07/05/2026
হাম (Measles) — লক্ষণ, প্রতিকার, জটিলতা ও প্রতিরোধঃ
হাম (Measles) একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা *Measles virus* দ্বারা সৃষ্টি হয়। এটি প্রধানত শিশুদের আক্রান্ত করলেও, টিকা না নেওয়া যেকোনো বয়সের মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি, হাঁচি বা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ভাইরাস বাতাসে ছড়িয়ে দেন, এবং সেই ভাইরাস সহজেই অন্যের শরীরে প্রবেশ করে।
একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে প্রায় ৯০% অনাক্রম্যহীন ব্যক্তি সংক্রমিত হতে পারে। তাই হামকে পৃথিবীর অন্যতম দ্রুত ছড়ানো সংক্রামক রোগ বলা হয়।
হামের প্রধান লক্ষণসমূহঃ
হামের উপসর্গ সাধারণত ভাইরাস শরীরে প্রবেশের ৭–১৪ দিনের মধ্যে দেখা দেয়। রোগটি কয়েকটি ধাপে প্রকাশ পায়।
১. প্রাথমিক লক্ষণ (Prodromal Stage)
প্রথম দিকে সাধারণ সর্দি-জ্বরের মতো উপসর্গ দেখা যায়—
* উচ্চমাত্রার জ্বর (১০৩–১০৪°F বা তার বেশি)
* শুকনো ও তীব্র কাশি
* নাক দিয়ে পানি পড়া
* গলা ব্যথা
* দুর্বলতা ও ক্লান্তি
* ক্ষুধামন্দা
২. চোখের সমস্যা
* চোখ লাল হয়ে যাওয়া (Conjunctivitis)
* চোখ দিয়ে পানি পড়া
* আলো সহ্য করতে কষ্ট হওয়া
৩. কপলিক স্পট (Koplik Spots)
হামের একটি বিশেষ লক্ষণ হলো মুখের ভেতরে গালের পাশে ছোট ছোট সাদা দাগ দেখা দেওয়া।
এগুলো সাধারণত র্যাশ ওঠার ১–২ দিন আগে দেখা যায় এবং হামের নিশ্চিত লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
৪. র্যাশ বা ফুসকুড়ি
* প্রথমে কানের পেছন ও মুখে শুরু হয়
* পরে ঘাড়, বুক, পিঠ ও পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে
* লালচে ও চ্যাপ্টা ফুসকুড়ি দেখা যায়
* অনেক সময় চুলকানিও হতে পারে
র্যাশ সাধারণত ৫–৬ দিন স্থায়ী হয়।
হাম কীভাবে ছড়ায়?
হাম অত্যন্ত সহজে ছড়ায়। সংক্রমণের মাধ্যমগুলো হলো—
* আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচি
* বাতাসে ভাসমান ভাইরাস
* আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহার করা জিনিসপত্র
* ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ
ভাইরাস বাতাসে প্রায় ২ ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে।
🕸কারা বেশি ঝুঁকিতে?
নিম্নোক্ত ব্যক্তিদের ঝুঁকি বেশি—
* টিকা না নেওয়া শিশু
* অপুষ্টিতে ভোগা শিশু
* গর্ভবতী নারী
* দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি
* ভিটামিন-এ এর ঘাটতিযুক্ত শিশু
হামের জটিলতাঃ
অনেক ক্ষেত্রে হাম নিজে নিজে ভালো হলেও কখনো কখনো মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
সাধারণ জটিলতাঃ
* নিউমোনিয়া
* কানের ইনফেকশন
* ডায়রিয়া
* পানিশূন্যতা
* ব্রঙ্কাইটিস
গুরুতর জটিলতাঃ
* মস্তিষ্কে প্রদাহ (Encephalitis)
* খিঁচুনি
* অন্ধত্ব
* তীব্র অপুষ্টি
* মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে
বিশেষ করে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি।
হামের প্রতিকার ও করণীয়ঃ
হামের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। তাই চিকিৎসা মূলত উপসর্গ কমানো ও জটিলতা প্রতিরোধের জন্য করা হয়।
১. পর্যাপ্ত বিশ্রাম
রোগীকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে।
অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলা জরুরি।
২. প্রচুর তরল খাবার
পানিশূন্যতা ঠেকাতে—
* বিশুদ্ধ পানি
* ওরস্যালাইন
* ডাবের পানি
* ফলের রস
* স্যুপ
বেশি বেশি খাওয়াতে হবে।
৩. পুষ্টিকর খাবার
সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে—
* খিচুড়ি
* দুধ
* ডিম
* মাছ
* ফলমূল
* শাকসবজি
৪. জ্বর নিয়ন্ত্রণ
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী—
* Paracetamol
* Ibuprofen
ব্যবহার করা যেতে পারে।
⚠️ শিশুদের ক্ষেত্রে অ্যাসপিরিন দেওয়া উচিত নয়, কারণ এতে Reye’s syndrome নামক মারাত্মক জটিলতা হতে পারে।
৫. ভিটামিন-এ ক্যাপসুল
ভিটামিন-এ হামের জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন-এ দেওয়া হয়।
৬. শরীর পরিষ্কার রাখা
* কুসুম গরম পানি দিয়ে শরীর মুছে দেওয়া
* পরিষ্কার কাপড় ব্যবহার
* চোখ পরিষ্কার রাখা
এসব রোগীকে আরাম দেয়।
৭. রোগীকে আলাদা রাখা
হাম খুব সংক্রামক হওয়ায়—
* রোগীকে আলাদা ঘরে রাখতে হবে
* অন্য শিশুদের দূরে রাখতে হবে
* মাস্ক ব্যবহার করা ভালো
সাধারণত র্যাশ ওঠার পর অন্তত ৭–১০ দিন সতর্ক থাকতে হয়।
🕸 কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে?
নিচের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে—
* শ্বাসকষ্ট
* খিঁচুনি
* অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
* চোখ থেকে পুঁজ পড়া
* তীব্র ডায়রিয়া
* অতিরিক্ত দুর্বলতা
* পানি খেতে না পারা
* জ্বর দীর্ঘদিন থাকা
🕸 হামের প্রতিরোধ
১. টিকাঃ (MR/MMR Vaccine)
হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকা।
বাংলাদেশে সাধারণত—
* ৯ মাস বয়সে MR টিকা
* ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ
দেওয়া হয়।
টিকা শরীরে দীর্ঘমেয়াদি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে।
২. পরিচ্ছন্নতাঃ
* কাশি-হাঁচির শিষ্টাচার মানা
* হাত ধোয়া
* ভিড় এড়িয়ে চলা
* আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ কমানো
সংক্রমণ কমাতে সাহায্য করে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্যঃ
* হাম ভাইরাসজনিত রোগ; তাই অ্যান্টিবায়োটিক সরাসরি হাম সারায় না।
* তবে ব্যাকটেরিয়াজনিত জটিলতা হলে চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক দিতে পারেন।
* টিকা নেওয়া ব্যক্তিদের হাম হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম।
* অপুষ্ট শিশুদের ক্ষেত্রে হাম বেশি মারাত্মক হতে পারে।
উপসংহারঃ
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক হলেও প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সময়মতো টিকা গ্রহণ, সঠিক পরিচর্যা, পুষ্টিকর খাবার এবং দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে ওঠে। তবে অবহেলা করলে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহসহ মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই সচেতনতা ও প্রতিরোধই হামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।