03/03/2026
কেইস ডিসরাপশন: ভুল চিকিৎসা সৃষ্ট গোপন বিপর্যয়
পর্ব - ৬
অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, ভুল হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা সবচাইতে বাজে জাতের কেইস ডিসরাপশন সৃষ্টি করে থাকে। এ ব্যাপারে বিগত বহু মনীষী কিছু কিছু আভাস দিলেও বিশদ আলোচনা খুব একটা চোখে পড়েনি। আজকে এই পর্বটিতে এই ব্যাপারটি খোলাসা করে আলোচনা করছি।
ভিথোলকাস বলেন, হোমিওপ্যাথির চিকিৎসা ক্ষেত্রে খুব ভালো চিকিৎসক কিংবা খুব বাজে চিকিৎসক - এই দুই ক্যাটাগরির দ্বারা কেইসের তত বেশি অনিষ্ট সাধন হয় না, হয় মাঝামাঝি ক্যাটাগরির চিকিসক দ্বারা; যিনি একদম সঠিক কিংবা একদম ভুল ঔষধ নির্বাচন না করে, এবং কেইসের সঠিক গভীরতায় তাকে বিবেচনা না করে - আংশিক সদৃশ ঔষধ প্রদান করেন এবং করতে থাকেন। এই আংশিক সদৃশ ঔষধের ক্রিয়া সম্বন্ধে ডা. কেন্ট বলেন- তা একটি কেইসকে আরোগ্য করতে পারে, আবার বিনষ্টও (Spoil) করতে পারে।
ব্যাপারটি বোঝার জন্য - আংশিক সদৃশ ঔষধ ও কেইস ডিসরাপশনের সম্পর্কটাকে আমাদের একটু গভীরভাবে বুঝতে হবে। তাহলে আমরা এটাও বুঝতে পারবো যে, কোন ধরনের আংশিক সদৃশ ঔষধ, কিংবা কোন কোন ক্ষেত্র এ ধরনের ঔষধ প্রয়োগ আরোগ্যের দিকে নিয়ে যেতে পারে এবং কোন ক্ষেত্রগুলোতে, কেন তার উল্টো গতি সৃষ্টি হবে।
আর এই সম্পর্কটার ভিত্তি হচ্ছে - রোগীর সংবেদনশীলতা। এখানে সংবেদনশীলতা সম্বন্ধে দু’টি কথা না বললেই নয়। কারণ, আমি যতদূর লক্ষ করেছি - সংবেদনশীলতা ব্যাপারটা ধারণায় আনা অনেকের জন্য বেশি কঠিনই হবার কথা এবং আদতে এটা ঠিকঠাক উপলব্ধি করেছেন কম মানুষই। সংবেদনশীলতা বলতে আমরা সহজে যেভাবে বুঝতে পারি সেটা হচ্ছে: সংবেদনশীলতা হচ্ছে দুই বা ততোধিক বস্তু, বিষয় বা সত্তার মধ্যে বিদ্যমান এমন একটি সম্পর্কগত ক্ষমতা (relational capacity) — যেখানে একটির অবস্থা, পরিবর্তন বা প্রভাব অন্যটিতে একটি সুনির্দিষ্ট (ও সম্ভবত পরিমাপযোগ্য) প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এই প্রতিক্রিয়ার মাত্রা, গতি ও প্রকৃতি নির্ভর করে গ্রহীতা সত্তার অন্তর্নিহিত গঠন, বিন্যাস, অবস্থা ও প্রস্তুতি ইত্যাদির (internal constitution, arrangement, state, and readiness, etc.) ওপর।
এই কথাটা জাস্ট রেফারেন্স হিসাবে আর্টিকেলটাতে উল্লেখ করে রাখছি যে: আমার যতদূর মনে হয়, এরই খুব সূক্ষ্ম, গভীর, ব্যাপক, ইমপ্লিকেট, এনফোল্ডেড ব্যাপারটাই কোয়ান্টাম এনট্যাংগেলম্যান্টের কারণ। এবং যদি এই দৃষ্টিভঙ্গি সত্য হয়, তাহলে সংবেদনশীলতা কেবল একটি প্রতিক্রিয়ার পরিমাপ নয় — এটি আসলে সত্তার অন্তর্নিহিত সংযোগের (inherent connectedness) একটি প্রকাশ। হোমিওপ্যাথিতে আমরা যখন বলি একজন ব্যক্তি ওষুধের প্রতি 'সংবেদনশীল', তখন আমরা আসলে বলছি — তার জীবনীশক্তি সেই ওষুধের সূক্ষ্ম কম্পনের (dynamic signature) সাথে resonance স্থাপন করতে সক্ষম। এটি কোনো যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি dynamic, non-local relationship (যা ফিজিসিস্ট ডেভিড বোমের তত্বানুসারে implicate order-এর স্তরে ঘটে এবং explicate (প্রকাশিত) জগতে লক্ষণ হিসেবে দৃশ্যমান হয়।
উপরের ব্যাপারটা আমরা কিছুটা সহজে বুঝতে পারবো- প্রফেসর ভিথোলকাসের ‘এনার্জি/ফ্রিকোয়েন্সি তত্ব’ অনুসারে। দু’টো কম্পমান বস্তু একই ফ্রিকোয়েন্সিতে সবচাইতে শক্তিশালীভাবে রেজোন্যান্স - প্রকৃতির এই নীতির সাপেক্ষে তিনি (পুরো) হোমিওপ্যাথির যে পূর্ণাঙ্গ মৌলিক, সায়েন্টিফিক ও ভিত্তিমূলক ব্যাখ্যাটি প্রদান করেছেন - তার ভিত্তিতে। ভিথোলকাসের ‘সায়েন্স অব হোমিওপ্যাথি’ গ্রন্থে তার বিস্তারিত পেয়ে যাবেন; অন্যান্য গবেষণা, মৌলিক তত্ব ও তার ভিত্তিতে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিগুলোর আবিষ্কার, বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে তার প্রদত্ত বক্তৃতা ও তার নিজস্ব ভিডিওগুলোতে বাদবাকি বিষয় পেয়ে যাবেন।
যাই হোক, আমাদের শাস্ত্রগুলোতে সংবেদনশীলতা ব্যাপারটিকে নিয়ে যতটুকু গুরুত্ব ও গভীরতা নিয়ে আলোচনা মৌলিকভাবে করা প্রয়োজন ছিলো - তা একদমই করা হয়নি। হোমিওপ্যাথিকে বুঝতে চাইবেন, অথচ সংবেদনশীলতা ব্যাপারটিকে ধারণায় রাখবেন না - এটা প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার!
এবার মূল প্রসঙ্গে ফিরি। কাজেই, রোগীতে প্রদত্ত একটি ঔষধ যদি সর্বোচ্চ সংবেদনশীল হয় এবং সেটা যদি সার্বিকভাবে হয় - সেটাকেই আমরা সিমিলিমাম ঔষধ বলি। অর্থাৎ, উক্ত ঔষধটি রোগীতে সবচাইতে শক্তিশালী স্টিমুলেশন দিতে সক্ষম এবং যার ঝংকার রোগীতে দীর্ঘদিন ধরে গভীরভাবে বিদ্যমান থাকবে। মানুষের মায়াজমেটিক জটিলতা, বিভিন্ন প্রকার কেমিক্যাল (এলোপ্যাথিক) ঔষধ, স্টেরয়েড, ভ্যাকসিন, স্ট্রেস, শক বা পরিবেশগত ও পারিপার্শ্বিকতাগত দুষণ ইত্যাদি কারণে বর্তমানে এই সিমিলিমাম খুব সুচিন্তিত বোধ ও পদক্ষেপ ছাড়া পাওয়া অসম্ভব। প্রফেসর ভিথোলকাসের এটাও একটা বড় আবিষ্কার যে, স্বাতন্ত্রতার ভিত্তিতে ব্যক্তির জীবনের যে কোনো সময়ে তার স্বাস্থ্যের বৈজ্ঞানিক পরিমাপ সম্পাদন করে, তার সাপেক্ষে তার জন্য ঠিক সেই মুহুর্তের সিমিলিমাম ঔষধটিকে নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, বর্তমানের এই জটিলতার প্রেক্ষাপটে বড় সংখ্যক রোগীতেই পর পর যথাসময়ে কয়েকটি সঠিক ধারাবাহিকতায় ঔষধ প্রেসক্রাইব নিশ্চিত করতে হবে।
অনেকেই হয়তো বলবেন, এত চিন্তা, তত্ব বা সায়েন্সকে বিবেচনা না করেও তো আমরা বেশ বহু রোগীকে ভালো করছি। তারা একটা বিশাল বড় ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছেন....
(চলবে)
ডা. শাহীন মাহমুদ
চিফ ট্রেইনার, হোমিওডাইজেস্ট এডুকেশন ফ্যাকাল্টি
ফ্যাকাল্টি হেড ও চিফ ইনভেস্টিগেটর, হোমিওডাইজেস্ট রিসার্চ ফ্যাকাল্টি
বাংলাদেশ
মেইল: [email protected]