25/06/2026
কুদৃষ্টি বা বদনজর: ইসলামে এর প্রভাব ও বাঁচার উপায়
পরশ্রীকাতরতা বা হিংসা মানুষের মনকে যেমন বিষাক্ত করে, তেমনি অন্যের অর্জনের দিকে হিংসুটে মনের ক্ষতিকর দৃষ্টি অন্যের বড় ধরনের ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। ইসলামে একেই বলা হয় 'বদনজর' বা কুদৃষ্টি। বদনজর যে কেবল একটি কুসংস্কার নয়, বরং একটি বাস্তব সত্য—তা স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের সতর্ক করে গিয়েছেন।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন:
"বদনজর লাগা একটি সত্য ব্যাপার।" (আবু দাউদ, হাদিস: ৩৮৭৯)
তাই নিজের জীবন, সন্তান-সন্ততি, পরিবার এবং কষ্টার্জিত সম্পদকে মানুষের কুদৃষ্টি থেকে আড়ালে রাখা এবং মহান আল্লাহর কাছে নিয়মিত আশ্রয় চাওয়া আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব।
শিশুদের ওপর বদনজরের প্রভাব:
বদনজরের প্রভাব এতটাই তীব্র হতে পারে যে, নিষ্পাপ ও কোমলমতি শিশুরাও এর কারণে হুট করে নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হতে পারে।
★হাদিসের প্রমাণ: আম্মাজান উম্মে সালামা (রা.) বলেন, একদিন মহানবী (সা.) তাঁর ঘরে এক মেয়ের চেহারা মলিন (বিবর্ণ) দেখলেন। তখন তিনি বললেন, "তাকে ঝাড়ফুঁক করাও, কেননা তার ওপর নজর লেগেছে।" (বুখারি, হাদিস: ৫৭৩৯)
★তাকদির ও বদনজর: উবায়দ ইবনে রিফাআ (রা.) থেকে বর্ণিত, আসমা বিনতে উমায়স (রা.) যখন রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন যে জাফরের সন্তানদের দ্রুত নজর লেগে যায়, তাই তিনি ঝাড়ফুঁক করতে পারবেন কি না; তখন নবীজি (সা.) বলেন— "হ্যাঁ, কোনো জিনিস যদি তাকদিরকে অতিক্রম করার মতো হতো, তবে বদনজর তা অবশ্যই অতিক্রম করত।" (তিরমিজি, হাদিস: ২০৫৯)
বদনজর ও জাদুটোনা থেকে বাঁচার ৩টি কোরআনি আমল:
আমাদের প্রিয় নবীজি (সা.) নিজে বদনজর ও অনিষ্ট থেকে বাঁচতে পবিত্র কোরআনের বিশেষ কিছু সুরা নিয়মিত আমল করতেন। সাহাবি আবু সাঈদ (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, সুরা ফালাক ও সুরা নাস (মুআউওজাতাইন) নাজিল হওয়ার পর রাসুল (সা.) জিন ও বদনজর থেকে বাঁচার জন্য অন্য সব মাধ্যম ছেড়ে এই দুটি সুরাকেই স্থায়ী আমল হিসেবে গ্রহণ করেন। (তিরমিজি, হাদিস: ২০৫৮)
শোবার আগে নবীজি (সা.)-এর নিয়মিত আমলের পদ্ধতিটি ছিল নিম্নরূপ:
★তিন সুরা পাঠ: প্রতি রাতে বিছানায় যাওয়ার পর দুই হাতের তালু একত্র করে সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক এবং সুরা নাস পাঠ করতেন।
★হাতে ফুঁ দেওয়া: সুরাগুলো পড়া শেষে নিজের দুই হাতের তালুতে ফুঁ দিতেন।
★দেহ মাসেহ করা: এরপর দুই হাত দিয়ে মাথা, চেহারা ও শরীরের সামনের দিক থেকে শুরু করে যতটুকু অংশ হাত পৌঁছায়, ততটুকু অংশ মাসেহ (মুছে নিতেন) করতেন। এভাবে পুরো প্রক্রিয়াটি তিনি ৩ বার পুনরাবৃত্তি করতেন। (বুখারি, হাদিস: ৫০১৭, ৫৭৪৮)
বদনজর লেগে গেলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা:
যদি নিশ্চিত হওয়া যায় যে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির কুদৃষ্টি লেগেছে, তবে ইসলামে তার একটি চমৎকার ও অলৌকিক নিরাময় পদ্ধতি রয়েছে।
ইবনে মাজাহ শরিফের (হাদিস: ৩৫০৯) একটি দীর্ঘ হাদিস থেকে জানা যায়, সাহাবি সাহল ইবনে হুনাইফ (রা.)-এর সুঠাম শরীর দেখে অন্য এক সাহাবি প্রশংসা করার পর পরই সাহল (রা.) অসুস্থ ও বেহুঁশ হয়ে পড়েন। ঘটনাটি রাসুল (সা.)-এর কাছে পৌঁছালে তিনি বলেন— "তোমাদের কেউ তার ভাইয়ের মনোমুগ্ধকর কিছু দেখলে যেন তার জন্য বরকতের দোয়া করে (যেমন: মা-শা-আল্লাহ, বারাকাল্লাহ)।"
চিকিৎসা পদ্ধতি:
নবীজি (সা.)-এর নির্দেশনায় সেই দৃষ্টি দেওয়া ব্যক্তিকে অজু করানো হয়। তার মুখমণ্ডল, দুই হাত, দুই পা এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধোয়ার পর পাত্রের অবশিষ্ট পানিটুকু আক্রান্ত ব্যক্তির (সাহল রা.) পিঠের দিক থেকে ঢেলে দেওয়া হয়। অলৌকিকভাবে, পানি ঢালার পরপরই তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন।
আমাদের করণীয়:
নিজের বা অন্যের কোনো সুন্দর জিনিস দেখলে সবসময় "মা-শা-আল্লাহ" বা "বারাকাল্লাহু ফিক" (আল্লাহ আপনাকে বরকত দিন) বলার অভ্যাস করা।
সকাল-সন্ধ্যার জিকির ও দোয়া নিয়মিত করা।
ঘুমানোর আগে সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়ে শরীর মাসেহ করার সুন্নতি আমলটি জীবিত রাখা।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে এবং আমাদের পরিবারকে মানুষের হিংসা ও কুদৃষ্টির অনিষ্ট থেকে হেফাজত করুন। আমিন।