08/09/2026
সকাল ১১ টা, হাসপাতালের চক্ষু বিভাগ, আজকে রোগীর চাপ তুলনামূলক কিছুটা কম।
ধীরে ধীরে ৪০ বছর বয়সী একজন লোক স্ত্রীকে নিয়ে কিছুটা সংকোচের সাথে ওয়ার্ডে ঢুকলেন। চোখের ডাক্তার কোন রুমে বসেছেন একজন নার্সকে জিজ্ঞেস করলেন।
ডাক্তারের দরজার সামনে একটা ফাঁকা চেয়ার পেয়ে তিনি বসলেন। দরজার কাছে এসেও কিন্তু তিনি একাই ধীরপায়ে ভেতরে ঢোকেননি, দরজা পার হওয়ার সময় ওনার স্ত্রী ওনার হাতটা শক্ত করে ধরে ভেতরের চেয়ার পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে এলেন।
জিজ্ঞাসায় জানা গেল, পেশায় তিনি সেলসম্যান- জীবিকার তাগিদে যার প্রতিদিন মাইলের পর মাইল বাইক চালিয়ে ঘুরে বেড়ানোর কথা। কিন্তু ৪০ বছরের সুঠাম দেহের এই মানুষটা আজ স্ত্রীর হাত ধরে পা ফেলছেন কেন?
আমরা যখন তাকে ডার্করুমের স্লিট ল্যাম্প মেশিনের সামনে বসালাম, রহস্যের প্রথম সূত্রটা পেলাম তখনই।
তার বাম চোখটা পুরোপুরি সুস্থ, স্বাভাবিক। কিন্তু ডান চোখ? চোখের মণির ভেতরটা এক ঘোলাটে, ধোঁয়াটে সাদা চাদরে ঢাকা! চোখের সামনে আমার একটা আঙুল নেড়ে জিজ্ঞেস করলাম "কয়টা দেখতে পাচ্ছেন?"
ভদ্রলোক বিষণ্ণ গলায় বললেন, "ডাক্তার সাহেব, শুধু আলো-ছায়ার মতো একটা হাত নাড়তে দেখছি, কিচ্ছু পরিষ্কার না।"
মেডিকেল সায়েন্স বলে, চোখের এই ঘোলাটে ভাব বা ছানি (Cataract) সাধারণত ষাট বা সত্তর বছর বয়সের পর জাঁকিয়ে বসে। কিন্তু ৪০ বছরের একজন মানুষের চোখ এভাবে অন্ধত্বের একদম দ্বারপ্রান্তে পৌঁছালো কীভাবে?
রহস্যের জট খুলতে তাকে জিজ্ঞেস করলাম "কখনো কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে? চোখে বা মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছিলেন?"
ভদ্রলোক মাথা নাড়লেন "না ডাক্তার সাহেব, আল্লাহ মাফ করুক জীবনে কখনোই কোনো এক্সিডেন্ট করিনি। বড় কোনো আঘাতও পাইনি।"
কোনো এক্সিডেন্ট নেই, অথচ চোখের লেন্সটা এরকম ঘোলা হয়ে গেছে! তাহলে কে বা কী নিঃশব্দে গিলে খেলো তার ডান চোখের দৃষ্টি? এই অপরাধী কে?
আমরা আরও বিস্তারিত প্রশ্ন শুরু করলাম। একটা একটা করে ক্লু মেলাতে মেলাতে তাকে জিজ্ঞেস করলাম
"আপনি কি প্রতিদিন বাইক চালান? বাইক চালানোর সময় কেমন হেলমেট পরেন?"
ঠিক এই প্রশ্নটা করতেই রহস্যের সবচেয়ে বড় ক্লু-টা হাতে চলে এলো।
ভদ্রলোক মৃদু হেসে বললেন,
"ডাক্তার সাহেব, হেলমেট তো মাথায় রাখতে হয় পুলিশ চেকপয়েন্ট আসলে, বাকি সময় এটা মাথায় রাখা তো ঝামেলা"
"আচ্ছা আর হেলমেটের সামনের যে গ্লাস (Visor), ওটা কি তুলে রাখেন?"
"জ্বী স্যার, এটা আটকালে তো দম বন্ধ লাগে। খোলা রাখলে বাতাসে চোখ জুড়ায়, রাস্তায় দেখতে সুবিধা হয়।"
"চশমা-টশমা পরার অভ্যাস আছে বাইক চালানোর সময়?"
"না স্যার, আমার কি আর ওই স্টাইল করার বয়স আছে! আর কোনোদিন ছিল ও না।"
ব্যস, অপরাধীর মুখোস খুলে গেল!
তিনি কোনো বড় এক্সিডেন্ট করেননি ঠিকই, কিন্তু গত দেড় যুগ ধরে প্রতিনিয়ত অদৃশ্য শক্তি তাকে আক্রমণ করে গেছে। আসলে মূল অপরাধী ছিল দুইজন!
১. সূর্যের অদৃশ্য বিষ (UV Rays)- বছরের পর বছর ধরে রোদের মধ্যে গ্লাস ছাড়া বাইক চালানোর ফলে সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি সরাসরি তার চোখের লেন্সে পড়েছে। এই রশ্মি লেন্সের প্রোটিনগুলোকে পুড়িয়ে ভেতরের স্বচ্ছতা নষ্ট করে দিয়েছে,যার শেষ পরিণতি এই অকাল ছানি।
২. বাতাসের ছদ্মবেশী বুলেট (Micro-Trauma): বাইক যখন ৬০-৭০ কিলোমিটার গতির উপরে চলে, তখন বাতাসে ভেসে আসা এক ফোঁটা ধুলা, ছোট পাথরকুচি কিংবা একটা ছোট্ট পোকা কিন্তু আর সাধারণ কিছু থাকে না। ওটা চোখের নরম লেন্সের জন্য একেকটা বুলেটের মতো আঘাত হানে! চোখে সামান্য কটকট করেছে, ভদ্রলোক হয়তো হাত দিয়ে কচলিয়ে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলেছেন। কিন্তু ওই ক্ষুদ্র আঘাতটিই লেন্সের আবরণে তৈরি করেছিল অদৃশ্য এক ফাটল। বছরের পর বছর ধরে সেই ফাটল বড় হতে হতে চোখটাকে আজ প্রায় অন্ধ করে দিয়েছে।
গল্পের ট্র্যাজেডিটা কিন্তু এখানেই শেষ নয়।
বয়সকালের স্বাভাবিক ছানি অপারেশন করলে দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসে। কিন্তু এই আঘাতজনিত ছানিতে চোখের ভেতরের অন্য অনেক সূক্ষ্ম রগ নষ্ট হয়ে যায়।
ভদ্রলোকের অপারেশন হয়তো আমরা করব, কিন্তু আগের মতো উজ্জ্বল দৃষ্টিশক্তি তিনি আর কখনো ফেরত পাবেন কি না, তা পুরোপুরি অনিশ্চিত!
অথচ পুরো বিপদটা আটকে দেওয়া যেত খুব তুচ্ছ একটা কাঁচের ঢাল দিয়ে!
আজকে যারা বাইক চালান, কিংবা আপনার পরিবারের কেউ প্রতিদিন রাস্তায় বাইক নিয়ে বের হন, একটু দেখবেন আপনিও কি একই ভুল করছেন?
এই অদৃশ্য সাইড-স্টোরিটা যেন আপনার জীবনে না ঘটে, তাই আজকেই ৩টি নিয়ম মেনে চলুন:
- হেলমেটের গ্লাস নামিয়ে রাখুন: যত গরমই লাগুক, বাইক স্টার্ট দিলেই হেলমেটের ভাইজর (Visor) নামিয়ে নিন। রাতে যদি রঙীন গ্লাসে সমস্যা হয়, তবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ বা ট্রান্সপারেন্ট চশমা ব্যবহার করুন।
- গ্লাস বা সানগ্লাস ব্যবহার করুন: যখন হেলমেট ব্যবহার করবেন না তখন UV400 প্রটেকশনযুক্ত ভালো সানগ্লাস পরুন। এমনকি মেঘলা দিনেও UV রশ্মি সক্রিয় থাকে। (তবে ফুটপাতের সস্তা সানগ্লাস এড়িয়ে চলুন, ওগুলো UV আটকায় না)। রাতে পরবেন একদম স্বচ্ছ চশমা।
- চোখ কচলানো পুরোপুরি নিষিদ্ধ: চোখে ধুলোবালি পড়লে কচলানো যাবে না। এতে সূক্ষ্ম কণাগুলো চোখে আঁচড় কেটে বড় ক্ষতি করে। শুধু পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে নিন।
- বছরে অন্তত একবার চোখ পরীক্ষা: কোনো সমস্যা না থাকলেও যারা একদম প্রতিদিন রাইড করেন, বছরে অন্তত একবার সরকারি হাসপাতালে আউটডোরে গিয়ে চক্ষু বিশেষজ্ঞকে দিয়ে চোখ চেকআপ করিয়ে নিন।
আমাদের মাথা বাঁচানোর জন্য আমরা হেলমেট কিনি, কিন্তু ভূলেই যাই, এক জোড়া চোখ পুরো ভালো না থাকলে এই সুন্দর পৃথিবীটাই তো আর হাই কোয়ালিটি দেখা হবে না!
আল্লাহর প্রদত্ত এই কুদরত "দৃষ্টিশক্তি" র মূল্য কোটি টাকার চেয়েও বেশি, অমূল্য।
সবাই চোখের যত্ন নিন, সচেতন হোন, সুস্থ থাকুন।
~ শাহরিয়ার, এমবিবিএস ফাইনাল ইয়ার।