18/06/2026
বদনজর ও হাসাদ: পর্ব - ৩
ইমাম ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন:
"মানুষ নিজের অজান্তেই নিজের ওপর বদনজর দিয়ে ফেলে। যখন সে নিজের কোনো বিষয় দেখে খুব বেশি আনন্দিত বা বিস্মিত হয়, কিন্তু আল্লাহর বরকতের কথা স্মরণ করে না, তখন তার নিজের দৃষ্টিই বিষাক্ত তীরের মতো নিজের ক্ষতি করে।" তাই নিজের আয়নায় নিজের চেহারা দেখার সময়, নিজের সন্তানকে আদর করার সময় বা নিজের ব্যাংক ব্যালেন্স/সম্পদ দেখার সময় সর্বদা মুখ ফুটে ‘মাশাআল্লাহ’ বা ‘আল্লাহুম্মা বারিক’ বলা উচিত।
আজকের পর্বে আমরা কুরআন এবং হাদিস থেকে কিছু দলিল জানবো ইনশাআল্লাহ।
#কোরআন থেকে দলিল
১. সূরা ইউসুফ (আয়াত: ৫)
হযরত ইয়াকুব (আ.) যখন বুঝতে পেরেছিলেন যে হযরত ইউসুফ (আ.)-এর একটি বিশেষ মর্যাদা রয়েছে এবং তাঁর ভাইদের মনে হিংসার উদ্রেক হতে পারে, তখন তিনি তাঁকে তাঁর স্বপ্নের কথা ভাইদের কাছে বলতে নিষেধ করেছিলেন। মুফাসসিরদের মতে, এর অন্যতম কারণ ছিল হিংসা থেকে সৃষ্ট বদনজর।
قَالَ يَا بُنَيَّ لَا تَقْصُصْ رُؤْيَاكَ عَلَىٰ إِخْوَتِكَ فَيَكِيدُوا لَكَ كَيْدًا ۖ إِنَّ الشَّيْطَانَ لِلْإِنسَانِ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
অর্থ: "তিনি (ইয়াকুব) বললেন, হে আমার প্রিয় বৎস! তোমার এই স্বপ্নের কথা তোমার ভাইদের কাছে বলো না; তাহলে তারা তোমার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র করবে। নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।"
ব্যাখ্যা: ইমাম ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন, মানুষের ভেতরের হিংসা যখন তীব্র রূপ নেয়, তখন তা দৃষ্টির মাধ্যমে তীরের মতো নির্গত হয়। ইয়াকুব (আ.) জানতেন যে ইউসুফের প্রতি ভাইদের ঈর্ষা বদনজরের মাধ্যমে তাঁর ক্ষতি করতে পারে।
২. সূরা আল-কাহফ (আয়াত: ৩৯)
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে নিজের কোনো নিয়ামত বা অন্যের কোনো সুন্দর জিনিস দেখলে অহংকার না করে আল্লাহর শুকরিয়া ও বরকতের দোয়া করার শিক্ষা দিয়েছেন। এটি বদনজর প্রতিরোধে সবচেয়ে বড় ঢাল:
وَلَوْلَا إِذْ دَخَلْتَ جَنَّتَكَ قُلْتَ مَا شَاءَ اللَّهُ لَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ
অর্থ: "আর তুমি যখন তোমার বাগানে প্রবেশ করলে, তখন কেন বললে না— ‘আল্লাহ যা চেয়েছেন তা-ই হয়েছে, আল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তি নেই’?"
ব্যাখ্যা: হাফেজ ইবনে কাসির (রহ.) এই আয়াতের অধীনে লিখেছেন, সালাফদের (পূর্বসূরি আলেমদের) নিয়ম ছিল— যখনই তারা নিজেদের সন্তান, সম্পদ বা কোনো চমৎকার অবস্থা দেখতেন, তখন এই আয়াতটি তিলাওয়াত করতেন, যাতে নিজের অজান্তেও নিজের কোনো জিনিসে বদনজর না লেগে যায়।
৩. সূরা আল-ক্বালাম (আয়াত: ৫১)
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِن يَكَادُ الَّذِينَ كَفَرُوا لَيُزْلِقُونَكَ بِأَبْصَارِهِمْ لَمَّا سَمِعُوا الذِّكْرَ وَيَقُولُونَ إِنَّهُ لَمَجْنُونٌ
অর্থ: "কাফেররা যখন উপদেশ বাণী (কুরআন) শোনে, তখন তারা যেন তাদের চোখ বা দৃষ্টি দিয়ে আপনাকে আছাড় দিয়ে ফেলে দেবে (ক্ষতি করবে)। আর তারা বলে, সে তো এক পাগল।"
ব্যাখ্যা: ইবনে আব্বাস (রা.)-সহ বহু মুফাসসিরের মতে, এখানে কাফেরদের হিংসা ও কুদৃষ্টির (বদনজরের) মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ক্ষতি করার চেষ্টার কথা বলা হয়েছে।
৪. সূরা আল-ফালাক (আয়াত: ৫)
বদনজরের মূলে থাকে মানুষের হিংসা বা ঈর্ষাকাতর দৃষ্টি। আল্লাহ তাআলা এই সূরায় হিংসুকের নজর ও অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন:
وَمِن شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ
অর্থ: "এবং (আমি আশ্রয় চাই) হিংসুকের অনিষ্ট থেকে, যখন সে হিংসা করে।"
ব্যাখ্যা: ইমাম ইবনুল কায়্যিম (রহ.) সহ বহু স্কলার বলেছেন, প্রত্যেক বদনজরকারীই মূলত হিংসুক, কিন্তু প্রত্যেক হিংসুক সরাসরি বদনজর দিতে পারে না। যখন কোনো হিংসুক ব্যক্তি তার হিংসাপূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে কারও দিকে তাকায়, তখন তার আত্মা থেকে একটি বিষাক্ত বা ক্ষতিকর প্রভাব নির্গত হয়, যা অন্য ব্যক্তির ক্ষতি করে।
#হাদীস থেকে দলিল
১. পাহাড়ের চূড়া থেকে আছড়ে ফেলা:
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«العَيْنُ حَقٌّ، تَسْتَنْزِلُ الحَالِقَ»
অর্থ: "বদনজর একটি ধ্রুব সত্য, এটি (পাহাড়ের) সুউচ্চ চূড়া থেকে (শক্তিশালী মানুষকে) নিচে আছড়ে ফেলে।" — [মুসনাদে আহমাদ, সিলসিলাহ সহীহাহ: ১২৫২]
ব্যাখ্যা: এর অর্থ হলো, একজন পাহাড়ের চূড়ার মতো শক্তিশালী ও নিরাপদ স্থানে থাকা মানুষও বদনজরের তীব্র প্রভাবে মুহূর্তে ধ্বংস বা নিচে পতিত হতে পারে।
২. জিনদের বদনজরও সত্য:
বদনজর শুধু মানুষেরই লাগে না, বরং জিন জাতিও মানুষকে বদনজর দিতে পারে। হাদিসে এ বিষয়ে পরিষ্কার সতর্কতা এসেছে:
উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালামাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা.) তাঁর ঘরে একটি ছোট মেয়েকে দেখলেন যার চেহারায় কালচে দাগ ছিল। তখন তিনি বললেন:
«اسْتَرْقُوا لَهَا، فَإِنَّ بِهَا النَّظْرَةَ»
অর্থ: "তোমরা এই মেয়েটির জন্য রুকইয়াহর ব্যবস্থা করো, কেননা তার বদনজর লেগেছে।" — [সহীহ বুখারী: ৫৭৩৯]
ব্যাখ্যা: ইমাম ইবনুল কায়্যিম (রহ.) এবং হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন যে, আবু বকর ইবনে আবু শায়বাহর বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তাকে জিনদের বদনজর লেগেছে।" অর্থাৎ, মানুষের মতো জিনদের কুদৃষ্টিও মানুষের ক্ষতি করে।
৩. ভাগ্যকে অতিক্রম করার ক্ষমতা
আল্লাহর রাসূল (সা.) আরও বলেছেন:
لَوْ كَانَ شَىْءٌ سَابَقَ الْقَدَرَ سَبَقَتْهُ الْعَيْنُ
অর্থ: "যদি ভাগ্যকে কোনো কিছু অতিক্রম করতে পারত, তবে বদনজরই তাকে অতিক্রম করত।" — [সহীহ মুসলিম: ২১৮৮]
৪. উম্মতের মৃত্যুর অন্যতম কারণ
জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
أَكْثَرُ مَنْ يَمُوتُ مِنْ أُمَّتِي بَعْدَ كِتَابِ اللَّهِ وَقَضَائِهِ وَقَدَرِهِ بِالْأَنْفُسِ» (يعني بالعين)
অর্থ: "আল্লাহর কিতাব, ফয়সালা এবং তাকদীরের পর আমার উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যাবে বদনজরের কারণে।" — [আল-বানি, সহীহুল জামি‘: ১২০৬]
৫. নিয়ামত গোপন রাখার শিক্ষা
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«اسْتَعِينُوا عَلَى إِنْجَاحِ الْحَوَائِجِ بِالْكِتْمَانِ، فَإِنَّ كُلَّ ذِي نِعْمَةٍ مَحْسُودٌ»
অর্থ: "তোমরা তোমাদের উদ্দেশ্য বা হাজতগুলো গোপন রাখার মাধ্যমে তা সফল করার সাহায্য নাও। কারণ, প্রতিটি নিয়ামতপ্রাপ্ত ব্যক্তিই (মানুষের) হিংসার শিকার হয়।" — [তাবারানী, সিলসিলাহ সহীহাহ: ১৪৫৩]
পশু-পাখি, জড়বস্তু এবং শিশুদের ওপর প্রভাব:
বদনজর যে শুধু মানুষের ওপর কাজ করে তা নয়, পশু-পাখি বা জড়বস্তুর ওপরও এর প্রভাব পড়ে। জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«إن العين لتولج الرجل القبر، وتولج الجمل القدر»
ব্যাখ্যা: মুহাদ্দিসগণ বলেন, সুস্থ-সবল ও তেজী ঘোড়া বা উট হঠাৎ করে তীব্র বেগে ছুটতে ছুটতে আছাড় খেয়ে পা ভেঙে ফেলে বা মারা যায় মানুষের অতিরিক্ত প্রশংসা বা হিংসাত্মক নজর লাগার কারণে।
শিশুদের ওপর প্রভাব:
হযরত আসমা বিনতে আবি বকর (রা.)-এর একটি বর্ণনা থেকে জানা যায়, মদীনার নারী ও শিশুরা যখন কোনো নবজাতককে দেখতে আসত, তখন তারা খুব সতর্ক থাকত।
আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) কোনো এক আনসারী সাহাবীর বাড়ি গিয়ে একটি শিশুকে কাঁদতে দেখে বললেন:
"তোমাদের এই শিশুটি কেন এভাবে কাঁদছে? তোমরা কি একে বদনজর থেকে বাঁচানোর জন্য রুকইয়াহ করছ না?" — [মুসনাদে আহমাদ]
ব্যাখ্যা: ছোট শিশুরা কোনো কারণ ছাড়া, পেটে ব্যথা বা ক্ষুধা ছাড়া যদি একটানা কাঁদতে থাকে এবং কিছুতেই শান্ত না হয়, তবে সুন্নাহর দৃষ্টিতে ধরে নেওয়া হয় তার উপর কারও নজর লেগেছে।
আল্লাহ আমাদেরকে সকল বদনজর ও হাসাদ থেকে হেফাজত করুন এবং কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করার তৌফিক দান করুন। আমীন।
#নজর #বদনজর #হাসাদ #হিংসা #রুকইয়াহ #কুদৃষ্টি