30/08/2026
আপনার বাচ্চা যখন দোকানে গিয়ে একটা খেলনা দেখে সেটা কিনে দেওয়ার জন্য কান্না শুরু করে তখন আপনি কী করেন? আশেপাশের মানুষ তাকাচ্ছে দেখে শেষ পর্যন্ত হয়তো খেলনাটা কিনেই দেন। কারণ তখন আমাদের একটাই চিন্তা থাকে, বাচ্চাটা চুপ করুক। কিন্তু এখানেই parenting-এর একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তৈরি হয়। শিশুকে শুধু চুপ করিয়ে দেওয়া আর শিশুকে ধীরে ধীরে নিজের আবেগ ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখানো এক বিষয় নয়।
জাপানি শিশুদের সামাজিক দক্ষতা নিয়ে করা একটি বড় গবেষণায় ২ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের cooperation, self-control এবং assertion-এর বিকাশ পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল। সেখানে দেখা যায় কিছু নির্দিষ্ট parenting practice এই দক্ষতাগুলোর বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষ করে শিশুর সঙ্গে মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে যুক্ত থাকা, সামাজিকভাবে তাকে উদ্দীপিত করা এবং অতিরিক্ত শাস্তি বা নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে চলার মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
তাহলে কি জাপানের বাবা-মায়ের কোনো গোপন রহস্য আছে?
না।
বরং তাদের parenting নিয়ে গবেষণা আমাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করতে শেখায়।
আমরা কি সন্তানকে সবসময় নিয়ন্ত্রণ করতে চাই, নাকি তাকে ধীরে ধীরে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখাতে চাই?
১. শিশুর হয়ে সবকিছু করে দেবেন না।
আমাদের দেশে সন্তানকে ভালোবাসার একটা স্বাভাবিক প্রকাশ হলো তার কাজগুলো করে দেওয়া। মা জুতা পরিয়ে দিচ্ছেন, ব্যাগ গুছিয়ে দিচ্ছেন, খেলনা তুলে রাখছেন। সন্তান কোনো সমস্যায় পড়লে মা-বাবা সঙ্গে সঙ্গে সমাধান করে দিচ্ছেন।
উদ্দেশ্য অবশ্যই ভালো। কিন্তু শিশু যদি নিজের বয়স অনুযায়ী কিছু কাজ করার সুযোগই না পায় তাহলে নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে শেখার সুযোগটাও কমে যায়।
তাই আপনার সন্তান নিজে জুতা পরতে চাইলে একটু সময় বেশি লাগলেও তাকে চেষ্টা করতে দিন। খেলনা নিয়ে খেলা শেষ হলে বলুন, “চলো এবার দুজন মিলে এগুলো গুছিয়ে রাখি।” কোনো ছোট সমস্যায় পড়লে সঙ্গে সঙ্গে সমাধান না করে আগে জিজ্ঞেস করুন, “তুমি কীভাবে এটা ঠিক করতে পারো বলে মনে হচ্ছে? কীভাবে কি করলে ভালো হয় বলোতো?”
জাপানি parenting নিয়ে গবেষণায় শিশুদের autonomy বা নিজের মতো করে কিছু করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। তবে স্বাধীনতা সেখানে সীমাহীন নয়। বয়স অনুযায়ী স্বাধীনতার সঙ্গে সামাজিক নিয়ম ও দায়িত্বও থাকে।
২. বাচ্চা রাগ করলে শুধু চুপ করাবেন না।
ধরুন আপনার সন্তান একটা খেলনা চেয়েছে কিন্তু আপনি কিনে দেননি। সে রাগ করে কান্না করছে।
আমরা হয়তো বলে ফেলি, “চুপ করো। এত কান্না করছ কেন?”
কিন্তু শিশুর রাগ হওয়াটাকে অস্বীকার না করে তাকে সেই অনুভূতিটা বুঝতে শেখানো যায়।
আপনি বলতে পারেন, “তুমি খেলনাটা না পেয়ে রাগ করেছো সেটা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু রাগ করলেও আমরা কাউকে মারব না বা জিনিস ছুড়ে ফেলব না। একটু শান্ত হও তারপর আমরা কথা বলব।”
এখানে শিশুকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। আবার তার অনুভূতিকেও ছোট করা হচ্ছে না। তাকে শেখানো হচ্ছে অনুভূতি থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু সেই অনুভূতির কারণে যেকোনো আচরণ করা ঠিক নয়।
জাপানে preschool শিশুদের নিয়ে একটি গবেষণায় social-emotional learning কার্যক্রমের পর শিশুদের self-control এবং cooperation উন্নত হতে দেখা গেছে।
৩. ছোটবেলা থেকেই দায়িত্বের অভ্যাস তৈরি করুন।
আপনার তিন বছরের সন্তান খেলনা নিয়ে খেলেছে। খেলা শেষ হওয়ার পর প্রতিবার আপনি যদি সব খেলনা নিজেই তুলে রাখেন তাহলে সে ধীরে ধীরে ধরে নিতে পারে এই কাজটা মায়ের।
তার বদলে বলুন, “চলো খেলনাগুলো এবার জায়গামতো রাখি।”
তিন বা চার বছর বয়সে খেলনা গুছিয়ে রাখা, নিজের বই নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা কিংবা ময়লা কাগজ ডাস্টবিনে ফেলার মতো ছোট দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের ব্যাগ গোছানো, পোশাক প্রস্তুত করা কিংবা নিজের ঘর গোছানোর মতো দায়িত্বও ধীরে ধীরে দেওয়া যায়।
তবে এখানে একটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্ব মানে শিশুর ওপর চাপ তৈরি করা নয়। তার বয়স, সক্ষমতা ও নিরাপত্তা বিবেচনা করে কাজ দিতে হবে।
৪. সব সমস্যায় সঙ্গে সঙ্গে সন্তানের হয়ে দাঁড়াবেন না।
বাচ্চা বন্ধুর সঙ্গে খেলতে গিয়ে ঝামেলায় পড়েছে। সঙ্গে সঙ্গে মা গিয়ে সমস্যার সমাধান করে দিলেন।বাচ্চা কারও সঙ্গে কথা বলতে পারছে না। মা তার হয়ে উত্তর দিয়ে দিলেন।
এভাবে আমরা হয়তো সেই মুহূর্তের সমস্যাটা সহজ করে দিচ্ছি। কিন্তু সবসময় যদি সন্তানের হয়ে কথা বলা হয় তাহলে নিজের সামাজিক পরিস্থিতি সামলানোর সুযোগ সে কম পাবে।
জাপানি শিশুদের নিয়ে গবেষণায় cooperation, self-control এবং assertion-এর বিকাশের সঙ্গে বিভিন্ন parenting practice-এর সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অর্থাৎ শিশুকে শুধু নিয়ন্ত্রণ করা নয়, তার সঙ্গে যুক্ত থাকা এবং সামাজিকভাবে শেখার সুযোগ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
তাই সন্তান কোনো ছোট সমস্যায় পড়লে প্রথমেই এগিয়ে না গিয়ে জিজ্ঞেস করতে পারেন,
“তুমি কী মনে করো, এটা কীভাবে ঠিক করা যায়?”
হয়তো প্রথমবার সে পারবে না। তবুও তাকে ভাবার সুযোগ দিন।
বাংলাদেশের বাবা-মায়ের জন্য আসল শিক্ষাটা কী এগুলো থেকে?
জাপানের parenting model হুবহু আমাদের পরিবারে কপি করার প্রয়োজন নেই। আমাদের সংস্কৃতি, পরিবার এবং বাস্তবতা আলাদা। কিন্তু তাদের parenting নিয়ে গবেষণা থেকে একটা সুন্দর শিক্ষা নেওয়া যায়।
সন্তানকে ভালোবাসা মানে তার হয়ে সারাজীবন সবকিছু করে দেওয়া নয়। আজ আপনি তার জুতা পরিয়ে দিচ্ছেন, ব্যাগ গুছিয়ে দিচ্ছেন, খেলনা তুলে রাখছেন কারণ সে ছোট। কিন্তু একদিন এই শিশুটাকেই নিজের জীবন সামলাতে হবে। তাই ছোটবেলা থেকেই তাকে নিজের কাজ করার সুযোগ দিন। ভুল করলে আবার চেষ্টা করতে দিন। রাগ করলে নিজের অনুভূতি বুঝতে শেখান। কোনো ছোট সমস্যায় পড়লে একটু ভাবার সময় দিন।
আপনার সন্তান আজ হয়তো খেলনা গুছাতে গিয়ে পাঁচ মিনিট বেশি সময় নেবে। জামা পরতে গিয়ে উল্টো করে পরবে। নিজের ব্যাগ গোছাতে গিয়ে একটা বই রেখে আসবে।
তবুও তাকে করতে দিন।
কারণ আপনি যে কাজটা দুই মিনিটে করে দিতে পারতেন সেটা হয়তো তার জন্য আগামী দিনের একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
আজকের ছোট দায়িত্বই একদিন তার আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি হতে পারে।
আর একজন বাবা-মা হিসেবে আমাদের লক্ষ্য শুধু এমন সন্তান তৈরি করা নয় যে আমাদের কথা শুনবে। বরং এমন একজন মানুষ তৈরি করা, যে একদিন আমরা পাশে না থাকলেও নিজের জীবনটা দায়িত্ব নিয়ে সামলাতে পারবে।
সন্তানের হয়ে সবকিছু করে দেওয়া ভালোবাসা হতে পারে কিন্তু তাকে নিজের কাজ নিজে করতে শেখানোও ভালোবাসারই আরেকটি রূপ।