর একজন রোগীকে যেন সেই চিকিৎসাটাই দেন যে চিকিৎসা তিনি নিজে রোগী হিসাবে প্রত্যাশা করেন।
Arif Mahmud
জানুয়ারি ১, ২০২৬ সাল।