09/08/2022
কাঠ বাদামের উপকারিতা কি – কিছুটা হলেও আমাদের ধারণা রয়েছে। তবে, বাস্তবতা হল, এই বাদামের খুব ভাল পুষ্টিগুনের কারণে আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি উপকারিতা রয়েছে।
এই পোষ্টে কাঠ বাদাম কি ধরণের বাদাম, কাঠ বাদামের উপকারিতা কি, দৈনিক কতটুকু খেতে হয় ও কিভাবে খেতে হয়- এসব বিষয়ে এই আর্টিকেলে কিছু প্রয়োজনিয় তথ্য উপস্থাপনের চেষ্টা করা হবে।
চলুন, শুরু করি।
Table of Contents
কাঠ বাদাম কি ধরণের বাদাম?
কাঠ বাদামের পুষ্টি গুন
কাঠ বাদামের উপকারিতা
এন্টি অক্সিডেন্ট হিসাবে কাঠবাদাম
ভিটামিন-ই এর উৎস হিসাবে কাঠবাদাম
রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রনে কাঠবাদাম
দেহে কোলেস্টেরল কমানোর কাজে কাঠবাদাম
ক্ষুধা কমানোর ক্ষেত্রে কাঠবাদাম
কাঠ বাদাম খাওয়ার নিয়ম
দৈনিক কতটুকু কাঠ বাদাম খাওয়া উচিত?
কাঠ বাদাম কি ধরণের বাদাম?
ইংরেজিতে এই বাদামকে almond বলা হয়। এটি গতানুগতিক অন্যান্য বাদামের মত নয়। ইহা এক প্রকার বৃক্ষ থেকে জন্মে যার বৈজ্ঞানিক নাম Prunus dulcis. ইহা ইরানের native বা স্থানীয় পর্যায়ে মত একটি বৃক্ষ। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই ইহা চাষ করা যায়।
গাছটির ফলের ভিতর থেকে যে বীজ সংগ্রহ করা হয় তাই হল এই বাদাম। বীজটি এক প্রকারের শক্ত আবরণ দিয়ে আবৃত থাকে। ফল পেকে যাওয়ার পর আবরণটি সরিয়ে ফেলে বীজ থেকে পৃথক করা হয়।
নিচে কাঠ বাদামের ছবি দেওয়া হল যেখানে গাছের ভিতর কিভাবে কাঠ বাদাম ফল হিসাবে তৈরি হয়, তা বুঝা যাবে।
কাঠ বাদামের ছবি
কাঠ বাদামের পুষ্টি গুন
এই ধরণের বাদাম উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার। তবে এর চর্বি হল মনো আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট যা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারি। এই ধরণের চর্বি ভাল কোলেস্টেরলের পরিমান বৃদ্ধির মাধ্যমে হার্টের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সহায়তা করে। এই বাদামে প্রোটিন এবং ফাইবার বেশি থাকে। এছাড়া, এরা প্রয়োজনিয় ভিটামিন ও খনিজ লবনের খুব ভাল এক উৎস।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ USDA, এর তথ্য মতে, প্রতি ১ আউন্স (২৮ গ্রাম) কাঠ বাদামে নিচের পুষ্টি উপাদানসমুহ পাওয়া যায়-
ক্যালরি: ১৬৪
চর্বি: ১৪.২ গ্রাম
কার্বোহাইড্রেট: ৬.১ গ্রাম
ফাইবার: ৩.৫ গ্রাম
সুগার: ১.২ গ্রাম
প্রোটিন: ৬ গ্রাম
কার্বোহাইড্রেট:
খাদ্যের ফাইবার এর খুব ভাল এক উৎসের নাম কাঠ বাদাম। অন্যান্য বাদামের তুলনায় এর glycemic index কম। যারা কম কার্বোহাইড্রেট বিশিষ্ট খাবার খোজ করেন, এটি তাদের জন্য একটি সুযোগ হতে পারে।
চর্বি: এটি যেহেতু চর্বি সমৃদ্ধ খাবার তাই প্রতি এক আউন্স পরিমান এটি খেলে আপনার চর্বি জাতীয় খাদ্যের দৈনিক চাহিদার প্রায় ২২% পূরণ হয়ে যাবে। এছাড়াও, এই বাদামের অধিকাংশ চর্বি মনো আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট হওয়ায় এটি হৃদরোগ ও হাই কোলেস্টেরলের জন্য খুব উপকারি।
প্রোটিন: উদ্ভিদজাত প্রোটিনের একটি অনন্য উৎস এই বাদাম। যেখানে আপনি স্বল্প মাত্রা হলেও সব ধরণে প্রয়োজনিয় এমাইনো এসিড পাবেন।
মাইক্রো নিউট্রিয়েন্টস: এর অর্থ হল ক্ষুদ্র আকারে পুষ্টি। আপনি জেনে অবাক হবেন, প্রতি আউন্স কাঠবাদাম খেলে আপনার ভিটামিন-ই এর দৈনিক চাহিদার প্রায় ৩৭% পুরণ হবে, ক্যালসিয়াম চাহিদার ৮% ও আয়রন চাহিদার ৬% পূরণ হবে। ভিটামিন-ই এন্টি অক্সিডেন্ট হিসাবে কাজ করে এবং এর আরোও অনেক উপকারিতা আছে। আবার, ক্যালসিয়াম আমাদের দেহের হাঁড় ও দাত গঠনে ও মজবুত রাখতে কাজ করে এবং আয়রন লোহিত রক্ত কনিকা তৈরিতে অপরিহার্য এক উপদান।
কাঠ বাদামের উপকারিতা
এই বাদাম সারা বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় খাবার। পুষ্টিগুনে ভরপূর হওয়ার ফলে কাঠ বাদামের উপকারিতা অনেক। নিচে এর কয়েকটি উপকারিতা উল্লেখ করা হল-
এন্টি অক্সিডেন্ট হিসাবে কাঠবাদাম
প্রাকৃতিকভাবে কাঠ বাদাম এন্টি অক্সিডেন্টের খুব ভাল এক উৎস যেখানে প্রচুর পরিমান এন্টি অক্সিডেন্ট থাকে। আর এই এন্টি অক্সিডেন্ট দেহকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস থেকে রক্ষা করে। এই অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ক্যানসারসহ অনেক জটিল রোগের কারণ হয়। কাঠবাদামের বাদামি রঙের আবরণে এন্টি অক্সিডেন্ট এর পরিমান বেশি থাকে। কাজেই, এটি খাওয়ার সময় লক্ষ রাখতে হবে যাতে এর আবরণ ফেলে দেওয়া না হয়।
৬০ জন ধুমপায়ি পুরষ মানুষের উপর পরিচালিত একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অংশ হিসাবে জনপ্রতি দৈনিক ৩ আউন্স বা ৮৪ গ্রাম কাঠবাদাম চার সপ্তাহ ধরে খাওয়ানো হয়। এরপর, তাদের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ২৩-৩৪% কমে যায়।
ভিটামিন-ই এর উৎস হিসাবে কাঠবাদাম
কাঠ বাদাম ভিটামিন-ই এর সবচেয়ে ভাল উৎস যা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। শুধু ১ আউন্স পরিমান এই বাদাম খেলে আপনার দৈনিক ভিটামিন-ই চাহিদার প্রায় ৩৭% পূরণ হয়ে যাবে।
ভিটামিন-ই যা চর্বিতে দ্রবনীয়। ফলে এই বাদাম চর্বি সমৃদ্ধ হওয়ায় এর ভিটামিন-ই খুব সহজেই শরীরে ব্যবহৃত হতে পারে। আমরা জানি, ভিটামিন-ই এন্টি অক্সিডেন্ট হিসাবে কাজ করে যা দেহের বিপাকীয় কার্যক্রমের ফলে উৎপাদিত ফ্রি রেডিক্যাল প্রশমনে অসামান্য ভূমিকা রাখে।
এই ফ্রি রেডিক্যাল প্রশমিত না করা গেলে এর আমাদের দেহে ক্যানসারসহ অনেক জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করে। বিভিন্ন গবেষণায় কাঠ বাদাম খাওয়ার খেলে হৃদরোগ, ক্যানসার ও Alzheimer’s disease ইত্যাদি রোগে আক্রান্তের হার কমে যায় বলে জানা গিয়েছে।
রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রনে কাঠবাদাম
এই বাদামে কার্বোহাইড্রেটের পরিমান কম কিন্তু চর্বি, প্রোটিন ও ফাইবার বেশী থাকে। যা ডায়াবেটিস রোগীর পছন্দের খাবার তালিকায় অধিক উপযোগী হয়।
এছাড়া, এখানে মেগনেসিয়াম পরিমানও বেশি যা রক্তে সুগারের পরিমান কমাতে কাজ করে। আমাদের শরীরে দৈনিক ম্যাগনেসিয়ামের প্রয়োজন ৩১০-৪২০ গ্রাম। আপনি ২ আউন্স পরিমান এই বাদাম খেলে ম্যাগনেসিয়ামের দৈনিক অর্ধেক পরিমান চাহিদা মিটে যাবে।
গবেষণা থেকে জানা যায়, ২৫-৩৮% টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর দেহে ম্যাগনেসিয়ামের স্বল্পতা রয়েছে। মেগনেসিয়ামের এই অভাব পূরণ করা গেলে রক্তে গ্লুকোজ লেভেল তাৎপর্যপূর্ণভাবে কমে যাবে এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতাও বাড়িয়ে দিবে।
ইহা থেকে পরিস্কার হয়, অধিক ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার যেমন কাঠ বাদাম আপনার টাইপ-২ ডায়াবেটিসে নিয়ন্ত্রণে ভাল ভূমিকা রাখতে পারে।
দেহে কোলেস্টেরল কমানোর কাজে কাঠবাদাম
কাঠ বাদামের উপকারিতা প্রসঙ্গে কোলেস্টেরলের উপর এর যথেষ্ট ভূমিকা আছে। দুই ধরণের কোলেস্টেরলের মধ্যে এলডিএল কোলেস্টেরল খারাপ কোলেস্টেরল হিসাবে চিহ্নিত যা হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি করে। কাঠ বাদাম রক্তের এই খারাপ কোলেস্টেরল দমিয়ে রাখতে ফলপ্রসুভাবে ভূমিকা পালন করে।
ষোল সপ্তাহ মেয়াদে ৬৫ জন প্রি-ডায়াবেটিস বিশিষ্ট মানুষের মাঝ পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, খাদ্যের ২০% ক্যালরি কাঠ বাদাম থেকে সরবরাহ করার ফলে LDL কোলেস্টেরলের মাত্রা গড়ে ১২.৪ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার পরিমান কমে যায়। অপর এক গবেষণায়, দৈনিক ৪২ গ্রাম কাঠ বাদাম খাওয়ার ফলে ৫.৩ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার পরিমান LDL কোলেস্টেরল কমে যেতে দেখা যায়। কিন্তু একই সাথে ইহা ভাল কোলেস্টেরল অর্থাৎ HDL কোলেস্টেরল কমানোর কাজে কোন প্রভাব ফেলে না।
ক্ষুধা কমানোর ক্ষেত্রে কাঠবাদাম
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, এই বাদামে কার্বোহাইড্রেট কম এবং প্রোটিন ও ফাইবার বেশি থাকে। এই প্রোটিন ও ফাইবারের কাজ হল পাকস্থলিতে ক্ষুধার অনুভূতি দমিয়ে রাখা। ফলে ক্ষুধা কম লাগায় খাওয়ার পরিমান কমে যায়। এতে আপনার ক্যালরি গ্রহনের পরিমান কমে যাবে।
কাঠ বাদাম খাওয়ার ফলে ক্ষুধা কম লাগার বিষয়টি অনেক গবেষনায় প্রমান পাওয়া গিয়েছে।
ওজন কমানোর কাজে কাঠ বাদাম
বাদামের মধ্যে এমন কিছু পুষ্টি উপাদান থাকে যা দেহের পক্ষে ভেঙ্গে হজম করা কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। ফলে বাদামের ১০-১৫% ক্যালরি দেহে শোষণ হতে পারে না। এছাড়াও, কিছু তথ্য থেকে জানা যায়, বাদাম খেলে শরীরের কোষের ভিতর বিপাকিয় প্রক্রিয় ধীর গতিতে হয়।
কাঠ বাদামের এই সব বৈশিষ্ট কারণে এটি ওজন কমানোর উপায় হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এর প্রমান বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা যায়।
আমাদের দৈহিক ওজন কেন বাড়ে– তার উপর অন্য একটি পোষ্টে আলোচনা করা হয়েছে। বিস্তারিত জানতে লিংকে ক্লিক করে ভিজিট করুন।
কাঠ বাদাম খাওয়ার নিয়ম
কাঠ বাদামের উপকারিতা ইতোমধ্যে জেনেছেন। এবার চলুন, কাঠ বাদাম খাওয়ার নিয়ম জেনে নেই। এই বাদাম আপনি কাচাও খেতে পারেন আবার পানিতে ভিজিয়ে রেখেও খেতে পারেন। তবে, পানিতে ভিজিয়ে খেলে এটি অধিক উপকারিতা পাওয়া যায় বলে পুষ্টিবিদগনের ধারণা। কেননা, সারা রাত পানিতে ভিজিয়ে রাখার ফলে এর কিছু এনজাইম সক্রিয়তা লাভ করে যা হজমের জন্য সহায়ক।
তবে, সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ বিষয় হল, নির্ধারিত মাত্রায় খেতে হবে। কারণ, এই বাদাম অত্যাধিক পুষ্টি সমৃদ্ধ ও এর মধ্যে ক্যালরির পরিমান অনেক বেশি থাকে।
দৈনিক কতটুকু কাঠ বাদাম খাওয়া উচিত?
মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের গবেষণা মতে আপনি দৈনিক এক আউন্স পরিমান এই বাদাম ভিজিয়ে রেখে খেতে পারেন যা সংখ্যায় ২০-২৩টি হতে পারে।
বন্ধুগন- কাঠ বাদামের উপকারিতা বিষয়ে পোষ্টের তথ্যগুলো কেমন লাগল তা কমেন্টের মাধ্যমে জানানোর অনুরোধ করছি। ধন্যবাদ।
আরোও দেখুন:
> বাদাম কি ও কত কত প্রকার, বাদাম খেলে কি হয়?
> চিনা বাদামের পুষ্টিগুন ও এর উপকারিতা কেমন?
> ক্যালরি কি: দৈনিক কত ক্যালরি খাদ্য গ্রহন প্রয়োজন?
Reference:
Leech, J. (2021). 9 Evidence-Based Health Benefits of Almonds. Retrieved 28 March 2021, from https://www.healthline.com/nutrition/9-proven-benefits-of-almonds
admin
The almond is a popular tree nut that is loaded with important nutrients. This is a detailed article about almonds and their health benefits.