08/04/2024
।। উপলব্ধি।।
“ফাবিআইয়্যি আ-লা-য়ি রব্বিকুমা-তুকায্যিবা-ন্” (অতএব তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন অনুগ্রহকে অস্বীকার করবে?) ; ফযরের নামাজ শেষ করে কুরআন পড়ার সময় সুরা রহমানের এই লাইনটি ডাঃ সাজ্জাদের মস্তিষ্কে জন্মদেয় এক অদ্ভুত অনুভূতির। তাঁর ত্বকের ডার্মিসে থাকা Erector pili নামক পেশির সংকোচনে খাড়া হয়ে গেলো শরীরের লোমগুলো।
মস্তিষ্কের নিউরনদের অণুরণনে এবং তাদের অন্ত:যোগাযোগের জটিল প্রক্রিয়ার তাঁর আসে বহু চিন্তা। কুরআনের আয়াতটি তাঁকে ভাবাতে শুরু করে। তাঁর নেওয়া প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস যেন তাঁর সাথে কথা বলে। কিছুদিন আগে করোনা থেকে লড়াই করে ফিরে আসা ডাঃ সাজ্জাদকে তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস যেন জানান দিচ্ছে এর মূল্য কতখানি। প্রতিনিয়ত বিনামূল্যে নেওয়া অক্সিজেনের মূল্যটাও করোনা যেন দেখিয়ে দিয়েছে।
তাঁর মনে পড়ে করোনা আক্রান্ত হয়ে তাঁর পাশে থাকা হাফেজ ছেলেটির কথা। ছেলেটির বয়স আর কত হবে একুশ অথবা বাইশ। ডা: সাজ্জাদ বেঁচে ফিরে আজ এই আয়াত পড়ার সুযোগ পেলেও হাফেজ ছেলেটির সেই সুযোগটি আর হয়নি।
যদিও করোনা তাঁকে মারেনি তাকে মেরেছে তাঁর নিজেরই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। হ্যাঁ, এটিই সত্য। করোনাকে মারতে গিয়ে তাঁর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তাকেই মেরে ফেলেছে সাইটোকাইন সিনড্রোমের ম্যধ্যমে। করোনা ভাইরাসের দেহের অংশ যখন তাঁর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তার “ pattern recognition receptor” দিয়ে চেক করেছিলো তারপর যুদ্ধক্ষেত্রে নামার জন্য IL-1, TNF- alpha, IL-6 সিগনালের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ম্যাক্রোফেজ, T-cell সহ সৈন্যরুপী ইমিউন সেলদের ডেকে এনেছিলো।
অতিরঞ্জিত কোনো কিছুই ভালো না আর সেজন্যই হীতে বিপরীতই ঘটে গেলো।
সেই সৈন্যদের অস্ত্ররুপী সাইটোকাইন আরা কেমোকাইন বিপুল পরিমাণে বের হয়ে ধ্বংস করতে থাকলো নিজ দেহের কোষগুলোকে। অনিয়ন্ত্রিত এই ইমফ্লামেশন অনিয়ন্ত্রিত করে ফেললো কমপ্লিমেন্ট সিস্টেম আর Coagulation Cascade কে। যার ফলশ্রুতিতে হলো মাল্টি অর্গান ফেইলিউর। আর বাঁচানো গেলো না ছেলেটিকে। কিন্তু এটি ডাঃ সাজ্জাদের বেলায় হলো না কেন? ডাঃ সাজ্জাদের মাথায় প্রশ্নটি আসলে নিজের মনেই উত্তর খোঁজার চেষ্টায় থাকেন তিনি। উত্তর পেয়েও যান তাঁর হয়তো জেনেটিক্যালি হাই রিস্কে ছিলেন না যতোটা সেই ছেলেটি ছিলো। অর্থাৎ ডাঃসাজ্জাদ ও সেই হাফেজ ছেলেটির জন্মের পূর্বেই নির্ধারণ হয়েছিলো কে এভাবে মারা যাবে। এটাই তাকদীর।
ডাঃ সাজ্জাদের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে থাকলো অঝোরে। চোখের প্রতিটি পানি কণাও যেন আজ তাঁর সাথে কথা বলছে। এইটুকু পানি বের হওয়ার জন্যও তার অজান্তেই কাজ করে তার ফ্রন্টাল লোব, গ্লোবাস প্যালিডাস, থ্যালামাস আর হাইপোথ্যালামাস। তারা জানিয়েছে ল্যাক্রিমাল নিউক্লিয়াসকে আর সে জানিয়েছে ল্যাক্রিমাল গ্ল্যান্ডকে। ল্যাক্রিমাল গ্লান্ড তৈরী করেছে এই চোখের পানি। তবে এটি চোখ দিয়ে বেয়ে পড়তো না ওই লেভেল পর্যন্ত যতোক্ষণ না পর্যন্ত তা ল্যাক্রিমাল ড্রেইনেজ সিস্টেমকে অতিক্রম করে যায়। এগুলো ডাঃসাজ্জাদের বহুদিনের জানা কিন্তু কোনোদিন এভাবে তাঁর ভেবে দেখা হয়নি। উপলব্ধিগুলো যেন কর্টেক্স এ থাকলেও তা সাবকর্টিক্যাল লেভেলে পৌঁছাতে পারেনি যেটা আজকে পেরেছে। ইমান আর বিশ্বাসের সংজ্ঞাগুলো যেন আরো স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠছে তাঁর মনে। যদিও এতোদিন এগুলো তাঁর চোখের সামনেই ছিলো। ভাবতে ভাবতেই ডাঃ সাজ্জাদের মনে পড়লো আগের দিন পড়া আরেকটি আয়াতঃ
“আর অবশ্যই আমি সৃষ্টি করেছি জাহান্নামের জন্য বহু জিন ও মানুষকে। তাদের রয়েছে অন্তর, তা দ্বারা তারা বুঝে না; তাদের রয়েছে চোখ, তা দ্বারা তারা দেখে না এবং তাদের রয়েছে কান, তা দ্বারা তারা শুনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত; বরং তারা অধিক পথভ্রষ্ট। তারাই হচ্ছে গাফেল।”
সুরা আরাফের আয়াতটি আজ ডাঃসাজ্জাদের কাছে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট ।