25/05/2026
অসুস্থ হলে ‘নেয়ামতে ভুগছি’ বলা উচিত নয় কেন?
আগে একাধিকবার এ বিষয়ে লিখেছি। পোস্ট-কমেন্ট মিলিয়ে বিভিন্ন পয়েন্ট বিক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরেছি। পাঠকের সুবিধার্থে এই পোস্টে পয়েন্টগুলো একসঙ্গে লিখলাম। পুরোটা পড়ে সিদ্ধান্ত নিন।
১। আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতে মানুষকে দুই ধরনের বিষয় দান করেন। একটি নেয়ামত, যা কাঙ্খিত, তার উপর শোকর করতে হয়। অন্যটি মুসিবত, যা অনাকাঙ্খিত, তার উপর সবর করতে হয়। কুরআন-হাদিসের বিভিন্ন স্থানে পাশাপাশি নেয়ামত-মুসিবত ও শোকর-সবরের আলোচনা রয়েছে।
অসুস্থতা মানবজীবনের একটি অনাকাঙ্খিত বিষয়। মুসিবত ও পরীক্ষা। মুমিনের দায়িত্ব এর উপর সবর করা ও আল্লাহর সাহায্য চাওয়া। কেউ যদি অসুস্থতাকে সরাসরি ‘নেয়ামত’ আখ্যা দেয়, তাহলে অন্য অনেক বিষয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হবে। যেমন সে বলবে, ‘অসুস্থতার নেয়ামতে ভুগছি’, অথচ নেয়ামত ভোগার জিনিস নয়, উপভোগ করার জিনিস। সে বলবে, ‘অসুস্থতার নেয়ামতে আছি, সুস্থতার দোয়া চাই’, এখানে সে বাহ্যত নেয়ামত দূর হওয়ার দোয়া চাইল।
এভাবে বড় একটি জটিলতার সৃষ্টি হয়। নেয়ামত বলতে ইসলাম যে ধারনা দিয়েছে, তা বিনষ্ট হয়। প্রকারান্তরে আল্লাহর নেয়ামতের মানহানি হয়।
২। অনেকে ভাবে, অসুস্থতাকে নেয়ামত বলা আদবের দাবি। অথচ নবী আইয়ুব আ. আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করেছেন, رب إني مسني الضر। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তার এই দোয়া সর্বোচ্চ আদবের প্রকাশ। কিন্তু তিনি রোগকে নেয়ামত না বলে ‘যুর’ বা মুসিবত বলেছেন। তাহলে আমরা কি তার চেয়ে বেশি আদব দেখাতে চাই?
৩। রোগ যেহেতু একটি মুসিবত, আর যে-কোনও মুসিবতে সবর করলে আল্লাহ তায়ালা বিনিময় দেন; সে হিসেবে রোগ সাওয়াবের কারণ হয় বটে, কিন্তু সে দৃষ্টিকোণ থেকে রোগকে সরাসরি নেয়ামত বললে দুনিয়ার সকল মুসিবতই নেয়ামত। তখন মুসিবত বলে কিছু থাকবে না। আপনার বলতে হবে, ‘আল্লাহ আমাকে মায়ের মৃত্যুর নেয়ামত দান করেছেন’, ‘আমার ব্যবসায় লোকসানের নেয়ামত হয়েছে’, ‘মুসলমানরা যুদ্ধে পরাজয়ের নেয়ামত লাভ করেছেন’! হাস্যকর নয় কি?
৪। আল্লাহ তায়ালা নেয়ামতের হিসেব নেবেন এবং মুসিবতের উপর সাওয়াব দেবেন। ثم لتسألن يومئذ عن النعيم। রোগ যদি নেয়ামত হয়, তবে তার উপর হিসেব দিতে হবে যে, আপনি রোগকে কী কাজে ব্যয় করেছেন!
অদ্ভুত না?
৫। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তায়ালার কাছে রোগ থেকে আশ্রয় চেয়েছেন। তাহলে কি তিনি নেয়ামত থেকে আশ্রয় চেয়েছেন?
৬। মোটকথা, পরিণামে সাওয়াবের কারণ হওয়া আর সরাসরি নেয়ামত নামে ডাকা এক নয়। আল্লাহ তায়ালা যা মুসিবত হিসেবে দেন, তাকে মুসিবত হিসেবেই দেখতে হবে এবং তার সঙ্গে মুসিবতের মতোই আচরণ করতে হবে।
৭। কোনও বুযুর্গ যদি রোগকে সরাসরি নেয়ামত বলে থাকেন, তবে এটি তার ব্যক্তিগত হাল (বিশেষ অবস্থা)। বুযুর্গদের ব্যক্তিগত হাল অনুসরণযোগ্য হয় না। অনেক বুযুর্গ তো এমনকি রোগ হওয়ার জন্য দোয়া করতেন। সেটা কি অনুসরণীয়?
অতএব, অসুস্থ হলে বলুন-
‘অসুস্থতার পরীক্ষায় আছি, সুস্থতার নেয়ামতের জন্য দোয়া চাই।’
আল্লাহু আ‘লাম।
—মাওলানা নাঈম আবু বকর (হাফিজাহুল্লাহ)