26/05/2026
" যুদ্ধের ছাই থেকে উন্নয়নের উত্থান "
------------ ------------ ------------ --
বাংলাদেশ স্বাধীনতার সময় ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত, দারিদ্র্যপীড়িত ও অবকাঠামোহীন একটি দেশ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সেতু, রেললাইন, শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র—সবকিছুই ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। যুদ্ধ শেষে বিশ্বের অনেক বিশ্লেষক বাংলাদেশকে “তলাবিহীন ঝুড়ি” বলেছিলেন। অথচ একইভাবে যুদ্ধবিধ্বস্ত জাপান ,দক্ষিণ কোরিয়া ,জার্মানি কিংবা ভিয়েতনাম কয়েক দশকের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতির শক্তিশালী উদাহরণে পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে—বাংলাদেশ কেন সেই গতিতে এগোতে পারেনি?
প্রথমত, রাজনৈতিক অস্থিরতা বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম বড় বাধা। স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক শাসন, রাজনৈতিক সংঘাত, হরতাল, সহিংসতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেশের অর্থনীতি ও প্রশাসনকে দুর্বল করেছে। একটি দেশ দ্রুত উন্নয়ন করতে চাইলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক নীতি ও পরিকল্পনা বদলে গেছে। ফলে উন্নয়নের গতি স্থিতিশীল হয়নি।
দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি ও সুশাসনের ঘাটতি দেশের বড় সমস্যা। উন্নয়ন বাজেটের একটি অংশ প্রকৃত কাজে না গিয়ে অপচয় বা অনিয়মের মধ্যে হারিয়ে যায়। বিশ্বে যেসব দেশ যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষ থেকে উঠে এসেছে, তারা প্রশাসনিক দক্ষতা ও জবাবদিহিতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া বা সিঙ্গাপুর কঠোর প্রশাসনিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেছিল। বাংলাদেশে এখনো অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অদক্ষতা বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের পথে বাধা সৃষ্টি করে।
তৃতীয়ত, মানবসম্পদ উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ যথেষ্ট ছিল না। উন্নত দেশগুলো শিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তিকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করেছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া যুদ্ধের পর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ও দক্ষ কর্মশক্তি তৈরিতে। বাংলাদেশে শিক্ষার প্রসার ঘটলেও মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও উদ্ভাবনে এখনো বড় ঘাটতি রয়েছে। ফলে আমরা বিপুল জনসংখ্যাকে কার্যকর মানবসম্পদে পুরোপুরি রূপান্তর করতে পারিনি।
চতুর্থত, শিল্পায়নের সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দুর্বল রেখেছে। দেশের অর্থনীতি এখনো মূলত তৈরি পোশাক শিল্প ও প্রবাসী আয়ের উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। কিন্তু দ্রুত উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রযুক্তিনির্ভর বহুমুখী শিল্প গড়ে তুলেছিল। দক্ষিণ কোরিয়া ইলেকট্রনিকস ও গাড়ি শিল্পে, জার্মানি প্রকৌশল ও ভারী শিল্পে, আর ভিয়েতনাম প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতে বৈচিত্র্য এনেছে। বাংলাদেশ এখনো সেই মাত্রায় শিল্প বৈচিত্র্য তৈরি করতে পারেনি।
পঞ্চমত, স্বাস্থ্য ও পুষ্টিখাতে দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দেওয়ার প্রভাবও রয়েছে। অপুষ্টি, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয়। একটি জাতির উন্নয়নের জন্য সুস্থ জনগোষ্ঠী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও বাংলাদেশ স্বাস্থ্যখাতে কিছু সফলতা অর্জন করেছে, তবুও সার্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার মান ও প্রাপ্যতায় বৈষম্য রয়ে গেছে।
তবে এটাও সত্য যে বাংলাদেশ একেবারেই উন্নয়ন করেনি—এমন কথা সঠিক নয়। স্বাধীনতার পর দুর্ভিক্ষ ও চরম দারিদ্র্যের দেশ থেকে বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, নারীর ক্ষমতায়ন, তৈরি পোশাক রপ্তানি, টিকাদান কর্মসূচি ও গড় আয়ু বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। World Bank এবং United Nations-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়নের কিছু দিক প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো—এই অগ্রগতি দেশের সম্ভাবনার তুলনায় অনেক ধীর এবং অসম।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। যদি শিক্ষা, প্রযুক্তি, গবেষণা, স্বাস্থ্য ও সুশাসনে কার্যকর বিনিয়োগ করা যায়, তাহলে বাংলাদেশও দ্রুত উন্নয়নের উদাহরণ হতে পারে। প্রয়োজন রাজনৈতিক সহনশীলতা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা। উন্নয়ন কেবল বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণের নাম নয়; উন্নয়ন মানে দক্ষ মানুষ তৈরি, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই রাষ্ট্র নির্মাণ।
ইতিহাস প্রমাণ করে, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকেও উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া সম্ভব। বাংলাদেশও পারে—যদি আমরা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র হিসেবে উন্নয়নের মৌলিক ভিত্তিগুলোকে সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী করতে পারি।
------------ ------------
ডা. এম এ হালিম খান
সহযোগী অধ্যাপক
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল ,ঢাকা।